পিকফোর্ড না মার্টিনেজ কার হাতে সেমিফাইনালের ভাগ্য?

বিশ্বকাপের মহারণে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। আজ রাতে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে দুই দলের লড়াইয়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবেন আক্রমণভাগের তারকারা। তবে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুই অতন্দ্র প্রহরী—ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড ও আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্টিনেজ।
চলতি বিশ্বকাপে বেশ কয়েকজন গোলরক্ষক নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে আলো ছড়িয়েছেন। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেই নজর কেড়েছেন কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা। মরক্কোর ইয়াছিন বুনো ও স্পেনের উনাই সিমনও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলকে রক্ষা করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন পিকফোর্ড ও মার্টিনেজ।
৩২ বছর বয়সী জর্ডান পিকফোর্ড বিশ্বকাপে ১৮তম ম্যাচ খেলতে নেমে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বাধিক বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েছেন। তবে এবারের আসরে তার পারফরম্যান্স নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। নকআউট পর্বে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ব্রায়ান সিপেঙ্গার শট ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া কিংবা নরওয়ের বিপক্ষে ক্রস সামলাতে ভুল করে গোল হজম—এসব কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। তাই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আজ বড় পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে ইংলিশ গোলরক্ষকের সামনে।
অন্যদিকে, ৩৩ বছর বয়সী এমিলিয়ানো মার্টিনেজের গল্পটা যেন রূপকথার। বিভিন্ন ক্লাবে ধারে খেলতে খেলতে একসময় আর্জেন্টিনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন তিনি। টানা দুটি কোপা আমেরিকা ও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ে তার অবদান ছিল অসাধারণ। বিশেষ করে টাইব্রেকারে তার দুর্দান্ত দক্ষতা এবং প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে চাপে ফেলার ক্ষমতা তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে ফ্রান্সের র্যান্ডাল কোলো মুয়ানির নিশ্চিত গোল বাঁ পা দিয়ে ঠেকিয়ে আর্জেন্টিনাকে বাঁচান মার্টিনেজ। এরপর টাইব্রেকারে কিংসলে কোমান ও অরেলিয়েন শুয়ামেনির শট ঠেকিয়ে দলকে এনে দেন বিশ্বকাপ শিরোপা। সেই থেকেই বড় ম্যাচের নায়ক হিসেবে তার খ্যাতি আরও দৃঢ় হয়েছে।
তবে পরিসংখ্যান বলছে, এবারের বিশ্বকাপে দুই গোলরক্ষকের কেউই নিজেদের সেরা ছন্দে নেই। পিকফোর্ডের বিপক্ষে যেখানে ৩.৫ এক্সপেক্টেড গোল (xGOT) হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তিনি হজম করেছেন ৬টি গোল। অন্যদিকে মার্টিনেজের বিপক্ষে এক্সপেক্টেড গোল ছিল ৪.৫, কিন্তু তিনিও হজম করেছেন ৬টি। অর্থাৎ প্রত্যাশার তুলনায় দুজনেরই পারফরম্যান্স কিছুটা নিচে।
এবারের বিশ্বকাপে পিকফোর্ড ১৮টি শট অন টার্গেটের মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে মার্টিনেজের ক্ষেত্রে সেই সংখ্যা ১৪। ফুটবল পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অপ্টার তথ্য অনুযায়ী, পিকফোর্ডের একটি ভুল থেকেই সরাসরি গোল পেয়েছে প্রতিপক্ষ। তাই সেমিফাইনালের মতো বড় ম্যাচে ভুলের কোনো সুযোগ নেই তার।
তবে বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতায় পিকফোর্ডও কম যান না। ২০১৮ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে কার্লোস বাক্কার পেনাল্টি ঠেকিয়ে ইংল্যান্ডকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। ইউরো ২০২০-এর ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে দুটি পেনাল্টিও সেভ করেছিলেন, যদিও শিরোপা জেতাতে পারেননি দলকে। চলতি বিশ্বকাপেও মেক্সিকোর বিপক্ষে একাধিক নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দলকে রক্ষা করেছেন এই গোলরক্ষক।
প্রিমিয়ার লিগেও দুই গোলরক্ষকের পারফরম্যান্সে খুব বেশি পার্থক্য নেই। তুলনামূলক দুর্বল রক্ষণভাগের কারণে এভারটনের জার্সিতে পিকফোর্ডকে বেশি শট সামলাতে হলেও গত মৌসুমে তিনি ১১টি ক্লিন শিট রেখেছেন। তার সেভের হার ছিল ৬৬.৬৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, ইনজুরি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে কয়েকটি ম্যাচ মিস করলেও অ্যাস্টন ভিলার হয়ে গত মৌসুমে ৯৫টি সেভ করেছেন মার্টিনেজ। বড় ম্যাচে আত্মবিশ্বাস, মানসিক দৃঢ়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতাই তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকের কাতারে নিয়ে গেছে।
ইতিহাস বলে, বিশ্বকাপ জিততে হলে গোলরক্ষকদেরও অনেক সময় অতিমানবীয় পারফরম্যান্স দেখাতে হয়। ১৯৬৬ সালের পর আবারও শিরোপার স্বপ্ন দেখা ইংল্যান্ডের জন্য আজ বড় ভরসা পিকফোর্ড। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা চাইবে, আরও একবার দলের ত্রাতার ভূমিকায় আবির্ভূত হোন ‘দিবু’ মার্টিনেজ। শেষ পর্যন্ত কার হাসি ফুটবে, তার উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়েই।
ভোরের আকাশ/সু.পা