বহুবিবাহ নিয়ে কোরআনের নির্দেশনা কী?

ইসলাম একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা মানবজীবনের স্বাভাবিক চাহিদা, সামাজিক বাস্তবতা এবং নৈতিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়। এ কারণেই ইসলাম বিয়েকে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে পুরুষের জন্য একাধিক বিয়ের সুযোগও রেখেছে। তবে এই অনুমতি কোনোভাবেই শর্তহীন নয়; বরং ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীলতা এবং তাকওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বর্তমান সময়ে একাধিক বিয়ের বিধান নিয়ে বিভিন্ন মতামত দেখা যায়। কেউ এটিকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করেন, আবার কেউ সম্পূর্ণ অমানবিক বলে দাবি করেন। তবে ইসলাম ভোগবাদকে যেমন সমর্থন করে না, তেমনি মানবিক বাস্তবতাকেও অস্বীকার করে না। বরং মধ্যপন্থাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়, যেখানে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—তিনটির কল্যাণ নিশ্চিত হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে এতিমদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে নারীদের মধ্য থেকে তোমাদের পছন্দমতো দুই, তিন বা চারজনকে বিয়ে করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনকেই বিয়ে করো…” (সূরা নিসা, আয়াত ৩)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও এর মূল শর্ত হলো ‘আদল’ বা ন্যায়বিচার।
ইসলামি ব্যাখ্যায় একাধিক বিয়ে বাধ্যতামূলক নয়; বরং এটি প্রয়োজন ও সক্ষমতার ভিত্তিতে অনুমোদিত একটি ব্যবস্থা। পরিস্থিতিভেদে এটি কারও জন্য মুস্তাহাব, কারও জন্য মুবাহ, আবার কারও জন্য মাকরুহ বা হারামও হতে পারে—সবই নির্ভর করে ব্যক্তির ন্যায়বিচার ও সামর্থ্যের ওপর।
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের মধ্যে সমতা বজায় রাখতেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, যা তাঁর পক্ষ থেকে সম্ভব হয়নি তা যেন ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা হয়। (আবু দাউদ: ২১৩৪)
একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সকল স্ত্রীর প্রতি সমান আচরণ করা। এই সমতা রক্ষা করতে হবে প্রধানত নিচের বিষয়গুলোতে:
- ভরণপোষণ: সকল স্ত্রীর জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মান সমান হতে হবে।
- রাত যাপন: সময় বণ্টনের ক্ষেত্রে সকল স্ত্রীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
- আচরণ: কথাবার্তা এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না।
আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা
একাধিক বিবাহের জন্য স্বামীকে অবশ্যই আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে হবে, যাতে তিনি প্রতিটি পরিবারের ব্যয়ভার যথাযথভাবে বহন করতে পারেন। একজনের হক নষ্ট করে অন্যজনের ভরণপোষণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা থাকাও একটি প্রয়োজনীয় শর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বাস্তবতা
ইসলামি শরিয়তের পাশাপাশি বাংলাদেশের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১’ অনুযায়ী, পূর্ববর্তী স্ত্রীর অনুমতি গ্রহণ এবং সালিসি পরিষদের মাধ্যমে লিখিত অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দ্বিতীয় বিবাহ করা দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এর ফলে প্রথম স্ত্রী চাইলে তাৎক্ষণিক মোহরানা দাবি ও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেউ যদি ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নিজের ওপর আস্থা না রাখেন, তবে তাঁর জন্য একটি বিবাহের ওপর সীমাবদ্ধ থাকাই নিরাপদ ও উত্তম।
ভোরের আকাশ/জেআ