আপসহীন নেত্রীর বিদায়ে শোকের ছায়া ক্রীড়াঙ্গনেও

বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনও। সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে রাজনীতির পাশাপাশি দেশের মাঠে-ঘাটে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। প্রতিযোগিতা, উল্লাস আর উত্তেজনার চেনা দৃশ্যের বদলে আজ ক্রীড়াঙ্গনে বিরাজ করছে নীরবতা, শ্রদ্ধা ও সম্মানের আবহ।
গতকাল মঙ্গলবার ভোর ছয়টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নানা জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা, লাইফ সাপোর্ট ও নিয়মিত ডায়ালিসিস-সব কিছুর পরও শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলাদেশের এই আপসহীন ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেত্রী। তার মৃত্যুতে গোটা দেশ যেমন শোকে মুহ্যমান, তেমনি সেই শোক ছুঁয়ে গেছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকেও।
জাতীয় শোকের প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত ঘোষণা করে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দিনের নির্ধারিত দুটি ম্যাচ। সূচি অনুযায়ী গতকাল সিলেট টাইটান্স ও চট্টগ্রাম রয়্যালসের পাশাপাশি ঢাকা ক্যাপিটালস ও রংপুর রাইডার্সের মুখোমুখি হওয়ার কথা থাকলেও দেশের শোকাবহ বাস্তবতায় মাঠে গড়ায়নি কোনো ম্যাচ।
বিসিবি জানায়, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্থগিত ম্যাচগুলোর নতুন সময়সূচি পরবর্তীতে জানানো হবে। ক্রিকেটে থামার রেশ পড়েছে ফুটবল অঙ্গনেও। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) জাতীয় শোকের কারণে ফেডারেশন কাপের দিনের সব ম্যাচ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়। শুধু সিনিয়র ফুটবল নয়, প্রভাব পড়ে বয়সভিত্তিক ও নারী ফুটবল প্রতিযোগিতাতেও। নোয়াখালীতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল ম্যাচ বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে নারী ফুটবল লিগের নির্ধারিত ম্যাচগুলোও স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
বাফুফের সহসভাপতি ফাহাদ রহমান গণমাধ্যমকে জানান, জাতীয় শোকের বিষয়টি আমাদের সবার ঊর্ধ্বে। সব আয়োজন আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। আগামী দিনে পরিস্থিতি বিবেচনা করে খেলা শুরুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তার বক্তব্যেই স্পষ্ট-এই মুহূর্তে খেলাধুলার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে শোক ও সম্মান। প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও শোক প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়াবিদরা।
বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক লিটন দাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমবেদনা জানিয়ে লেখেন, এই শোকের মুহূর্তে তার পরিবার ও দেশবাসীর প্রতি গভীর সমবেদনা। ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ দোয়া চেয়ে লেখেন, মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান দান করুন।
অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম বিসিবির শোকবার্তার ছবি পোস্ট করে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল লেখেন, তার প্রয়াণে দেশ হারাল এক দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক। অলরাউন্ডার ও সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসানও শোক জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেশের জন্য তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি দলগুলোর পক্ষ থেকেও একের পর এক শোকবার্তা আসে। রংপুর রাইডার্স, সিলেট টাইটান্স ও রাজশাহী ওয়ারিয়র্স তাদের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে। এসব বার্তায় রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একজন রাষ্ট্রনায়ক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাই প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দৃঢ় অবস্থানের প্রতীক। তার আপসহীন নেতৃত্ব, সংগ্রামী জীবন ও দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা দেশের ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে থাকবে। সেই অধ্যায়ের ইতি টানার দিনে তাই কেবল রাজনীতি নয়-দেশের ক্রীড়াঙ্গনও আজ নীরবে মাথা নত করেছে। মাঠে নেই ব্যাট-বলের লড়াই, নেই গোল উদ্যাপনের উল্লাস। আছে শুধু নীরবতা, শ্রদ্ধা আর একটি জাতির সম্মিলিত শোক। একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিদায়ে বাংলাদেশ যেন আজ একসঙ্গে থমকে গেছে-মাঠে, গ্যালারিতে এবং মানুষের হৃদয়ে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ