তাপমাত্রা পরিমাপের বিপ্লবী আবিষ্কার থার্মোমিটার

আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে চিকিৎসা, আবহাওয়া এবং শিল্পকারখানা—তাপমাত্রা পরিমাপের যন্ত্র হিসেবে ‘থার্মোমিটার’ (Thermometer) একটি অত্যন্ত অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু আজকের এই ডিজিটাল ও নিখুঁত থার্মোমিটারের পেছনে রয়েছে শত শত বছরের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও গবেষণার এক দীর্ঘ ইতিহাস। চলুন, জেনে নেওয়া যাক থার্মোমিটারের প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক প্রযুক্তি পর্যন্ত পৌঁছানোর সেই চমকপ্রদ যাত্রা।
১. শুরুর গল্প: থার্মোস্কোপ (Thermoscope)
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রিক প্রকৌশলী ও গণিতবিদরা প্রথম তাপমাত্রার ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তবে তাপমাত্রা দৃশ্যমান করার প্রথম যন্ত্র ‘থার্মোস্কোপ’ আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় ইতালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলিকে (Galileo Galilei), ১৫৯২ সালের দিকে।
- সীমাবদ্ধতা: গ্যালিলিওর এই যন্ত্রটি কোনো সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা (যেমন—ডিগ্রি বা সংখ্যা) মাপতে পারত না, কেবল তাপমাত্রার আপেক্ষিক পরিবর্তন বা তারতম্য বুঝতে পারত। এতে বাতাস ও তরল পদার্থের প্রসারণ ও সংকোচনের নীতি ব্যবহার করা হতো।
২. পারদ ও সুনির্দিষ্ট স্কেলের আবিষ্কার
১৬১২ সালে চিকিৎসক স্যান্টোরিও স্যান্টোরিও প্রথম থার্মোস্কোপে একটি সংখ্যাসূচক স্কেল যুক্ত করে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা মাপার চেষ্টা করেন। তবে থার্মোমিটারের ইতিহাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন ড্যানিয়েল গ্যাব্রিয়েল ফারেনহাইট ও অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস।
- ফারেনহাইট স্কেল: ১৭০৯ সালে ড্যানিয়েল গ্যাব্রিয়েল ফারেনহাইট (Daniel Gabriel Fahrenheit) অ্যালকোহল-ভিত্তিক এবং পরবর্তীতে ১৭১৪ সালে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুল পারদ-ভিত্তিক (Mercury) থার্মোমিটার আবিষ্কার করেন। ১৭২৪ সালে তিনি ‘ফারেনহাইট স্কেল’ প্রবর্তন করেন।
- সেলসিয়াস স্কেল: ১৭৪২ সালে সুয়েডীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস (Anders Celsius) পানির হিমাঙ্ক (০ ডিগ্রি) ও স্ফুটনাঙ্ককে (১০০ ডিগ্রি) ভিত্তি করে ‘সেলসিয়াস স্কেল’ আবিষ্কার করেন।
- কেলভিন স্কেল: পরবর্তীতে ১৮৪৮ সালে লর্ড কেলভিন ‘কেলভিন স্কেল’ আবিষ্কার করেন, যা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পরম শূন্য তাপমাত্রা পরিমাপে ব্যবহৃত হয়।
৩. ক্লিনিক্যাল বা মেডিকেল থার্মোমিটার
তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রটি যখন চিকিৎসা ক্ষেত্রে মানুষের ব্যক্তিগত ব্যবহারের উপযোগী করার প্রয়োজন দেখা দিল, তখন যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন ব্রিটিশ চিকিৎসক স্যার ক্লিফোর্ড অ্যালবাট (Sir Clifford Allbutt)।
- আবিষ্কার: ১৮৬৬ সালে তিনি প্রথম পোর্টেবল বা বহনযোগ্য ক্লিনিক্যাল থার্মোমিটার আবিষ্কার করেন। এর আগে রোগীর শরীরের তাপমাত্রা মাপতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগত, কিন্তু অ্যালবাটের তৈরি নতুন থার্মোমিটারের মাধ্যমে মাত্র ৫ মিনিটেই নির্ভুল তাপমাত্রা জানা সম্ভব হয়।
৪. আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বিপ্লব
বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং একবিংশ শতাব্দীতে পারদের বিষাক্ততা ও ব্যবহারের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে ডিজিটাল থার্মোমিটারের প্রচলন শুরু হয়।
- ডিজিটাল থার্মোমিটার: সেন্সর ও মাইক্রোচিপের সাহায্যে শরীরের তাপমাত্রা খুব দ্রুত ও নির্ভুলভাবে স্ক্রিনে ফুটিয়ে তুলতে পারে এই আধুনিক যন্ত্রটি।
- ইনফ্রারেড ও নন-কন্টাক্ট থার্মোমিটার (Infrared Thermometer): আধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সংযোজন হলো কপালে বা শরীরে না ছুঁয়েই দূর থেকে তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র। এটি কোনো বস্তুর তাপীয় বিকিরণ (Thermal Radiation) মেপে নিমেষেই ডিজিটাল ডিসপ্লেতে তাপমাত্রা প্রদর্শন করে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় বিশ্বব্যাপী এর ব্যবহার ও পরিচিতি আকাশচুম্বী হয়।
- স্মার্ট ও পরিধানযোগ্য থার্মোমিটার (Smart Thermometer): বর্তমানে স্মার্টওয়াচ, প্যাচ বা কানের ডিভাইসের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা সার্বক্ষণিক মনিটর (Continuous Monitoring) করা সম্ভব হচ্ছে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে।
গ্যালিলিওর সেই সাধারণ কাঁচের নল থেকে শুরু করে আজকের লেজার-নির্ভর ইনফ্রারেড ও স্মার্ট থার্মোমিটার—বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই নিরন্তর অগ্রগতি আমাদের জীবনকে করেছে আরও নিরাপদ, সূক্ষ্ম ও সহজতর। অদূর ভবিষ্যতে ন্যানো-প্রযুক্তির কল্যাণে তাপমাত্রা পরিমাপের ক্ষেত্রে হয়তো আরও অভাবনীয় ও চমৎকার সব প্রযুক্তির সংযোজন ঘটবে।
ভোরের আকাশ/জেআ