নারী ফুটবল এখন আর আড়ালে নয়, আলোর সামনে আরও দূরন্ত

রোদে-ভেজা একটা বিকেল। কমলাপুরের স্টেডিয়ামে তখনো দর্শকদের উল্লাস থামেনি। বাংলাদেশের মেয়েরা ইতিহাস গড়ে ফেলেছে- প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে এএফসি নারী এশিয়ান কাপে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সমানভাবে উচ্ছ্বাস ভারতের নারী দলেও। নারী ফুটবলে দক্ষিণ এশিয়ার এই উত্থান যেন নতুন সময়ের বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সাফল্যের নতুন অধ্যায়
এই প্রথমবারের মতো ৭টি সাফ দেশের সবাই- বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা অংশ নেয় ফিফা নারী বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে। আর সেই অংশগ্রহণ থেকেই জন্ম নেয় বিরল সাফল্য। বাংলাদেশ ও ভারত নিশ্চিত করে ২০২৬ এএফসি নারী এশিয়ান কাপে জায়গা। ২৭ বছর পর আবার দুটি দক্ষিণ এশীয় দেশ খেলবে এই টুর্নামেন্টে - যা ২০২৭ ফিফা নারী বিশ্বকাপ (ব্রাজিল) বাছাইয়ের প্রথম ধাপ হিসেবেও কাজ করবে। সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে ভারত ও নেপাল অংশ নিয়েছিল এশিয়ান কাপে।

ফিফার নারী ফুটবলের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট সায়মন টোসেলি তাই একে বলছেন, ‘ঐতিহাসিক অর্জন” “সঠিক পরিকল্পনা ও ফিফা প্রোগ্রামের সহায়তা পেলে সাফ অঞ্চলের নারী ফুটবল কোথায় পৌঁছাতে পারে, এটাই তার প্রমাণ।”
বাংলাদেশ: কখনো জয় না পাওয়া দল থেকে অপরাজিত কোয়ালিফায়ার
বাংলাদেশের গল্পটি আরও অনুপ্রেরণার। একসময় যারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে জয় খুঁজতেও হিমশিম খেত, সেই মেয়েরাই এখন অপরাজিত থেকে পৌঁছে গেছে এশিয়ার অভিজাত প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মতো। বাফুফের সাম্প্রতিক উদ্যোগ, তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফার সহায়তা- সব মিলেই যেন বদলে যাচ্ছে মেয়েদের ফুটবলের মানচিত্র। বাফুফে চালু করেছে দেশের প্রথম নারীবিষয়ক কৌশলগত পরিকল্পনা ‘এমপাওয়ার হার: ২০২৪-২০২৭’।

বাফুফে সভাপতি তাবিথ আওয়াল বললেন, “ফিফার আর্থিক ও কাঠামোগত সহায়তাই আমাদের বেঙ্গল টাইগ্রেসদের এই ঐতিহাসিক সাফল্য এনে দিয়েছে। দেশে নারী ফুটবলের সচেতনতা ও সমর্থন বেড়েছে, যার প্রভাব সরাসরি খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে পড়েছে।”
ভারত: অবরুদ্ধ অতীত ভেঙে শক্ত প্রত্যাবর্তন
২৩ বছর পর মাঠের লড়াইয়ে কোয়ালিফাই করে ভারতীয় নারী দলও। ২০২২ সালে স্বাগতিক হয়েও কোভিডের কারণে টুর্নামেন্ট থেকে শেষ মুহূর্তে বাদ পড়ে দলটি। সেই হতাশা আজ শক্তিতে রূপ নিয়েছে। এআইএফএফ দীর্ঘদিন ধরে ফিফার সঙ্গে কাজ করছে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে। ২০১৬ সালে মাত্র ২৫ ক্লাব নিয়ে শুরু হওয়া ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগ এখন ১০৪ ক্লাব আর ১২০০-এর বেশি খেলোয়াড় নিয়ে চলছে। ‘ভিশন ৪৭’ প্রকল্পের লক্ষ্য-২০৪৭ সালের মধ্যে এশিয়ার শীর্ষ চার নারীবান্ধব ফুটবল জাতির একটি হওয়া।
এআইএফএফ সভাপতি কল্যাণ চৌবে বলেন- “ফিফার সহায়তা ছাড়া নারী ফুটবলের উন্নয়ন এতদূর এগোতে পারত না। ২৮ বছর পর আমাদের সিনিয়র দল আবার এশিয়ান কাপে উঠেছে- এটা অসাধারণ। ২০২২ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ নারী বিশ্বকাপ আয়োজনের পর মেয়েদের ফুটবলে নিবন্ধন ২৩২ শতাংশ বেড়েছে।”
উন্নয়ন শুধু মাঠে নয়- সংগঠন ও সমাজের ভরসা বাড়ছে
দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবল এখন শুধু মাঠের গোল বা জার্সির রঙে সীমাবদ্ধ নয়। ফেডারেশনগুলোর সংগঠনগত প্রস্তুতি, ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন- সব মিলেই নারী খেলোয়াড়দের সামনে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
এশিয়ান কাপে বাংলাদেশ ও ভারত সাফল্যের বেশি কিছু
২০২৬ সালের এশিয়ান কাপে বাংলাদেশ ও ভারতের অংশ নেওয়া কেবল একটি টুর্নামেন্টে খেলতে যাওয়া নয় এটা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের এগিয়ে যাওয়ার বার্তা। এক দীর্ঘ যাত্রার ফল, এক অঞ্চলের স্বপ্নপূরণ, এক নতুন ভবিষ্যতের দরজা। নারী ফুটবল এখন আর আড়ালে নয়- এবার আলোতেই, সামনে আরও দূরন্ত।
ভোরের আকাশ/এসএইচ