দিল্লি সফর বাতিলের পরই আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে শুরু নানা প্রশ্ন

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার ঘোষণা আসার পরদিনই ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায়। এতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গিয়ে চলমান সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
ঘটনাগুলোর সময়গত মিলকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি নিছক কারিগরি ও জ্বালানি সংকটের ধারাবাহিকতা, নাকি ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহও চাপ তৈরির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে?
তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো নথি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার বা আদানি পাওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেছে।
সফর না যাওয়ার ঘোষণা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বেও তার অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত তিনি সফরে যাচ্ছেন না বলে ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়। বাংলাদেশের অবস্থান ছিল, ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলেও জানানো হয়।
এর পরদিনই সামনে আসে আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর।
কী ঘটেছে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে
ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটি মূলত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পরিচালিত হচ্ছে।
১১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটি আগের রাতে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে।
কেন্দ্রটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বয়লারের একটি সমস্যার কারণে ইউনিটটি বন্ধ হয়েছে। মেরামতের আগে ইউনিটটি ঠাণ্ডা হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। পিডিবির এক সদস্যের তথ্য অনুযায়ী, একটি ফিড ইউনিটে সমস্যা দেখা দেওয়ায় অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়ার কারণে সেটি বন্ধ করতে হয়েছে। পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে।
অর্থাৎ আদানি পাওয়ারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংকটের কারণ রাজনৈতিক নয়; প্রথমে কয়লা পরিবহনে সমস্যা এবং পরে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন কমেছে।
কয়লা সরবরাহেও ছিল সংকট
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর আদানি পাওয়ার জানিয়েছিল, ভারতের রেলওয়ে নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ, বিভিন্ন স্থানে লোডিং বিধিনিষেধ ও কয়লা পরিবহনে বিঘ্নের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ কমে গেছে।
কোম্পানিটি জানায়, তারা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানিয়েছে এবং কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক করতে ভারতীয় রেলের সঙ্গে কাজ করছে।
ফলে দিনের অফ-পিক সময়ে উৎপাদন কমিয়ে সন্ধ্যার চাহিদার সময় সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল। পরে কয়লা সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায়।
২০১৭ সালের চুক্তি, ২৫ বছরের দায়
আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয় ২০১৭ সালে। এটি বর্তমান সরকারের করা চুক্তি নয়; আগের সরকারের সময় করা দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ এখনো বিদ্যুৎ কিনছে।
এখানেই চুক্তিগত দায়ের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি বহাল থাকা অবস্থায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি সংগ্রহ, উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা ও নির্ধারিত সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে কী ধরনের দায় রয়েছে, তা চুক্তির নির্দিষ্ট ধারা পর্যালোচনা করেই নির্ধারণ করতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের চুক্তিতে বিরোধ বা চুক্তি লঙ্ঘনের পরিস্থিতিতে পুনর্বিবেচনা বা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকতে পারে। তবে সেটি সম্পূর্ণভাবে চুক্তির শর্ত ও ধরননির্ভর।
তাই প্রশ্ন শুধু বিদ্যুৎ কেন কমেছে তা নয়; চুক্তিতে এমন পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশের কী ধরনের সুরক্ষা রাখা হয়েছিল এবং প্রয়োজন হলে সেই সুরক্ষা কীভাবে কার্যকর করা হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটের মিল
আগে থেকেই দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাপের মধ্যে ছিল। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছিল না।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে আদানি পাওয়ারও কয়লা সরবরাহের সমস্যার কথা জানিয়েছিল। এর মধ্যেই ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না।
আর ঠিক পরদিনই আদানির গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার খবর সামনে আসে।
ঘটনার এই সময়গত নৈকট্যই সন্দেহ তৈরি করছে। তবে সন্দেহ ও প্রমাণ এক বিষয় নয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের অভিযোগ নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ নেই।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের সম্পর্ক রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহাব এনাম খান সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে সরলভাবে ‘ভারতবিরোধী’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, বাংলাদেশ নিজের সার্বভৌম ও আইনগত অবস্থান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে চাইছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ. ড্যানিলোউইচের মতে, অর্থবহ আলোচ্যসূচি ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়া উচিত নয়। তাঁর বক্তব্যেও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তব স্বার্থ ও আলোচনার বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।
দুই বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের একটি জায়গায় মিল রয়েছে—ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন আগের কাঠামোয় নেই; নতুন বাস্তবতায় দুই দেশকেই সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ কি কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হতে পারে?
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে অনেকটাই আমদানিনির্ভর। গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেও জাতীয় গ্রিডে বড় ঘাটতি ও ব্যাপক লোডশেডিংয়ের খবর এসেছে।
এ অবস্থায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে। এ কারণেই আদানি চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এর আগে বলেছেন, আদানি চুক্তিতে গুরুতর অসাম্য থাকলে সেটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমও চুক্তিটিকে একতরফা হিসেবে সমালোচনা করে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই পুরোনো প্রশ্নটি আবার সামনে এনেছে—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা কি এমন কোনো চুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যার সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে?
কেন বিকল্প ব্যবস্থা নেই?
একটি ইউনিট বন্ধ হওয়া একটি কারিগরি ঘটনা হতে পারে। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে এর প্রভাব যদি হাজার হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি করে, তাহলে দেশের নিজস্ব বিকল্প উৎপাদন ও আমদানি ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত ‘বাফার’ আছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
কারণ বর্তমান সংকট শুধু আদানির কারণে তৈরি হয়নি। ইউনিটটি বন্ধ হওয়ার আগেই গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটে দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাপে ছিল।
১১ সেপ্টেম্বরের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ছিল, যেখানে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
অর্থাৎ আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়া বিদ্যমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।
যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
বর্তমান পরিস্থিতিতে আদানি পাওয়ার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চাওয়া জরুরি—
১. গোড্ডা কেন্দ্রের বয়লার বা ফিড ইউনিটে ঠিক কী ধরনের ত্রুটি হয়েছে?
২. ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর কত সময়ের মধ্যে মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে?
৩. একটি ইউনিট বন্ধ থাকলেও অন্য ইউনিটের উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে কি না?
৪. আগস্ট থেকে কয়লা সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি কেন দীর্ঘস্থায়ী হলো?
৫. বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিতে সরবরাহ ব্যাহত হলে আদানি পাওয়ারের নির্দিষ্ট দায় কী?
৬. সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ কী ধরনের ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিগত প্রতিকার পেতে পারে?
৭. ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এই সরবরাহ সংকট সম্পর্কে অবহিত কি না এবং তারা সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখছে কি না?
৮. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না?
শেষ প্রশ্নটির উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এবং সবচেয়ে কঠিন।
বিদ্যুৎ সংকটের রাজনৈতিক প্রভাব
বিদ্যুৎ সংকট কখনো শুধু বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। লোডশেডিং বাড়লে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে, শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ে এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
তাই এই সংকটকে দেশের ভেতরে কেউ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে কি না, আদানি ইস্যুকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারণা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও যাচাই করা দরকার।
কারণ বিদেশি চাপ থাকলেও সেটিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই।
বিদ্যুৎ রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দিল্লি যাবেন কি না, সেটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত।
একইভাবে ভারতের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চুক্তিও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নয়—চুক্তির শর্ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রীতি ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ আদানির কাছ থেকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ নেয় না। এই বিদ্যুতের জন্য অর্থ পরিশোধ করা হয়। ফলে এটি কোনো অনুদান নয়; এটি একটি বাণিজ্যিক চুক্তি। সরবরাহ ব্যাহত হলে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের অধিকার ও প্রতিকারের বিষয়টি তাই সামনে আসবেই।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট—
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল;
ঢাকা জানিয়েছে, ‘অনুকূল পরিবেশ’ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরে পাঠানোর বিষয়ে তারা আগ্রহী নয়;
১০ সেপ্টেম্বর ব্রিকস সফরে তারেক রহমানের না যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়;
এর পরদিনই আদানির গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায় এবং বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।
এই ঘটনাগুলো পরপর ঘটেছে—এটি তথ্য। কিন্তু এগুলো পরস্পরের কারণে ঘটেছে—এটি এখনো প্রমাণিত নয়।
সুতরাং বিষয়টি নিয়ে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তের বদলে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত। যদি এটি নিছক কারিগরি ত্রুটি হয়, তাহলে আদানি পাওয়ারের দ্রুত স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিস্তারিত প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।
আর যদি কোনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয় নয়—এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন।
ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক প্রতিহিংসার নয়, পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। বিদ্যুৎ কোনোভাবেই রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—তারেক রহমান দিল্লি গেলেন না, আর ঠিক তখনই কেন আদানির বিদ্যুৎ উৎপাদন কমল? এটি কি নিছক কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে আরও কোনো হিসাব আছে?
এর উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়; চুক্তি, নথি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের তথ্য এবং আদানি ও সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষের জবাবেই খুঁজতে হবে।
ভোরের আকাশ/জেআ