দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবার একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ১৯৯১ সালের পর দেশে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কোনোবারই ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। প্রতিবারই একজন প্রার্থী থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এবার একাধিক প্রার্থী থাকলে সেই সুযোগ থাকছে না। সে ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের ভোটেই নির্ধারিত হবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয়—দুই ধরনের সরকারব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতেও একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় তপশিল অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। পরে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভোটের ব্যবস্থা চালু করা হয়। তখন জনগণের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল।
পরবর্তীতে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পরোক্ষ ভোটের বিধান চালু হয়। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বর্তমানে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। গত ২৪ জুলাই বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটি শূন্য হয়। সংবিধান অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজউদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবিধানের ১২৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন বৈঠক করে নির্বাচনের তপশিল অনুমোদন করবে। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার সরকারি গেজেটে তপশিল প্রকাশ করবেন। তপশিলে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা এবং প্রয়োজন হলে ভোটগ্রহণের তারিখ, সময় ও স্থান উল্লেখ থাকবে। এ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হয়েছে। তপশিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
তবে একাধিক প্রার্থী না থাকলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। সে ক্ষেত্রে ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে একক প্রার্থীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। এদিকে রাষ্ট্রপতি পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। গত ৯ আগস্ট রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকেও দুটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত বলে জানা গেছে। ফলে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দুজন প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ কারণে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
১৯৯১ সালের পর আর ভোট হয়নি
১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়। এর ফলে জনগণের সরাসরি ভোটের পরিবর্তে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নিয়ম চালু হয়। ১৯৯১ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করে। ওই নির্বাচনে উভয় প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। ফলে সংসদ সদস্যদের ভোট দিতে হয়। নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তিনিই বঙ্গভবনে পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করা প্রথম রাষ্ট্রপতি।
এরপর থেকে আর কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে ভোট দিয়ে একজনকে বেছে নিতে হয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ মনোনীত সাবেক প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এর আগে এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে এলে দলটির মনোনীত প্রার্থী এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে পরের বছর বিএনপির সংসদীয় দলের অনাস্থার মুখে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর বিএনপি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। তিনি ২০০২ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক সংকট ও সংসদ নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার কারণে তিনি নির্ধারিত পাঁচ বছরের মেয়াদের চেয়েও বেশি সময় দায়িত্বে ছিলেন এবং ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গভবনে ছিলেন।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ধারা অব্যাহত থাকে। ২০০৯ সালে জিল্লুর রহমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালের মার্চে তাঁর মৃত্যুর পর একই বছরের এপ্রিলে আবদুল হামিদ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালেও তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মো. সাহাবুদ্দিনও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হননি। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। চলতি বছরের ২৪ জুলাই তাঁর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয় এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ১ দফায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। একই অনুচ্ছেদের ৪ দফা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি ৩৫ বছরের কম বয়সী হন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হন অথবা সংবিধানের অধীন অভিশংসনের মাধ্যমে কখনো রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীর যোগ্যতা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য যে যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্ত রয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীকেও সেগুলো পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর হতে হবে।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা সদস্য পদে থাকার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না, যদি তিনি আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হন, দেউলিয়া হয়ে দায়মুক্ত না হন, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ বা আনুগত্য স্বীকার করেন, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিক্রান্ত না হয়, ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশে দণ্ডিত হন, লাভজনক সরকারি পদে অধিষ্ঠিত থাকেন অথবা আইন অনুযায়ী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্যতার বিষয়ে আরও কিছু শর্ত উল্লেখ রয়েছে। এসব অযোগ্যতা থাকলেও কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারবেন না।
কীভাবে হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এ জন্য জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচনি কর্তা এতে সভাপতিত্ব করবেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক এবং একজন সংসদ সদস্যের সমর্থকের স্বাক্ষর থাকতে হবে। একই সঙ্গে মনোনীত ব্যক্তির সম্মতিসূচক বিবৃতিও দিতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হবেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। নির্বাচন কমিশন এ জন্য ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে নির্ধারিত দিনে সংসদ কক্ষে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ হবে।
ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনা প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হবে। একাধিক প্রার্থী সমানসংখ্যক সর্বোচ্চ ভোট পেলে তাঁদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনি কর্তার ঘোষিত ফলাফলই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। তবে সংসদে বিএনপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বাস্তবতায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোরের আকাশ/সু.পা