আন্তর্জাতিক যুব পারমাণবিক কংগ্রেসের ফাইনালে বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক যুব পারমাণবিক কংগ্রেস (IYNC 2026)-এর বৈশ্বিক উদ্ভাবন প্রতিযোগিতা 'গ্লোবাল ইনোভেশন ফর নিউক্লিয়ার (I4N)'-এর ফাইনালে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ইয়ুথ নিউক্লিয়ার কংগ্রেস (BYNC) আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা 'ইনোভেনচার ২০২৬'-এর বিজয়ী দল আগামী ৪ থেকে ৯ অক্টোবর ফ্রান্সের অ্যাভিনিয়নে অনুষ্ঠিতব্য মূল আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। আইওয়াইএনসি (IYNC)-এর ৪৯তম সদস্য দেশ হিসেবে এটি বৈশ্বিক পারমাণবিক উদ্ভাবন মঞ্চে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও গৌরবময় অর্জন।

বাংলাদেশ এখন পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে, এবং এই যুগে টিকে থাকতে হলে পরমাণু প্রযুক্তিতে দেশীয় সক্ষমতা অর্জন ও এই খাতে তরুণদের এগিয়ে আসা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। দেশের প্রথম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্রকল্প Rooppur পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট শীঘ্রই জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে যাচ্ছে। এই মাইলফলকের সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যান্ট পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য দক্ষ স্থানীয় জনশক্তির প্রয়োজনীয়তা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে, যেখানে দেশীয় তরুণ নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর ঠিক এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দেশের তরুণদের হাত ধরে এসেছে এই উল্লেখযোগ্য অর্জন।

আগামী ৪-৯ অক্টোবর ফ্রান্সের অ্যাভিগনঁর ঐতিহাসিক Palais des Popes-এ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে International Youth Nuclear Congress (IYNC)-এর ১৩তম আসর, IYNC2026, থিম "The Chain of Change"। ২০০০ সালে প্রথম কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া IYNC-এর ২৬ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ১৩তম কংগ্রেসে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ থেকে ৫০০-র বেশি তরুণ নিউক্লিয়ার পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীর এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে Team BYNC (Bangladesh Youth Nuclear Congress)। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কংগ্রেসের Innovation for Nuclear (I4N) প্রতিযোগিতায় এটিই BYNC-এর প্রথম অংশগ্রহণ, এবং প্রথম প্রচেষ্টাতেই তারা সরাসরি আন্তর্জাতিক ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে।
সম্মেলনটি IAEA ও World Nuclear Association (WNA)-এর সহায়তায় এবং ফ্রান্সের SFEN Jeunes Génération-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে। এর সঙ্গে ইতিমধ্যে যুক্ত হয়েছে Urenco, Westinghouse, Tractebel, Assystem ও Nuvia-র মতো বৈশ্বিক নিউক্লিয়ার শিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান, যা এই আয়োজনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব ও মানের একটি স্পষ্ট প্রমাণ।
সাতটি দলের মধ্যে বাংলাদেশ একাই
I4N 2026-এর ফাইনালে মোট সাতটি দল প্রতিযোগিতা করছে, যেগুলো এসেছে পাঁচটি অংশীদার প্রতিষ্ঠান থেকে এবং পাঁচটি মহাদেশ থেকে প্রতিনিধিত্ব করছে। এই সাত দলের মধ্যে Nuclear Innovation Bootcamp (NIB) ও European Nuclear Society-Young Generation Network (ENS YGN) থেকে দুটি করে দল আছে, আর Japan Nuclear Young Generation (Japan YG) ও African Young Generation in Nuclear (AYGN)-এর মতো প্রতিষ্ঠিত ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক থেকে একটি করে দল রয়েছে। এই তালিকায় একমাত্র দক্ষিণ এশীয় ও একমাত্র বাংলাদেশী সংগঠন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে BYNC।
ইউরোপ ও জাপানের মতো প্রতিষ্ঠিত নিউক্লিয়ার শিল্পের পাশে, যেখানে দশকের পর দশক ধরে সংগঠিত ইয়ুথ নেটওয়ার্কগুলো কাজ করছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক তরুণ নিউক্লিয়ার কর্মসূচির দেশ থেকে BYNC প্রথম অংশগ্রহণে ফাইনালে পৌঁছে গেছে। প্রথমবারের এই সরাসরি সাফল্য একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। বাংলাদেশের তরুণদের শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতাই নেই, আন্তর্জাতিক মানের সাংগঠনিক সক্ষমতাও আছে। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে তরুণ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে একটি অগ্রণী ভূমিকা নিতে সক্ষম, এই অর্জন তারও স্পষ্ট বার্তা বহন করে। একইসঙ্গে এটি দেশের নিউক্লিয়ার খাতে ভবিষ্যতে আরও তরুণ প্রতিভার জন্য আন্তর্জাতিক দুয়ার খুলে দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করে।
গল্পের শুরু বাংলাদেশে
Team BYNC-এর এই অর্জনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল দেশের ভেতরেই। বাংলাদেশের তরুণদের নিউক্লিয়ার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠে Bangladesh Youth Nuclear Congress (BYNC), যার প্রতিষ্ঠাতারা নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ৩ শিক্ষার্থী — মাহমুদুল হাসান সামি (সভাপতি), সাদিয়া নওশীন প্রমি (সহ-সভাপতি) এবং নাজিফা তাসনিম (সাধারণ সম্পাদক)।
সংগঠনের শুরুর দিনগুলোতে এই তিনজনের হাতে তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছিল না। তিনজনের ছিল অভিন্ন স্বপ্ন, বিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রম, বাংলাদেশের তরুণদেরও বিশ্ব নিউক্লিয়ার মঞ্চে জায়গা করে দিতে হবে। দীর্ঘ সংগ্রাম ও ধারাবাহিক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তাঁরা সেই ভাবনাকে একটি কার্যকর সংগঠনে রূপ দিয়েছেন, এবং আজ IYNC2026-এর ফাইনালে Team BYNC-এর উপস্থিতি সেই স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন। এই অর্জন দেশের বিশাল তরুণ শক্তিকে পরমাণুখাতে আরও উৎসাহিত করবে, তাদের জন্য বিশ্বমঞ্চে সুযোগ তৈরি করবে, এবং এক বিশ্বাস প্রোথিত করবে, আমরাও পারি।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি দেশজুড়ে একাধিক কর্মশালা, সেমিনার ও প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছে। এর একটি বড় দৃষ্টান্ত গত ৮ আগস্ট AIUB-তে আয়োজিত I4N x Innoventure প্রতিযোগিতা, যেখানে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয় এবং ৭০টি দল প্রতিযোগিতা করে নিউক্লিয়ারভিত্তিক উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে। আয়োজনের ভেন্যু ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়েছে AIUB, যারা দেশের তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে এই আয়োজনের পাশে দাঁড়ায়। একইসঙ্গে অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয় রাশিয়ান দূতাবাসের সাংস্কৃতিক বিভাগ Russian House, যাদের সক্রিয় সহযোগিতা এই আয়োজনকে সমৃদ্ধ করেছে।
এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন AIUB-এর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. আব্দুর রহমান এবং Russian House-এর পরিচালক আলেকজান্দ্রে খেলভনয়। প্রতিযোগিতায় উপস্থিত ছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় পরমাণুবিজ্ঞানী, শিল্প বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদগণ। একাডেমিয়া থেকে কূটনীতি, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আজ বিশ্বমঞ্চে, এই তিনটি বিষয়কে BYNC একসূত্রে গেঁথেছে। সবার এই সমর্থন ও অনুপ্রেরণা BYNC-এর জন্য একটি মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশের তরুণদের নিউক্লিয়ার প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার গতি ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করেছে। এই জাতীয় কার্যক্রমের ধারাবাহিকতাতেই এখন Team BYNC পৌঁছেছে IYNC-এর আন্তর্জাতিক ফাইনালে। "প্রথমবার অংশ নিয়েই সরাসরি ফাইনালে পৌঁছানো, এটাই প্রমাণ করে বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত নিউক্লিয়ার শক্তিগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের তরুণরাও এই খাতে প্রযুক্তি ও সংগঠন, দুটোতেই সমান সক্ষম," বলেন BYNC-এর একজন প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্ব।
নেতৃত্বে যারা
BYNC-এর এই পথচলায় দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছেন বাংলাদেশ পরমাণুশক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. আলী জুলকারনাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম এবং এমআইএসটির নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলতাব হোসেন। প্রতিষ্ঠাতা তিনজনের পাশাপাশি সংগঠনের কার্যক্রমে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থী জারিন তাহসিন আঞ্জুম, এবং এমআইএসটির প্রভাষক ফাহিম সাবাব সিদ্দিকী, আর সংগঠনের ডিজিটালাইজেশন করেছেন নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তামিম মোহাম্মদ রায়েদ।
সম্মেলনে BYNC-এর কর্মসূচি
আগামী ৭ অক্টোবর I4N প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক ফাইনালে অংশ নেবে Team BYNC। প্রতিযোগিতার বাইরেও IYNC2026-এ BYNC নিজস্ব একটি কর্মশালা আয়োজন করবে, "Engineering The Extreme: Advanced Materials for Fusion and Fission Energy Systems", যেখানে ফিউশন ও ফিশন প্রযুক্তিতে উন্নত উপকরণের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হবে। এই কর্মশালায় দেশ-বিদেশ থেকে আসা প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন, যা বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক জ্ঞান বিনিময়ের একটি চমৎকার উদাহরণ হয়ে উঠবে।
জাতীয় পর্যায়ের কর্মশালা-প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে আজ ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক মঞ্চে, পাঁচ মহাদেশের সাতটি ফাইনালিস্ট দলের মধ্যে একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে পৌঁছানো, তাও প্রথম অংশগ্রহণেই, Team BYNC-এর এই যাত্রা বাংলাদেশের নিউক্লিয়ার খাতে গড়ে ওঠা একটি নতুন প্রজন্মের সক্ষমতা ও নেতৃত্বের প্রতিফলন।
ভোরের আকাশ/আ.র