হাদিস অনুযায়ী লানতপ্রাপ্ত ১০ শ্রেণির মানুষের পরিচয়

ইসলামে ‘লানত’ বা অভিশাপ শব্দটির অর্থ হলো আল্লাহর অসীম রহমত থেকে চিরতরে বঞ্চিত ও দূর হয়ে যাওয়া। মহান আল্লাহ তাআলা ও তাঁর প্রিয় রাসুলুল্লাহ ﷺ উম্মতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তবে সমাজকে কলুষমুক্ত করতে, মানুষের অধিকার রক্ষা করতে এবং সমাজ থেকে মারাত্মক কিছু সামাজিক ও আত্মিক ব্যাধি দূর করতে নবীজি ﷺ কিছু নির্দিষ্ট পাপের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এবং সেসব কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের ওপর লানত বা অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।
হাদিসের বিভিন্ন সহীহ বর্ণনায় এমন ১০ শ্রেণির মানুষের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের প্রতি আল্লাহর রাসুল ﷺ লানত করেছেন। নিচে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সুদের সাথে জড়িত ৪ শ্রেণির মানুষ
ইসলামে অর্থনৈতিক শোষণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সুদ। সুদ সমাজ ও পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। তাই সুদের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবার ওপরেই লানত বর্ষিত হয়েছে।
হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
“রাসুলুল্লাহ ﷺ লানত করেছেন—১. সুদখোর (যে সুদ খায়), ২. সুদদাতা (যে সুদ দেয়), ৩. সুদের লেখক (যে সুদের চুক্তি লেখে) এবং ৪. সুদের সাক্ষীদ্বয় (যারা সুদের লেনদেনে সাক্ষী থাকে)।” এবং তিনি বলেছেন, “অপরাধের দিক থেকে তারা সবাই সমান।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৫৯৮)
২. মদের সাথে জড়িত ১০ শ্রেণির মানুষ (যাদের মধ্যে মূল ৪টি উল্লেখযোগ্য)
মদকে বলা হয় ‘উম্মুল খাবায়েস’ বা সকল পাপের জননী। মাদক সমাজকে পঙ্গু করে দেয় বলে এর সাথে সম্পৃক্ত পুরো চক্রকে লানত করা হয়েছে।
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ মদের ব্যাপারে ১০ শ্রেণির লোককে লানত করেছেন: ১. যে মদ তৈরি করে, ২. যার জন্য তৈরি করা হয়, ৩. যে পান করে, ৪. যে বহন করে নিয়ে যায়, ৫. যার কাছে বহন করে নেওয়া হয়, ৬. যে পরিবেশন করে, ৭. যে বিক্রি করে, ৮. যে এর মূল্য ভোগ করে, ৯. যে এটি ক্রয় করে এবং ১০. যার জন্য ক্রয় করা হয়। (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস নং- ১২৯৫)
৩. ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতা
বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক ইনসাফ ধ্বংসের মূল কারণ হলো ঘুষ। ঘুষের মাধ্যমে যোগ্য মানুষের অধিকার হরণ করা হয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘুষ দাতা (যে ঘুষ দেয়) এবং ঘুষ গ্রহীতা (যে ঘুষ নেয়)—উভয়ের ওপর লানত করেছেন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং- ৩৫৮০)
৪. চোর (যে মানুষের সম্পদ চুরি করে)
অন্যের কষ্টার্জিত সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা বা চুরি করার অভ্যাসকে ইসলাম কঠোর শাস্তি ও লানতের যোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “আল্লাহ তাআলা চোরের ওপর লানত করুন, যে একটি ডিম চুরি করে এবং তার হাত কাটা যায়, কিংবা একটি রশি চুরি করে এবং তার হাত কাটা যায়।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৬৭৮৩)
৫. লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের মতো সমকামিতায় লিপ্ত ব্যক্তি
প্রাকৃতিক ও স্বভাবজাত লিঙ্গীয় সম্পর্কের বাইরে গিয়ে সমকামিতা বা সমলিঙ্গের প্রতি যৌন আসক্তিতে লিপ্ত হওয়া এক চরম নৈতিক বিপর্যয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের মতো জঘন্য কাজ (সমকামিতা) করবে, তার ওপর আল্লাহর লানত।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং- ২৯১৫)
৬. পিতা-মাতাকে অভিশাপকারী
পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং তাদের গালমন্দ করা বা কষ্ট দেওয়া ইসলামে কবিরা গুনাহ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয়, আল্লাহ তার ওপর লানত বর্ষণ করেন।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৯৭৭)
৭. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে পশু জবেহকারী
কোনো পীর, মাজার, দেব-দেবী বা কোনো সৃষ্টির সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বা তাদের নামে পশু জবেহ করা ‘শিরক’। আর শিরক হলো সবচেয়ে বড় অপরাধ।
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে পশু জবেহ করে, তার ওপর আল্লাহর লানত।” (সহীহ মুসলিম)
৮. জমিনের সীমানা বা আইল পরিবর্তনকারী
পরের জমি অন্যায়ভাবে দখল করার জন্য যারা জমির সীমানা বা আইল এদিক-ওদিক সরিয়ে দেয়, তাদের ওপর আল্লাহর কঠিন অভিশাপ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি (অন্যায়ভাবে অপরের জমি গ্রাস করার উদ্দেশ্যে) জমির সীমানা পরিবর্তন করে, আল্লাহ তার ওপর লানত করেন।” (সহীহ মুসলিম)
৯. নারীদের মতো বেশ ধারণকারী পুরুষ এবং পুরুষালী বেশ ধারণকারী নারী
আল্লাহ মানুষকে যে প্রকৃতি বা লিঙ্গ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, তার অবমাননা করা এবং বিপরীত লিঙ্গের পোশাক ও চালচলন অনুকরণ করাকে নবীজি ﷺ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসুলুল্লাহ ﷺ লানত করেছেন সেসব পুরুষদের যারা নারীদের বেশ ধারণ করে এবং সেসব নারীদের যারা পুরুষদের বেশ ধারণ করে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৫৮৮৫)
১০. কৃত্রিম চুল সংযোগকারী এবং ভ্রু প্লাককারী নারী
সৌন্দর্য বর্ধনের নামে আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি আনা এবং ধোঁকাবাজির আশ্রয় নেওয়া নারীদের ব্যাপারে হাদিসে লানত এসেছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসুলুল্লাহ ﷺ লানত করেছেন উল্কি অংকনকারী (শরীরে ট্যাটু আঁকানো) ও যারা ট্যাটু আঁকায়, আর যারা সৌন্দর্যের জন্য ভ্রু উপড়ে ফেলে (প্লাক করে) এবং যারা দাঁতের মাঝে ফাঁকা সৃষ্টি করে আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি আনে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৪৮৮৬)
নবীজি ﷺ-এর এই লানত বা অভিশাপ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো উম্মতকে এই ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক পাপগুলো থেকে দূরে রাখা। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহর রহমত ও রাসুলের শাফায়াত পাওয়ার আশায় এই ১০টি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে শতভাগ মুক্ত রাখা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুন। আমীন।
ভোরের আকাশ/জেআ