চ্যালেঞ্জার্স কাপ জয়ের পরও দুশ্চিন্তা
বাংলাদেশ হকির ভবিষ্যৎ কোন পথে

বাংলাদেশের হকি ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে অনূর্ধ্ব-২১ দলের যুবারা। প্রথমবারের মতো হকি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই শুধু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করাই নয়, অস্ট্রিয়াকে ৫-৪ গোলে হারিয়ে চ্যালেঞ্জার্স কাপ জয়ের অসাধারণ কীর্তি গড়েছে আমিরুল-মেহরাবরা। বিশ্ব আসরে এই জয় শুধু দলের জন্য নয়, দেশের খেলাধুলার ইতিহাসেও এক গৌরবময় সাফল্য। মাঠের লড়াইয়ে ‘হকির হামজা’ খ্যাত আমিরুল ইসলামের হ্যাটট্রিক আলো কেড়ে নিয়েছে বিশ্বমঞ্চেও।
কিন্তু মাঠের উজ্জ্বল সাফল্যের পাশে দাঁড় করালে দেশের হকির বাস্তবতা হয়ে ওঠে নিষ্ঠুর। ঘরোয়া হকির ভয়াবহ অনিয়মিত কাঠামো, টুর্নামেন্টের অভাব এবং খেলোয়াড়দের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-মোট কথা বড় অর্জনের পরও তারা যেন ছায়ার ভেতরেই বন্দি।
অসম্পূর্ণ প্রস্তুতি, সীমিত সুযোগ-তবু বিস্ময় বাংলাদেশের
জুনিয়র বিশ্বকাপের আগে পরিকল্পনা ছিল ছয় মাসের অনুশীলন ক্যাম্প, যেখানে শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি থেকে কৌশলগত দক্ষতা-সবকিছু শাণিত করার কথা। কিন্তু অর্থ সংকট এই পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দেয়। ক্যাম্পের মেয়াদ কমে দাঁড়ায় চার মাসে। নেদারল্যান্ডস থেকে অভিজ্ঞ কোচ সিগফ্রায়েড আইকম্যানকে আনা হলেও ইউরোপে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় কয়েকটি ম্যাচ এবং দেশে সিনিয়র দলের বিপক্ষে কিছু প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে দল বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়ায়। প্রস্তুতিহীন অবস্থায় বড় মঞ্চে ওঠা যে কতটা কঠিন, তা বলাই বাহুল্য। তবু জুনিয়ররা মাঠে এমন লড়াকু মনোবল দেখিয়েছে, যা বাংলাদেশের হকি ইতিহাসে বিরল। গ্রুপপর্বে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে শুরুর লড়াই, এরপর দক্ষিণ কোরিয়াকে রুখে দেওয়া, ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে হার-বাংলাদেশের তরুণরা নিজেদের প্রতিভা ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত রেখেছে সবার সামনে।
স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ওমানকে হারানো, তারপর দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস আকাশে তুলে নেয় লাল-সবুজের যোদ্ধারা। সবশেষে অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে ১৭তম স্থান নিশ্চিত করে তারা, যা এনে দেয় চ্যালেঞ্জার্স কাপের শিরোপা-একবারও না হওয়া এই লড়াইয়ে প্রথমবারেই এমন সাফল্য সত্যিই অভূতপূর্ব।
তারপরও আক্ষেপের সুর-‘নিয়মিত খেলার সুযোগ কোথায় : বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা রাকিবুল হাসান রাকিব বলেন, বিশ্বকাপে বড় দলগুলোর সঙ্গে খেলে দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু এই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে হলে নিয়মিত খেলা দরকার। নিয়মিত না খেললে এই অর্জন কোনো কাজে আসবে না। বাংলাদেশের ঘরোয়া হকির চিত্র সত্যিই হতাশার।
সর্বশেষ প্রিমিয়ার হকি লীগ হয়েছে ২০২৩ সালে, সেটিও শেষ হয়নি-আবাহনী ও মেরিনার্সকে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় :
গত ২৭ বছরে প্রিমিয়ার লীগ হয়েছে মাত্র ১৩ বার
প্রথম বিভাগ হকি হয়েছে মাত্র ১২ বার
দ্বিতীয় বিভাগ লীগ হয়েছে মোটে ৫ বার
যেখানে নিয়মিত টুর্নামেন্টই নেই, সেখানে প্রতিভা ধরে রাখা তো দূরের কথা, নতুন প্রতিভা উঠে আসার পথও দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
ফিটনেস, ফর্ম ও ভবিষ্যৎ-সবই অনিশ্চয়তায়
গত বছরের নভেম্বরে দায়িত্ব নেওয়া অ্যাডহক কমিটি গত ১৩ মাসে আয়োজন করতে পেরেছে মাত্র তিনটি টুর্নামেন্ট। সামনে খেলোয়াড়দের বড় ছুটি। মার্চে এশিয়ান গেমসের বাছাইপর্বের আগে অনেকদিন খেলাধুলার বাইরে থাকতে হবে জুনিয়র ও সিনিয়রদের। এ অবস্থায় খেলোয়াড়রা শঙ্কার কথাই বেশি বলছেন। খেলা ছাড়া ফিটনেস ধরে রাখা কঠিন। দক্ষতা হারিয়ে যায়, ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, আর ক্রীড়াঙ্গনে এটাই সবচেয়ে বড় ধস। আমিরুল বলেন, বেশি ম্যাচ খেললে বেশি শেখা যায়। ভুল-ত্রুটিও ধরা পড়ে। যেখানে খেলার সুযোগই কম, সেখানে উন্নতি করব কীভাবে?
যত্ন পেলে বিশ্বকাপের মূল পর্বেও যেতে পারবে বাংলাদেশ
চ্যালেঞ্জার্স কাপ জেতা দলের তারকা ওবাইদুল হাসান বিশ্বাস করেন- এই দলটাকে যদি নিয়মিত পরিচর্যা, অনুশীলন ও খেলার সুযোগ দেওয়া যায়, আমরা সোজা সিনিয়র বিশ্বকাপেও জায়গা করে নিতে পারবো। তরুণদের মুখে এই আত্মবিশ্বাস সহজেই বলে দেয়Ñসুযোগ পেলেই বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে আরও বড় বিস্ময় উপহার দিতে পারে।
দায় চাপানোর খেলায় ব্যস্ত ফেডারেশন : ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) রিয়াজুল হাসান বলেন, অর্থ সংকটে দলগুলো লীগ খেলতে চায় না। ভারত যাওয়ার আগে একবার বসেছিলাম। এ মাসে আবারো চিঠি দেবো। তবে প্রিমিয়ার লীগ শুরু হবে কবে-সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি তিনি। ফলে তরুণদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ঝুলে আছে অনিশ্চয়তার দোলাচলে।
এই সাফল্যের আলো টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই দরকার সঠিক সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২১ হকি দলের সাফল্য প্রমাণ করেছে-দেশে প্রতিভার অভাব নেই, অভাব শুধু সঠিক পরিচর্যা, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতার। নিয়মিত লীগ চালু করা, আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা, ক্লাবগুলোকে খেলায় উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্প সচল রাখা-এই চারটি দিকেই এখন নজর দিতে হবে। অন্যথায় জুনিয়র হকি বিশ্বকাপের এই ঐতিহাসিক অর্জন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাবে, যেমন হারিয়ে গেছে দেশের অনেক সম্ভাবনার গল্প। বাংলাদেশ হকি বাঁচাতে এখনই দরকার শক্ত সিদ্ধান্ত-নইলে চ্যালেঞ্জার্স কাপের এই উজ্জ্বল সাফল্যও হবে কেবল অতীতের আরেকটি স্মৃতি।
ভোরের আকাশ/এসএইচ