সঠিক সিদ্ধান্ত ও সফলতার অন্যতম মাধ্যম ‘মাশওয়ারা’

মানুষ জাতিকে আল্লাহ তাআলা সামাজিক জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এক সমাজে, এক দেশে ও একই পরিবেশে বসবাস করতে গিয়ে আমরা নানাবিধ প্রয়োজনে একে অপরের কাছে সহযোগিতা চাই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে উদ্ভূত বহু পরিস্থিতি ও সমস্যার সমাধানে প্রায়ই আমরা কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হই। সঠিক দিশা খুঁজে পেতে কখনো বিভ্রান্ত হই, আবার কখনো ভুল সিদ্ধান্তে সমস্যাকে আরও জটিল করে ফেলি। তখন মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দিয়েছেন এক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, দিয়েছেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব— রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। কঠিন ও জটিল বিষয়ে সহজ, সুন্দর ও প্রশান্তিময় সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছেন। মাশওয়ারা— অর্থাৎ পরামর্শ, পারস্পরিক আলোচনা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ— সেইসব নির্দেশনার অন্যতম। আল্লাহ তাআলা মাশওয়ারাকে কল্যাণ ও সফলতার মাধ্যম করেছেন।
আল্লাহ তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন—
“সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা কর, তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা কর এবং (গুরুত্বপূর্ণ) বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর তুমি যখন (কোনো বিষয়ে) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৯)
নবীজি সা. আল্লাহপ্রদত্ত ওহীর দ্বারাই যেকোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম ছিলেন। তাঁর সিদ্ধান্তের বিপরীতে অন্যদের মতামতের কোনো স্থান ছিল না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন, তখন কোনো মুমিন পুরুষ বা মুমিন নারীর নিজের ব্যাপারে ভিন্ন মত রাখার অধিকার থাকে না।” (সূরা আহযাব, আয়াত ৩৬)
তবুও আল্লাহ তাআলা নবীজীকে সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেন— নবীজি তাঁদের মতামতের মুখাপেক্ষী না হলেও পরামর্শের নির্দেশ দেওয়ার হিকমত হলো: সাহাবায়ে কেরামের অন্তরকে প্রশান্ত করা, তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা এবং দ্বীনের ব্যাপারে তাঁদেরকে আরও দৃঢ় করা। যেন তাঁরা মনে করেন, নবীজি সা. মহান ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কথা শুনছেন এবং বিভিন্ন কাজে আমাদের সহযোগিতা গ্রহণ করছেন। তাছাড়া মদীনাবাসীর স্বভাবই ছিল পারস্পরিক পরামর্শে কাজ করা। সেই গুণের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন— “এবং যাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শক্রমে সম্পন্ন হয়।” (সূরা শূরা, আয়াত ৩৮)
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন— এই আয়াতে নবীজিকে মাশওয়ারার নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে মাশওয়ারার গুরুত্ব প্রকাশ করা হয়েছে এবং এটিকে ইসলামের অন্যতম আদব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নবীজি সা. বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করতেন, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং বাস্তবায়ন করতেন। খন্দক যুদ্ধে হযরত সালমান ফারসী রা.-এর পরামর্শে পরিখা খনন তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
মাশওয়ারার মধ্যে আল্লাহ তাআলা রেখেছেন বিশেষ বরকত। ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন— “মাশওয়ারা হলো বরকত।” মাশওয়ারার বড় উপকার হলো— পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করলে আফসোস থাকে না; উদ্দেশ্যে সফল না হলেও মনোবল ভেঙে পড়ে না; পাশে সান্ত্বনা ও সহযোগিতার মানুষকে পাওয়া যায়। ইমাম কুরতুবি রহ. হাদিস উল্লেখ করে বলেন— নবীজি সা. বলেছেন, “যে পরামর্শ করে সে কখনো লজ্জিত হয় না, আর যে ইসতিখারা করে সে কখনো ব্যর্থ হয় না।”
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত— নবীজি সা. বলেছেন:
“যখন তোমাদের উত্তম লোক তোমাদের শাসক হবে, তোমাদের সম্পদশালীরা দানশীল হবে এবং তোমাদের কাজ পরামর্শভিত্তিক হবে— তখন ভূমির উপরিভাগ তোমাদের জন্য ভূগর্ভের চেয়ে উত্তম হবে।” (তিরমিযি, হা. ২২৬৬)
হযরত সাহল ইবনে সা’দ রাযি. বলেন— নবীজি সা. বলেছেন:
“কোন মানুষ মাশওয়ারা করার কারণে কখনো হতভাগা হয়নি, আর কেউ নিজের মতের উপর অটল থাকার ফলে কখনো সৌভাগ্যবান হয়নি।” (মুসনাদে শিহাব, ২/৬)
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন— মানুষেরা যখন কোনো বিষয়ে পরামর্শ করে, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে সঠিক ও উপযোগী বিষয়ের দিকে পরিচালিত করেন। ইবনুল আরাবি বলেন— “মাশওয়ারা হলো মানুষের শক্তি, দলবদ্ধ মানুষের প্রশান্তির কারণ, বুদ্ধির প্রতিফলন এবং সঠিক বিষয় অর্জনের মাধ্যম।” (তাফসিরে কুরতুবি)
পরামর্শদাতার গুণাবলী
মাশওয়ারা বা পরামর্শ যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব। তাই যার সাথে পরামর্শ করা হবে তাকে কিছু বিশেষ গুণে গুণান্বিত হতে হবে। কেননা ভুল পরামর্শে সমস্যা সংকটে পরিণত হতে পারে। সঠিক পরামর্শে ব্যক্তির জীবন সুখের হতে পারে। তাই বিশেষভাবে যেগুলো লক্ষ্য রাখতে হবে।
০১. পরামর্শদাতা ঈমানদার ও খোদা ভীরু হওয়া
একজন মুমিনই হতে পারে প্রকৃত অর্থে পরামর্শদাতা। যার অন্তরের আল্লাহর ভয় নেই, তার দেওয়া পরামর্শে বরকত ও সফলতা লাভের আশা করা যায় না। কেননা মাশওয়ারা একটি আমানত। যার ঈমান নেই তার ভিতরে আমানতদারি নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুসলিমগণ! তোমাদের বন্ধু তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ…।” (সূরা মায়েদা, আয়াত: ৫৫)
০২. পরামর্শদাতা আমানতদার হওয়া
একজন মানুষ অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষী হয়, নিজের সমস্যা সমাধানে উপযোগী কোন পরামর্শ লাভের আশায়। পরামর্শদাতা আমানতদার না হলে সঠিক পরামর্শ লাভের পরিবর্তে, ব্যক্তি আরো নতুন সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দেয়। তাইতো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “পরামর্শদাতা একজন আমানতদার।” ( সুনানে আবু দাউদ, হা. ৫১২৮)
০৩. পরামর্শদাতা অভিজ্ঞ হওয়া
মাশওয়ারা হয়ে থাকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একটি সুন্দর সমাধান পাওয়ার জন্য। প্রকৃত উদ্দেশ্য তখনই অর্জিত হয়, যখন উক্ত বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। ইবনে খুওয়াইয মিনদাদ বলেন, “শাসক ও নেতাদের জন্য মাশওয়ারা করা আবশ্যক। দ্বীন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলেমদের সাথে পরামর্শ করবে। যুদ্ধের বিষয়ে সেনাপ্রধান, সমাজের বিষয়ে দলপ্রধান, দেশের বিষয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে পরামর্শ করবে।
ইমাম কুরতুবি রহ. উল্লেখ করেন, দুনিয়াবি কোন বিষয়ে পরামর্শ করলে পরামর্শদাতা অবশ্যই অভিজ্ঞ, বুদ্ধিমান ও হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়া। (তাফসিরে কুরতুবি)
০৪. পরামর্শদাতা বিজ্ঞ আলেম হওয়া
ইমাম কুরতুবি রহ. উল্লেখ করেন, পরামর্শকৃত বিষয়টি যদি দ্বীন সংশ্লিষ্ট ও শরীয়তের বিধান সম্পর্কে হয়, তাহলে পরামর্শদাতা একজন বিজ্ঞ ও বিদ্বান আলেম হওয়ার পাশাপাশি বুঝমান ও চিন্তাশীল হওয়া। অন্যথায় মাশওয়ার পরিপূর্ণ ফায়দা লাভ হবে না। (তাফসিরে কুরতুবি)
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যদি তোমাদের জানা না থাকে, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করো।” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৭)
০৫. পরামর্শদাতা সত্যবাদী, নিরপেক্ষ ও গোপনীয়তা রক্ষাকারী হওয়া
সত্য ও সঠিক পরামর্শের জায়গায় কারো দুর্বলতার সুযোগে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ভুল পরামর্শ দেওয়া থেকে বিরত থাকা। নিরপেক্ষ ও নিষ্ঠার সাথে চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত জানানো। পরামর্শকারী থেকে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত এবং তার ব্যক্তিগত অবস্থাসহ যাবতীয় বিষয় গোপন রাখবে। অন্যের সামনে তার অবস্থা প্রকাশ না করা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলম করবে না এবং তাকে যালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন।” (সহিহ বুখারী, হাদিস ২৪৪২)
পরামর্শকারীর গুণাবলী:
০১. পরামর্শক্রমে প্রাপ্ত সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “অতঃপর তুমি যখন (কোন বিষয়ে) মনস্থির করবে, তখন আল্লাহর উপর নির্ভর করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
০২. পরামর্শদাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আনুগত্যে অনুরাগী হওয়া।
০৩. পরামর্শক্রমে কাজ করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেলে হায়হুতাশ না করা। নিরাশ না হওয়া। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “… আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৩)
মাশওয়ার ফায়দা
০১. মাশওয়ারা আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয় একটি ইবাদত।
০২. মাশওয়ার মাধ্যমে দলবদ্ধ কাজে পারস্পরিক সম্পর্ক ও বোঝাপড়া সুন্দর হয়।
০৩. সামাজিক কাজে নিজেদের মধ্যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মনোভাব তৈরি হয়।
০৪. পরামর্শ করলে আশপাশ ও সংশ্লিষ্টদের মনের ভিতরে কোন ধরণের প্রশ্ন থাকে না।
০৫. মাশওয়ার মাধ্যমে চিন্তা-ভাবনার জগত প্রশস্ত ও বিস্তৃত হয়। মেধার বিকাশ ঘটে।
০৬- পরামর্শ ভিত্তিক কাজ সাধারণ ভুল থেকে মুক্ত হয়। (তাফসিরে কুরতুবি, তাফসিরে ইবনে আশূর)
মানবজীবনের বিভিন্ন কার্যক্রমে মাশওয়ারার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এটি ইসলামের অন্যতম একটি আদব। আল্লাহ তাআলার কাছে পছন্দনীয় একটি পন্থা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করেছেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. তাঁর ওফাতের সময় পরবর্তীদের মধ্য হতে ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি পরামর্শ পরিষদ গঠন করেছিলেন।
আমাদের প্রতিটি কাজ হোক মাশওয়ারার মাধ্যমে সুন্দর ও সুসংগঠিত এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভরতার গুণে পরিপূর্ণ। আমীন।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলুম, মঙ্গলবাড়ীয়া বাজার, কুষ্টিয়া।
ভোরের আকাশ/এনএ