বিশ্বকাপের আগে ব্যাটিং ‘মাস্টারক্লাস’ প্রস্তুতি
মিরপুরে বাংলাদেশের বিশেষ টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং ক্যাম্প

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং পারফরম্যান্স নিয়ে দুশ্চিন্তা আজকের নয়, এটি দীর্ঘদিনের এক বাস্তবতা। ধারাবাহিক ব্যর্থতা, বড় স্কোর তাড়া করতে না পারার অক্ষমতা এবং মাঝের ওভারগুলোতে ইনিংস গড়তে না পারার দুর্বলতা বারবার আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বাস্তবতায়, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে ব্যাটসম্যানদের আধুনিক ফরম্যাটের উপযোগী করে প্রস্তুত করতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) হাতে নিয়েছে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। ব্যাটিং দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পথে এটিকেই দেখা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে।
মিরপুরে শুরু হয়েছে বিশেষ ব্যাটিং ক্যাম্প
মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আজ থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলবে আগামী ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। পুরো প্রশিক্ষণটি সাজানো হয়েছে সাদা বলের ক্রিকেট, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটকে কেন্দ্র করে। আধুনিক ক্রিকেটের উচ্চ স্ট্রাইক রেট, পাওয়ার হিটিং, দ্রুত স্কোরিং ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হচ্ছে এই ক্যাম্পে। এই প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো-বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের পাশাপাশি ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল ও মোহাম্মদ সালাউদ্দিন একসঙ্গে এই সেশনগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আয়ারল্যান্ড সিরিজ শেষ হলেও, বিশেষ অনুরোধে এই দুই কোচের সঙ্গেই থেকে গেছেন সিমন্স। কারণ, সিরিজ শেষে বিশেষ করে ব্যাটিংয়ে কাক্সিক্ষত উন্নতি না আসায় ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরাসরি তত্ত্বাবধানে খেলোয়াড়দের গড়ে তুলতে চান তিনি।
পরিসংখ্যানেই ধরা পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং সংকট
বর্তমান টি-টোয়েন্টি দলকে বিশ্লেষণ করলে ব্যাটিংয়ের দুর্বল চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ মোট ২৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে দলীয় গড় ছিল ২০-এরও নিচে, যা আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের মান অনুযায়ী একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। স্ট্রাইক রেট ছিল ১২০-এর নিচে, যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক হতে হলে অন্তত ১৪০-এর কাছাকাছি থাকা জরুরি। ২০২৫ সালে ৩০টি ম্যাচ খেলে দলীয় রানের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও, শীর্ষস্থানীয় দলগুলোর বিপক্ষে ধারাবাহিক উন্নতির প্রশ্নে এখনো বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হলো- মূল ব্যাটসম্যানদের অনিয়মিত পারফরম্যান্স। লিটন দাসের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে যে বিস্ফোরক ও ধারাবাহিক শুরুর প্রত্যাশা করা হয়, তা প্রায়ই দেখা যায় না। তার টি-টোয়েন্টি স্ট্রাইক রেট নিয়েও রয়েছে বিস্তর সমালোচনা। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো গড় থাকা অনেক ব্যাটসম্যান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এসে সেই ছন্দ ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন। বাংলাদেশের পক্ষে টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ব্যাটিং গড় বর্তমানে ২৮.৭৬-যা দলের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্যের তুলনায় মোটেও সন্তোষজনক নয়। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয়, কেন বিশ্বকাপের আগে এই বিশেষ প্রশিক্ষণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
মাঝের ওভার ও ডেথ ওভারে ব্যর্থতার গল্প
বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের মূল সমস্যা কেবল দ্রুত রান তুলতে না পারা নয়, বরং পুরো ইনিংস জুড়েই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়া। বিশেষ করে ৭ থেকে ১৫ ওভারের মাঝের সময়ে স্পিনারদের বিপক্ষে স্ট্রাইক রোটেট করতে না পারা এবং ডেথ ওভারে পর্যাপ্ত বাউন্ডারি হাঁকাতে না পারা বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই সময় অতিরিক্ত ডট বল খেলে ফেলার কারণে রান রেট নেমে যায়, আর শেষ দিকে বড় শট খেলার জন্য অযথা চাপ তৈরি হয়। সেই চাপেই হুড়োহুড়ি করে শট খেলতে গিয়ে দ্রুত উইকেট হারানোর প্রবণতা দেখা যায়। ফলে বাধ্য হয়ে লোয়ার অর্ডার বা বোলারদের ব্যাটের দিকে তাকাতে হয়, যেখানে তানজিম সাকিবের মতো বোলার-অলরাউন্ডারদের ওপর অপ্রত্যাশিত ব্যাটিংয়ের দায়িত্ব পড়ে যায়। তানজিম বোলিংয়ে দুর্দান্ত হলেও, নিয়মিত ব্যাটিং ভরসা হিসেবে তাকে নির্ভরযোগ্য ধরা যায় না-এই বাস্তবতা দল পরিচালনাও ভালোভাবেই জানে।
ক্যাম্পে কী নিয়ে কাজ করা হচ্ছে
ফিল সিমন্স, মোহাম্মদ আশরাফুল ও মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের সমন্বিত প্রশিক্ষণে ব্যাটিংয়ের প্রতিটি সমস্যার গভীরে গিয়ে কাজ করা হচ্ছে। টাইমিং ঠিক রাখা, সঠিক শট নির্বাচন, সুইপ ও রিভার্স সুইপের মতো আধুনিক শট, পাওয়ার হিটিংয়ের কৌশল এবং পরিস্থিতি বুঝে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং-সবকিছুর ওপরই আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া স্পিনের বিপক্ষে রান বের করার কৌশল, ডেথ ওভারে ইয়র্কার ও স্লোয়ারের বিরুদ্ধে ব্যাটিং, ইনিংস গড়ার পাশাপাশি শেষের দিকে ফিনিশিং দক্ষতা বৃদ্ধির দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যেখানে প্রতি ওভারেই ১৫-এর বেশি স্ট্রাইক রেট ধরে রাখা প্রায় বাধ্যতামূলক, সেখানে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের এখন ভয়ডরহীনভাবে বড় শট খেলার মানসিকতা তৈরি করাই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
বিশ্বকাপের আগে আত্মবিশ্বাস ফেরানোর লড়াই
ফেব্রুয়ারির টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক মঞ্চের আগে এই বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। প্রধান কোচের সরাসরি তত্ত্বাবধান এবং দেশের সেরা দুই ব্যাটিং কোচের নিবিড় পরিচর্যা মূল ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলেই বিশ্বাস সংশ্লিষ্টদের। এই ক্যাম্প কেবল স্কিল উন্নয়নের জায়গা নয়, বরং মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষার মঞ্চও। বাংলাদেশ দলের বড় চ্যালেঞ্জ এখন ভয় ঝেড়ে ফেলে আধুনিক টি-টোয়েন্টির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। রক্ষণাত্মক ব্যাটিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখাতেই হবে।
ভক্তদের অপেক্ষা-পরিবর্তনের প্রতিফলন কবে
বিশ্বকাপের আগে এই বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, সেটিই এখন কোটি ক্রিকেটভক্তের বড় প্রশ্ন। দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা তাকিয়ে আছেন-এই ক্লাস শেষে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সত্যিই কি আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন? বড় দলের বিপক্ষে কি আর বারবার মুখ থুবড়ে পড়তে হবে, নাকি দেখা যাবে এক নতুন আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ? যদি এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যাটিং লাইনআপ শক্ত ভিত গড়ে তুলতে পারে, তবেই আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষের জন্য তৈরি হবে সত্যিকারের কঠিন চ্যালেঞ্জ।
ভোরের আকাশ/এসএইচ