বিয়েকে ঘিরে পুরনো কুসংস্কার

বাঙালি সংস্কৃতিতে বিয়ে মানেই আনন্দ, উৎসব আর নানা রঙের আচার-অনুষ্ঠান। তবে হাজার বছরের পুরনো এই সামাজিক রীতিনীতির আড়ালে এমন অনেক ধারণা জড়িয়ে আছে, যার কোনো বৈজ্ঞানিক বা ধর্মীয় ভিত্তি নেই। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এমনই ৩০টি প্রচলিত কুসংস্কার নিচে তুলে ধরা হলো, যা আমরা কম-বেশি সবাই বিয়েবাড়িতে শুনে থাকি:
বিয়ের দিন ও সময় সংক্রান্ত কুসংস্কার
১. জোড় বা বেজোড় মাস: অনেকেই মনে করেন বেজোড় মাসে বিয়ে করলে সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তাই জোড় মাসে বিয়ে করা উচিত।
২. জন্মমাসে বিয়ে: বর বা কনের নিজের জন্মমাসে বিয়ে করাকে অশুভ মনে করা হয়।
৩. একই বছরে দুই ভাই-বোনের বিয়ে: এক বছরের মধ্যে একই পরিবারের দুই ভাই বা দুই বোনের বিয়ে দেওয়াকে অমঙ্গলজনক মনে করা হয়।
৪. চাঁদের তিথি: বিয়ের লগ্ন বা দিন নির্ধারণের সময় পূর্ণিমা বা নির্দিষ্ট কিছু চাঁদের তিথি দেখে দিন ঠিক না করলে সংসার ভাঙার ভয় পান অনেকে।
৫. গ্রহের দশা (মাঙ্গলিক দশা): কুষ্টি বা কোষ্ঠী মেলাতে গিয়ে 'মঙ্গল দোষ' বা গ্রহের দশা থাকলে বিয়ের পর বরের অকালমৃত্যু হতে পারে—এমন চরম কুসংস্কারও প্রচলিত আছে।
বর-কনের দেখা ও পোশাক সংক্রান্ত কুসংস্কার
৬. বিয়ের আগে কনের মুখ দেখা: বিয়ের মূল লগ্নের আগে বর কনের মুখ দেখলে নাকি দাম্পত্য জীবনে কলহ বাড়ে।
৭. গায়ে হলুদের পর বাইরে যাওয়া: গায়ে হলুদের পর থেকে বিয়ের লগ্ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর বা কনেকে ঘরের বাইরে (বিশেষ করে রাতে) যেতে দেওয়া হয় না, ভূত-প্রেত বা নজর লাগার ভয়ে।
৮. আয়না দেখা: বিয়ের সাজগোজ শেষ হওয়ার আগে কনেকে আয়না দেখতে নিষেধ করা হয়।
৯. ছেঁড়া বা কাটা পোশাক: বিয়ের দিন বরের কাপড়ে সামান্য সুতো উঠলে বা ছিঁড়ে গেলে সেটিকে অমঙ্গল মনে করা হয়।
১০. লোহার আংটি বা জিনিস রাখা: বিয়ের সময় বর-কনের কাছে নজর লাগা থেকে বাঁচতে লোহার তৈরি কোনো জিনিস (যেমন- চাবি বা ছোট ছুরি) রাখা বাধ্যতামূলক মনে করা হয়।
গায়ে হলুদ ও বিয়ের আচার সংক্রান্ত কুসংস্কার
১১. হলুদ বাটি ভাঙা: গায়ে হলুদের সময় হলুদ বাটার বাটি যদি হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়, তবে বিয়েতে বড় কোনো বাধা আসবে বলে ধরে নেওয়া হয়।
১২. কনের গায়ের হলুদ অন্য কুমারীর গায়ে লাগা: কনের গায়ে ছোঁয়ানো হলুদ কোনো কুমারী মেয়ের গায়ে লাগালে তারও দ্রুত বিয়ে হয়ে যায়—এটি একটি অত্যন্ত প্রচলিত লোকবিশ্বাস।
১৩. উলুধ্বনি বা শঙ্খধ্বনি: বিয়ের কোনো আচারের সময় উলুধ্বনি বা শঙ্খধ্বনি না দিলে নাকি অশুভ শক্তি ঘরে প্রবেশ করে।
১৪. কুলা উল্টে যাওয়া: বরণ করার সময় বরণকুলা যদি হাত থেকে উল্টে পড়ে, তবে সংসারের লক্ষ্মী চলে যায় বলে মনে করা হয়।
১৫. বাতির শিখা নিভে যাওয়া: বিয়ের পিঁড়িতে বসার পর চারপাশের প্রদীপ বা মোমবাতির শিখা নিভে গেলে বর-কনের অমঙ্গল হবে বলে ভাবা হয়।
কনে বিদায় ও শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশের কুসংস্কার
১৬. কনে বিদায়ের সময় পেছনে তাকানো: বিদায় নিয়ে বাপের বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় কনে যদি পিছন ফিরে তাকায়, তবে সে বাপের বাড়ির সব সুখ সাথে করে নিয়ে যায় বলে অন্ধবিশ্বাস রয়েছে।
১৭. ধান-দুর্বা ও পয়সা ছিটানো: কনে বিদায়ের সময় মায়ের আঁচলে চাল বা পয়সা ছুড়ে দিয়ে বলে "তোমার সব ঋণ শোধ করে গেলাম"।
১৮. ডান পা ফেলে ঘরে ঢোকা: নতুন বউ শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশের সময় অবশ্যই ডান পা আগে ফেলতে হবে, বাম পা ফেললে অলক্ষ্মী ঘরে ঢোকে বলে মনে করা হয়।
১৯. দুধ-আলতা মাড়ানো: উঠানে রাখা দুধ-আলতার পাত্রে পা দিয়ে ঘরে ঢোকার সময় পায়ের ছাপ দেখে বিচার করা হয় বউ কেমন হবে।
২০. ঘোমটা খসে পড়া: নতুন বউয়ের মাথার ঘোমটা যদি বারবার খসে পড়ে, তবে তাকে 'লজ্জাহীন' বা সংসারের জন্য অশুভ মনে করা হয়।
বাসর রাত ও পরবর্তী দিনগুলোর কুসংস্কার
২১. বাসর ঘরে জুতো উল্টে থাকা: বাসর ঘরের দরজায় বা ভেতরে জুতো উল্টে থাকলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
২২. বিড়ালের ভাগ্য পরীক্ষা: বাসর ঘরে বিড়াল ঢুকলে বা বিড়াল দেখলে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি আসবে বলে মনে করা হয়।
২৩. কনের হাতের রান্না নষ্ট হওয়া: বউভাতের দিন নতুন বউয়ের রান্না যদি সামান্য পুড়ে বা নষ্ট হয়ে যায়, তবে সে সংসারে কখনো বরকত হবে না বলে কুসংস্কার ছড়ানো হয়।
২৪. প্রথম তিন দিন সুঁই-সুতো ব্যবহার: বিয়ের পর প্রথম তিন দিন নতুন বউকে সুঁই-সুতো দিয়ে সেলাইয়ের কাজ করতে দেওয়া হয় না, এতে নাকি সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যায়!
২৫. নতুন কাপড়ে দাগ লাগা: বিয়ের পর প্রথমবার বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় কাপড়ে কাদা বা কোনো দাগ লাগলে তা অশুভ লক্ষণ ধরা হয়।
অন্যান্য বিবিধ কুসংস্কার
২৬. বিধবা বা ডিভোর্সি নারীর বরণ: বিয়ের প্রধান বরণ বা শুভ আচারের সময় বিধবা বা ডিভোর্সি নারীদের সামনে আসতে দেওয়া হয় না, যা অত্যন্ত কুৎসিত একটি সামাজিক কুসংস্কার।
২৭. কাক বা শকুনের ডাক: বিয়ের দিন সকালে বাড়ির আশেপাশে কাক বা শকুন ডাকলে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ভয় পান অনেকে।
২৮. হাত থেকে কাঁচের জিনিস ভাঙা: বিয়েবাড়িতে কাঁচের গ্লাস বা প্লেট ভাঙলে লোকসানের চেয়েও বড় 'অপয়া' লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়।
২৯. রাস্তা পার হওয়ার সময় বিড়াল: বরযাত্রী যাওয়ার পথে কালো বিড়াল রাস্তা পার হলে গাড়ি থামিয়ে দেওয়া হয় বা যাত্রা অশুভ মনে করা হয়।
৩০. গর্ভবতী নারীর ছায়া: বর বা কনের গায়ে কোনো গর্ভবতী নারীর ছায়া পড়লে অনাগত সন্তানের ক্ষতি বা বিয়ের অমঙ্গল হবে বলে মনে করা হয়।
মনস্তাত্ত্বিকের পরামর্শ:
এই সমস্ত কুসংস্কারের বেশিরভাগই তৈরি হয়েছে প্রাচীনকালের অজ্ঞতা ও লোকমুখের অবৈজ্ঞানিক গল্প থেকে। একটি সুখী দাম্পত্য জীবন নির্ভর করে বর-কনের পারস্পরিক বোঝাপড়া, ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধাবোধের ওপর; কোনো ভাঙা বাটি বা ডান পায়ের ওপর নয়। তাই উৎসবের আনন্দকে উপভোগ করুন, তবে কুসংস্কারকে নয়।
ভোরের আকাশ/জেআ