মাদক দমনে নতুন কৌশল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সীমান্তে নজরদারি

দেশে মাদকের বিস্তার রোধ এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহ প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। শুধু অভিযাননির্ভর কৌশলের পরিবর্তে এবার সচেতনতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ—এই পাঁচটি বিষয়কে কেন্দ্র করে নতুন কর্মপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নেওয়া এ কর্মসূচির মাধ্যমে মাদকের সরবরাহ কমানো, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কাঠামো
কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সচেতনতা জোরদারে একটি জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় দুই হাজার প্রশিক্ষক বা মেন্টর তৈরি করা হবে। পাশাপাশি দেশের ২০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা হবে, যারা নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
৩৫ হাজার অভিযান, সীমান্তে ১০০ চেকপোস্ট
মাদকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত এলাকায় ১০০টি অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশজুড়ে ৩৫ হাজার নিয়মিত অভিযান এবং ৬০ দিনের বিশেষ অভিযানে ২০০টি নির্ধারিত টার্গেটে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জেলা, উপজেলা ও মহানগরের থানাভিত্তিক মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত ও নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। এতে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা এবং মাদক মামলার তদন্ত আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে গুরুত্ব
অভিযানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩টি নতুন যানবাহন এবং কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০টি শর্ট-রেঞ্জ অস্ত্র কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (আইএনসিবি) জিআরআইডিএস কর্মসূচির আওতায় দেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের ন্যাশনাল টার্গেটিং সেন্টার (এনটিসি) স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে।
ডোপ টেস্ট ও অর্থপাচার রোধে উদ্যোগ
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রথম ধাপে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালে স্ক্রিনিং ডোপ টেস্ট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরে এটি ময়মনসিংহ, রংপুর ও খুলনা বিভাগেও সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার অর্থায়ন ও অর্থপাচারের উৎস শনাক্ত করতে ৫০ জন কর্মকর্তাকে মানি লন্ডারিং বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
জেলা-উপজেলায় গড়ে উঠবে মাদকবিরোধী ব্রিগেড
সামাজিক প্রতিরোধ জোরদারে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে মাদকবিরোধী ব্রিগেড গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে গঠিত এসব ব্রিগেডে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন ক্লাবকে সম্পৃক্ত করা হবে। এ ছাড়া জনসচেতনতা বাড়াতে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে কর্মশালা এবং সাধারণ মানুষের মতামত গ্রহণে গণশুনানির আয়োজনও করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত
গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। একইসঙ্গে প্রতিরোধ, সচেতনতা, গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং মাদক চক্রের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংসে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এজন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
অধ্যাপক, গবেষক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেরও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই পরিবারভিত্তিক সচেতনতা, প্রতিরোধমূলক শিক্ষা এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মেন্টর ও কমিটি গঠনের উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল মিলবে। র্যাবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খায়রুল ইসলাম বলেন, মাদক সিন্ডিকেট এখন প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তাই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য বিনিময়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
যা বলছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, ১২০ দিনের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। শুধু মাদক উদ্ধার নয়, বরং মাদক সিন্ডিকেটের অর্থায়ন ও নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়ে একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
তিনি আরও জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মাদকবিরোধী মেন্টর তৈরি, কমিটি গঠন, মাদক কারবারিদের হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশে মাদকের সরবরাহ ও চোরাচালান উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা