উৎপাদন থেকে রপ্তানি, মৎস্য খাতে নতুন উচ্চতায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতিতে মাছের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। মাছ এখন শুধু আমিষের উৎস নয়; দেশের মানুষের পুষ্টি, জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গেও এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ বাস্তবতাকে সামনে রেখে আগামী ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট সারাদেশে পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬’। এবারের প্রতিপাদ্য—‘রূপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
মৎস্য খাতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্জন এ খাতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরই প্রমাণ। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট মাছের উৎপাদন ৫১ দশমিক ১১ লাখ মেট্রিক টন। মানুষের দৈনিক মাথাপিছু মাছ গ্রহণের পরিমাণ ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রাম। দেশের ১৪ লাখ নারীসহ দুই কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত।
মৎস্য খাত দেশের জিডিপিতে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ অবদান রাখছে। এ খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৪১ শতাংশ। ফলে মৎস্য খাত এখন শুধু কৃষির একটি উপখাত নয়, জাতীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। ইলিশ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে তৃতীয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জলাশয়ে ক্রাস্টাশিয়া আহরণেও বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম।
সংরক্ষণে বাড়ছে গুরুত্ব
উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ৮২৭টি অভয়াশ্রম স্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর মধ্যে ৪৫৫টি অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা ও মেরামতে ১৮১ দশমিক ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উপকরণ বিতরণ, প্রদর্শনী খামার ও নতুন অভয়াশ্রম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জাতীয় মাছ ইলিশও এ খাতের অন্যতম বড় সম্পদ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছে, যা মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ। ইলিশ সংরক্ষণে ৪৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ ৬টি অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে জেলেদের খাদ্য ও ভিজিএফ সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রকৃত জেলেদের কাছে এসব সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছানো এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সুনীল অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
মৎস্য খাতের বড় সম্ভাবনার জায়গা সুনীল অর্থনীতি। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রতিবছর ৫৮ দিন সব ধরনের সামুদ্রিক মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হচ্ছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক জরিপের মাধ্যমে নতুন প্রজাতি শনাক্ত ও সম্পদের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কুয়াকাটা ও সলিমপুরকে মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া বা সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণার ফলে বঙ্গোপসাগরের ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ এলাকা সংরক্ষণের আওতায় এসেছে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় এসব উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
রপ্তানিতে বাড়াতে হবে মূল্য সংযোজন
মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানিতেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ১৪৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা মূল্যের ৯০ হাজার ৬১৯ দশমিক ৪২ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
তবে বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে শুধু কাঁচা বা প্রচলিত পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে চিংড়ি খাতে মান নিয়ন্ত্রণ, ক্লাস্টার পদ্ধতি, ট্রেসেবিলিটি ও আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২ দশমিক ৯৯ লাখ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদিত হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় স্যাটেলাইট ম্যাপিং, হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে ও খাল পুনঃখননের মতো উদ্যোগ চিংড়ি উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও টেকসই করতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে মৎস্য চাষ
প্রযুক্তির ব্যবহারও বাংলাদেশের মৎস্য খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। সরকারি মৎস্য খামারে যান্ত্রিকীকরণ, আইওটি-ভিত্তিক পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ, জিন ব্যাংক, ক্রায়োপ্রিজারভেশন, অ্যাকুয়াপনিক্স ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়েছে।
এসব প্রযুক্তি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মৎস্য খাত ধীরে ধীরে প্রচলিত চাষব্যবস্থা থেকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবে এ খাতে এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উন্নতমানের পোনা, মানসম্মত খাদ্য, উৎপাদন ব্যয়, রোগবালাই, বাজার ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব চাষিদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও মাছ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই মৎস্যচাষিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বিমা, মানসম্মত উপকরণ ও ন্যায্য বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চাষি ও জেলেদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করাও মৎস্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন।
সর্বোপরি, বাংলাদেশের মৎস্য খাত এখন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক অর্জনের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আগামী দিনের লক্ষ্য শুধু মাছের উৎপাদন বাড়ানো নয়; বরং নিরাপদ, মানসম্মত, পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক মাছ উৎপাদন নিশ্চিত করা। এ জন্য সরকার, গবেষক, উদ্যোক্তা, মৎস্যচাষি, মৎস্যজীবী, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬’ তাই শুধু একটি উৎসব নয়; দেশের মৎস্যসম্পদের সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর অঙ্গীকারেরও সময়। সমন্বিত পরিকল্পনা ও টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ‘রূপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এবারের প্রতিপাদ্য বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।
ভোরের আকাশ/জেআ