বস্তিবাসীদের জন্য পৃথক বাজেট ও স্থায়ী আবাসনের সুপারিশ

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন, স্থায়ী আবাসন, মৌলিক নাগরিক সেবা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের সদস্যরা। এ জন্য নগর দরিদ্রদের কেন্দ্র করে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড) থেকে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সোমবার(২ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর দরিদ্র মানুষের সংকট’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে এসব দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) ও চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশন (সিডব্লিউএফ) আয়োজিত সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বারসিকের পরিচালক মো. কামরুজ্জামান। বারসিকের সমন্বয়ক মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঞ্চালনায় সংলাপে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সিডব্লিউএফ-এর চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরী। আলোচনায় অংশ নেন সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কোষাধ্যক্ষ আমিনুল রসুল, কাপের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক মিহির বিশ্বাস, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র, বস্তিবাসী সুরক্ষা কমিটির সভাপতি হোসনে আরা বেগম রাফেজা প্রমূখ।
সংলাপে সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন বলেন, বিভিন্ন কারণে গ্রামের প্রান্তিক মানুষকে শহরে আসতে হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এসব মানুষের জন্য বসবাস উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। বস্তিগুলোকে বহুতল ভবনে রূপান্তর করা গেলে সেখানে আরো বেশি মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করা যাবে। কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ স্বনির্ভর হয়ে উঠবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংলাপে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের বস্তিতে বসবাসকারী জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর প্রতিনিধি ও কমিউনিটি নেতারা তাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, ২০০২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে সিডর, আইলা, আম্ফান ও রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড়, তীব্র লবণাক্ততা ও নদীভাঙন এবং উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণে প্রায় ৭০ শতাংশ বস্তিবাসী গ্রাম থেকে শহরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ভোলা, বরিশাল, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও খুলনার কয়রা এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের বস্তিতে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন।
সংলাপে জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ৮ দফা দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, নগর পরিকল্পনায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া, জলবায়ু অভিযোজন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভার জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ, বাস্তুচ্যুত মানুষের আবাসন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, বস্তির জরাজীর্ণ ঘরবাড়ির উন্নয়নে সরকারি সহায়তা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া তাপপ্রবাহ, বন্যা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের বিষয়ে বস্তিবাসীদের আগাম সতর্কবার্তা ও সচেতনতা বৃদ্ধি, উচ্ছেদ আতঙ্কমুক্ত স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা এবং বস্তিবাসীদের অধিকার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ আদায়ে সরকারের ভূমিকা জোরদার করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ১৩ দফা দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে জলবায়ু অভিযোজন তহবিল নিশ্চিত করা, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমানো, কৃষকের ফসলের শস্যবীমায় বরাদ্দ, পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চায় আর্থিক সহায়তা এবং অভিযোজনের জন্য বিনা মূল্যে উন্নত প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এছাড়া নগরের নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন ও প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ তহবিল, জলবায়ু তহবিল পাওয়ার শর্ত সহজ করা, স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু অর্থ সহজলভ্য করা এবং নারী, শিশু ও বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়।
ভোরের আকাশ/ এনউব