নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণী ভোটে রেকর্ড উপস্থিতি

ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণী সাধারণ নির্বাচনে গত ৪৫ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে দুপুরের মধ্যেই লাখ লাখ ভোটার কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। দেশটির সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ২টা পর্যন্ত দেশটিতে রেকর্ড ৪৪.৯ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা ১৯৭৩ সালের পর এই সময়ে সর্বোচ্চ উপস্থিতির রেকর্ড।
তবে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে না। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে রাজনৈতিক দর-কষাকষি চলতে পারে।
গণতন্ত্র ও নিরাপত্তা এই দুই বিষয় নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। নেতানিয়াহুর শাসনামল নিয়ে গণভোট হিসেবেও দেখা হচ্ছে এ নির্বাচনকে।
মঙ্গলবার সকালে দেশজুড়ে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ তোলে বেশ কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক দল। তবে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি (সিইসি) জানিয়েছে, ব্যালট পেপারে পরিকল্পিতভাবে কারসাজির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় সরকার গঠনে জোট অপরিহার্য। অতীতেও ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতায় অপ্রত্যাশিত জোট তৈরি হয়েছে। তবে এবারের নির্বাচন বিশেষভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং দলগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে আগেই কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
গত বছর গঠিত ইয়াশার পার্টির নেতা আইজেনকোট তথাকথিত ‘পরিবর্তনপন্থি জোটের’ প্রধান মুখ। আদর্শগত মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যেই এ জোটের দলগুলো একত্র হয়েছে।
এ জোটের অন্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, আভিগদর লিবারম্যান ও বামঘেঁষা সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলান। বেনেট ও লিবারম্যান ডানপন্থি এবং নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফিরতে চাইলে তাকে বর্তমান সরকারের শরিক অতি ডানপন্থি ও অতি-অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোট ধরে রাখতে হবে। তার বর্তমান সরকারকে ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থি সরকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নির্বাচনে আরবদের দুটি রাজনৈতিক জোটও অংশ নিচ্ছে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব; তাদের অনেকে নিজেদের ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। তাত্ত্বিকভাবে সরকার গঠনে তারা নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে প্রধান ইহুদি দলগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া বাকিরা আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নাকচ করেছে।
নিরাপত্তা এবারের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান ইস্যু। ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার আগে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য বিরোধী জোট নেতানিয়াহুকে দায়ী করছে। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।
হামলার তদন্তে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে বিরোধীরা। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছেন। তার দাবি, কমিশন তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট হবে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে চলমান বিচার এবং বিচারব্যবস্থায় বিতর্কিত সংস্কার পরিকল্পনাকেও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে বিরোধীরা। এসব সংস্কার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ইসরায়েলে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। নেতানিয়াহু তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে নেতানিয়াহু আবারও নিজেকে ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ হিসেবে তুলে ধরছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের বিভিন্ন যুদ্ধে কৌশলগত সাফল্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নিজের পক্ষে যুক্তি হিসেবে দেখাচ্ছেন তিনি।
রোববার ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ জানায়, নির্বাচনের আগে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে, এমন একটি শেষ মুহূর্তের সামরিক অভিযানের পক্ষে চাপ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তবে তার নিজের সামরিক প্রধান ইয়াল জামির এর বিরোধিতা করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। পরদিন সিএনএন জানায়, ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে ট্রাম্পকেও রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন নেতানিয়াহু, কিন্তু ট্রাম্প অনুমতি দেননি। নেতানিয়াহু উভয় প্রতিবেদনই অস্বীকার করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনগুলোতে তেল আবিবে পারমাণবিক বোমা আঘাত হানার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ছবি পোস্ট করেও আলোচনায় আসেন নেতানিয়াহু। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে পারবেন, এমন একমাত্র নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন তিনি। জবাবে আইজেনকোট তাকে ‘হিস্টিরিয়াগ্রস্ত’ বলে মন্তব্য করেন।
অতি-অর্থোডক্স ইহুদি পুরুষদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত এসব পুরুষকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিতে সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর করতে পারেনি নেতানিয়াহুর সরকার। সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে হাজার হাজার অন্য ইসরায়েলিকে সামরিক দায়িত্বে পাঠানো হলেও অতি-অর্থোডক্সদের নিয়োগ নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়েছে।
নেতানিয়াহুর জোটে থাকা দুটি অতি-অর্থোডক্স দল সামরিক নিয়োগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সমর্থন দিয়েছে।
গাজা প্রশ্নে আইজেনকোটের অবস্থান নেতানিয়াহুর সঙ্গে মোটামুটি একই রকম। তিনি ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনার মাধ্যমে তা সম্ভব না হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছেন।
গত বছর যুদ্ধবিরতি সম্মত হওয়ার পরও ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিন গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির দাবি, এসব হামলায় হামাসের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ এ পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।
যুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বেড়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মিত্রদের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিষয়েও আইজেনকোট মোটামুটি সমর্থনমূলক অবস্থানে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতি অবৈধ। তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইহুদি উগ্রপন্থি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে তিনি।
ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘স্বায়ত্তশাসন বা সীমিত রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার পরিবেশ তৈরির কথাও বলেছেন আইজেনকোট। তবে সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে থাকবে।
ইসরায়েলের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এখন ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতিতে প্রায় অনুপস্থিত।
আইজেনকোটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকারকে আরব দলগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দিতে পারে, এমন আলোচনা থাকলেও সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ শরিক লিবারম্যান এ ধরনের ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
দলগুলোর এসব অনড় অবস্থানের কারণে সরকার গঠনের হিসাব জটিল হয়ে উঠেছে। ভোটের ফল প্রকাশের পর কী ধরনের সমঝোতা, চুক্তি কিংবা অবস্থান পরিবর্তন হয়, তা এখন দেখার বিষয়।
ভোরের আকাশ/আ.র