অনিশ্চয়তায় জুলাই সংস্কার বাস্তবায়ন

২০২৪ এর জুলাই-আগস্ট এর গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল দেশে রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থা থেকে ফ্যাসিস্ট এবং স্বৈরশাসনের ‘চির অবসান’। আর এজন্য বিদ্যমান সরকারব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, নির্বাচনী ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠোমো এবং পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। অন্যথায় দেশে আবার ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরাচারব্যবস্থা ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে। এজন্য রাষ্ট্রের এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংস্কারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আর প্রচলিতব্যবস্থার পরিবর্তনে সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে গণকল্যাণমুখী, গণতান্ত্রিক এবং সর্বস্তরে জবাবিদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। চলমান সংস্কার কার্যক্রমের বাস্তবায়নের বিষয়টি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্র বলেছে, ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার ‘জুলাই বিপ্লব’ এর মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থার অবসান হলেও ভবিষ্যতে যাতে আর দেশে ফ্যাসিস্ট এবং স্বৈরাচারব্যবস্থা ফিরে আসতে না পারে সেজন্য ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে ‘সংস্কার’ বাস্তবায়নের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। আর জুলাই অভ্যুত্থান কিন্তু সংবিধান বাতিলের কথা বলেনি, বরং রাষ্ট্র যেন জনগণের ওপর নির্যাতন না করতে পারে এবং মানুষের অধিকার হরণ করতে না তার নিশ্চয়তা বিধানের বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এ বিষয়টিতে জনগণের সমর্থনের জন্য ‘গণভোট’ আয়োজনের ব্যবস্থা করছে। এজন্য আইনও করা হচ্ছে শিগগির।
এছাড়া গণতান্ত্রিক ধারায় দেশকে ফেরাতে প্রায় দেড় দশক পর সরকার আগামী ফেব্রুয়ারিতে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় একটি গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির কার্যক্রম চালাচ্ছে। এছাড়া সরকার আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে দেশের মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সূচনা করে একটি বাংলাদেশকে একটি ‘দুর্বৃত্ত এবং দুর্বৃত্তায়নমুক্ত’ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজ করছে। যাতে রাষ্ট্র এবং সরকরিব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়। যা প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনে প্রায় ‘ধূলিস্যাৎ’ হয়ে গেছে।
এছাড়া প্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী সংস্কারের জন্য বিচার বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর রাষ্ট্রকে সঠিক জায়গায় রাখতে এবং জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের জন্য সংবিধান খুবই গুরুত্বপূর্ণ- আর বিচার বিভাগ হচ্ছে বৈধতার ‘বাতিঘর’। বিচার বিভাগ ব্যর্থ হলে সংস্কার বাস্তবায়ন কার্যক্রম কঠিন হবে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশের মানুষের স্বার্থে বাংলাদেশের পুনর্গঠনে ‘সঠিক পথ’ বেছে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরই রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থার পুনর্গঠনে সরকার ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। আর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথমে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হবে। এরপর ওই আদেশ ও ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে হবে গণভোট। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে আগামী সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে।
কমিনের সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে সংসদ সংবিধান সংস্কারে ব্যর্থ হলে প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে।
জানা গেছে, জুলাই সনদ বাস্থবায়ন ও গণভোটের বিষয়টি নিয়ে এখনও দেশে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য না আসায় জনমনেও শঙ্কা বিরাজ করছে। আর নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিষয়টির সম্মানজনক সুরাহার জন্য লাগাতার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর রাজনৈতিক দলগুলো দেশ ও মানুষের স্বার্থে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একমত না হতে পারলে জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোরের আকাশ’কে বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নসম্পন্ন করার বিষয়টিকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে ছাত্র-জনতা হত্যা নির্যাতন ও গুমের বিরুদ্ধে সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরামর্শক্রমে, রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি আদেশও জারি করেছেন। এই আদেশ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ নামে অভিহিত।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন এবং পুনর্গঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমাদের সকল রাজনৈতিক দলের উচিত দেশের স্বার্থে ‘সঠিক পথ’ বেছে নেওয়া।
তিনি বলেন, পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ, সমৃদ্ধি, আত্মবিশ্বাস এবং মর্যাদার সঙ্গে বিশ্ব অঙ্গনে স্বমহিমায় আবির্ভূত হবে। এজন্য সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংস্কার ও রাষ্ট্রপুনর্গঠনে ইস্পাতসম ঐক্য জরুরি।
সূত্র আরো জানায়, ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই সনদে সংবিধানবিষয়ক ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। কিছু প্রস্তাবে সামান্য ভিন্নমত থাকলেও প্রস্তাবগুলোর ক্ষেত্রে মতভিন্নতা খুব বেশি না। কোনো কোনো দল সংবিধান সংস্কার চেয়েছে, অন্যরা আইনের মাধ্যমে তা করতে চেয়েছে। কিন্তু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, নীতি ও লক্ষ্য নিয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মৌলিক বা বড়ধরনের মতভেদ না থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য কাজটি সম্ভব হয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক স্বাক্ষরিত জুলাই সনদকে মূল দলিল হিসেবে মেনে নেওয়ায় সরকারের পক্ষে সহজ হয়েছে।
উল্লেখ্য, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই আদেশে সরকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান সংযোজন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সনদের সংবিধানবিষয়ক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোট অনুষ্ঠান এবং পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত।
এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, বিচার বিভাগ ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়।
ফ্যাসিস্ট অপশাসন পরবর্তী বাংলাদেশ যখন একটি নতুন রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পথে হাঁটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এজন্য বিচার বিভাগকে জনগণের স্বার্থ রক্ষার নীতিতে স্থির থাকা জরুরি। জুলাই বিপ্লব সংবিধান বাতিলের কথা বলেনি। বরং জনজীবনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনগণের অধিকার রক্ষার বিষয়টি পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে।
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশকে তার সাংবিধানিক জীবনের ব্যাকরণ পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে আইনের শাসন কোনো আমলাতান্ত্রিক রীতিনীতি বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কিছু নয়। বরং আইনের শাসন হলো- সাংবিধানিক ব্যবস্থার একটি নৈতিক পাঠ, যা ন্যায্যতা, যুক্তি এবং জনগণের সম্মতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এটি অধিকারের মাধ্যমে জনগণের মর্যাদা প্রদান করে। গত শনিবার ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
বিষেশজ্ঞদের মতে, গত দেড় দশকের ‘ফ্যাসিস্ট শাসনামলে’ দেশে উন্নয়নের নামে যে ‘বয়ান’ তৈরি করা হয়েছিল তাতে কিছুসংখ্যক অসৎ রাজনীতিবিদ, দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ী ও আমলা- এই তিন গোষ্ঠীর একটি ‘ওলেগাকি’ চক্র বিশেষভাবে লাভবান হয়েছে। এই ‘চক্রটি’ রাষ্ট্র ও ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রশ্রয়ে ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুরোপুরি হরণ করেছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংক ব্যবস্থার ‘লালবাতি’ জালিয়েছে।
এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প-বিশেষ করে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, টেলিকমসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের চক্রের হাতে নিয়ে অবৈধভাবে লাখ লাখ কোটি টাকা দুর্নীতি করেছে এবং বিদেশে পাচার করে দেশে অর্থনীতিকে ‘বেহাল’ অবস্থায় নিয়ে গিয়েছে। এ অবস্থার অবসানে এবং ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায়’ এখন রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য দেশের স্বার্থে খুব জরুরি বলে মনে করেন তারা।
ভোরের আকাশ/এসএইচ