আখেরি চাহার সোম্বা: এই দিনের ফজিলত ও করণীয়

আমাদের ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বা ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ একটি বহুল পরিচিত দিন। হিজরি বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস ‘সফর’-এর শেষ বুধবারকে ইসলামী পরিভাষায় ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বলা হয়।
প্রতি বছর সফর মাসের শেষভাগে এলে এ দিনটি নিয়ে নানা আলোচনা ও আমলের কথা শোনা যায়। তবে ইসলামী শরিয়ত ও বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে এ দিনটির তাৎপর্য এবং এতে বিশেষ কোনো আমল রয়েছে কিনা, তা জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
‘আখেরি চাহার সোম্বা’ শব্দের অর্থ ও এর ইতিহাস
শব্দটি মূলত আরবি ও ফারসি ভাষার একটি সংমিশ্রণ:
‘আখেরি’ (আরবি): শেষ।
‘চাহার সোম্বা’ (ফারসি): চতুর্থ দিন বা বুধবার।
শব্দার্থ: অর্থাৎ সফর মাসের ‘শেষ বুধবার’।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
উপমহাদেশের বহুল প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, একাদশ হিজরির সফর মাসের শেষের দিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সফর মাসের শেষ বুধবারে তিনি সাময়িকভাবে কিছুটা সুস্থ বোধ করেন, গোসল করেন এবং মসজিদে গিয়ে সাহাবিদের সাথে সালাত আদায় ও খুতবা প্রদান করেন। এতে খুশি হয়ে সাহাবিগণ দান-সদকা করেছিলেন। সেই থেকে আনন্দ প্রকাশ ও শুকরিয়া আদায়ের স্মারক হিসেবে কিছু মুসলিম সমাজে এ দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে।
এই দিনে বিশেষ কোনো আমল আছে কি? (শরই দৃষ্টিভঙ্গি)
ইসলামী শরিয়ত ও ওলামায়ে কেরামদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আখেরি চাহার সোম্বা উপলক্ষে আলাদা বা নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ আমল, নামাজ বা রোজা ইসলামী শরিয়তে নির্ধারিত নেই।
বিশুদ্ধ হাদিস ও শরিয়তের আলোকে এই সংক্রান্ত ৩টি বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন:
১. নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ নামাজ বা রোজা নেই
বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন অনির্ভরযোগ্য পুস্তিকায় এই দিনে বিশেষ নিয়মে ‘শুকরিয়ার নামাজ’ বা ‘সফর মাসের শেষ বুধবারের বিশেষ খতম/আমল’-এর যে বর্ণনা পাওয়া যায়, বিশুদ্ধ হাদিস ও শরিয়তের মানদণ্ডে তার কোনো ভিত্তি নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবায়ে কেরামগণ প্রতি বছর সফর মাসের শেষ বুধবার নির্ধারণ করে কোনো আমল করেননি।
২. দ্বীনের নামে নতুন বিধান তৈরি করা (বিদআত)
ইসলামে যেকোনো নতুন ইবাদত বা দিন নির্দিষ্ট করে আমল করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ২৬৯৭)
তাই আখেরি চাহার সোম্বাকে বিশেষ কোনো ‘সওয়াবের দিন’ বা ইবাদতের জন্য নির্ধারিত দিন হিসেবে বিশ্বাস করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।
৩. স্বাভাবিক আমল ও দান-সদকা
এই দিনে কোনো বিশেষ আমল না থাকলেও, সাধারণ যেকোনো দিনের মতো নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির এবং সাধ্যমতো দান-সদকা করা জায়েজ। তবে তা যেন নির্দিষ্টভাবে “আজকে সফর মাসের শেষ বুধবার বলেই বেশি সওয়াব হবে”—এমন বিশ্বাস থেকে না হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সুস্থতায় আনন্দ প্রকাশ করা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানের দাবি। তবে সেই ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম হতে হবে সুন্নাহসম্মত। সুন্নাহর বাইরে গিয়ে কোনো দিন বা সময়কে ইবাদতের জন্য খাস না করে, মহানবী (সা.)-এর পুরো জীবনের আদর্শ ও সুন্নাহ প্রতিদিন মেনে চলাই হলো একজন প্রকৃত মুমিনের মূল দায়িত্ব।
ভোরের আকাশ/জেআ