ওফাতের আগে জুমার খুতবায় উম্মতের জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছিলেন নবীজি

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ওফাতের আগে অসুস্থ অবস্থায় জুমার খুতবায় মুসলিম উম্মতের জন্য রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা। তাওহিদ, ন্যায়বিচার, সাহাবিদের মর্যাদা এবং পারস্পরিক অধিকার রক্ষার বিষয়ে তাঁর এই উপদেশ আজও মুসলমানদের জন্য অনুকরণীয়।
সেই খুতবায় উম্মতের জন্য তিনি যেসব দিকনির্দেশনা ও সতর্কবার্তা দিয়ে গেছেন, তার সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো-
দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে নির্বাচন
খুতবার শুরুতে রাসুলুল্লাহ (সা.) সমবেত সাহাবাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়া এবং আল্লাহর নিকট যা আছে (আখেরাত) এ দুটির মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। সেই বান্দা আল্লাহর নিকট যা আছে, তা-ই বেছে নিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি: ৪৬৬)
এ কথা শুনে হজরত আবু বকর (রা.) অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন। উপস্থিত অন্যরা শুরুতে বুঝতে না পারলেও, আবু বকর (রা.) ঠিকই বুঝেছিলেন যে, ‘সেই বান্দা’ স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (স.) এবং তাঁর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
হজরত আবু বকর (রা.)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব
সিদ্দিকে আকবরের কান্না দেখে নবীজি (সা.) তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং তাঁর ত্যাগের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘মানুষদের মধ্যে আবু বকর আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে তার জান ও মাল দিয়ে। আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ‘খলিল’ (অন্তরঙ্গ বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকেই করতাম। কিন্তু ইসলামের ভ্রাতৃত্বই আমাদের জন্য উত্তম।’ এরপর তিনি নির্দেশ দেন, ‘মসজিদে প্রবেশের সব দরজা বন্ধ করে দাও, কেবল আবু বকরের দরজা ছাড়া।’ (সহিহ বুখারি: ৪৬৬, ৩৬৫৪)
আনসারদের প্রতি বিশেষ ওসিয়ত
মদিনার আনসারদের অবদানের কথা স্মরণ করে নবীজি (সা.) মুহাজির ও পরবর্তী উম্মতকে সতর্ক করে বলেন, ‘আমি তোমাদের আনসারদের ব্যাপারে ওসিয়ত করছি। তারা আমার বিশ্বস্ত ভাণ্ডার (গোপন কথা সংরক্ষণকারী)। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, এখন তাদের প্রাপ্য অধিকার বাকি রয়েছে। সুতরাং তাদের নেককারদের সাদরে গ্রহণ করবে এবং তাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে।’ (সহিহ বুখারি: ৩৭৯৯, ৩৮০১)
কবর পূজা ও শিরক থেকে কঠোর সতর্কতা
অসুস্থতার তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও নবীজি (সা.) তাওহিদের ব্যাপারে আপসহীন ছিলেন। তিনি উম্মতকে সাবধান করে বলেন, ‘সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীদের কবরকে সেজদার স্থান বা ইবাদতখানা বানিয়েছিল। আমি তোমাদের এই কাজ করতে নিষেধ করছি। তোমরা কবরকে মসজিদে পরিণত করো না।’ (সহিহ মুসলিম: ৫৩২)
জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত
খুতবার শেষ পর্যায়ে নবীজি (সা.) ন্যায়বিচারের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি যদি কারও পিঠে আঘাত দিয়ে থাকি, তবে এই যে আমার পিঠ- সে যেন বদলা নিয়ে নেয়। আমি যদি কারও সম্পদ নিয়ে থাকি, তবে এই যে আমার সম্পদ- সে যেন তা নিয়ে নেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২৭২)
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যেন এ কথা মনে না করে যে, আমার থেকে প্রতিশোধ নিলে আমি মনঃক্ষুণ্ণ হবো। জেনে রেখো, আমার নিকট সেই ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয়, যে আমার থেকে তার হক আদায় করে নেয় অথবা আমাকে ক্ষমা করে দেয়, যেন আমি আল্লাহর সঙ্গে পরিচ্ছন্ন অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে পারি।’
মহানবী (সা.)-এর ওফাতপূর্ব এই জুমার খুতবা মুসলিম উম্মতের জন্য এক চিরন্তন নসিহত। তাওহিদের ওপর অটল থাকা, মানুষের অধিকার আদায়, সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা রক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।
ভোরের আকাশ/এনএ