দয়া ও ক্ষমাশীলতা—ইসলামের অন্যতম শিক্ষা

মানবতা, মহানুভবতা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক অনন্য ধর্মের নাম ইসলাম। ইসলাম কেবল ইবাদত-বন্দেগির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সৃষ্টির প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনকে ইসলামে ঈমানের অন্যতম পরিমাপক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলার একটি গুণবাচক নাম হলো ‘রহমান’ ও ‘রহীম’—যার অর্থ পরম দয়ালু ও অতিশয় মেহেরবান। আর তাই আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার মূল শর্তই হলো মানুষের প্রতি দয়াশীল হওয়া।
পবিত্র কোরআন, হাদিস এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনীর আলোকে মানুষের প্রতি দয়া ও সহানুভূতির গুরুত্ব এবং এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সৃষ্টির প্রতি দয়া: স্রষ্টার দয়া পাওয়ার শর্ত
ইসলামের মূল কথাই হলো, আপনি যদি আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা পেতে চান, তবে আপনাকে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়ালু হতে হবে। মানুষের সামাজিক মর্যাদা, বর্ণ বা ধর্ম যাই হোক না কেন, সর্বাবস্থায় তার প্রতি মানবিক আচরণ করা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব।
বিশ্বনবী রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “পরম দয়ালু আল্লাহ সেইসব মানুষের প্রতি দয়া করেন, যারা (সৃষ্টির প্রতি) দয়া করে। তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানের মালিক (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং- ৪৯৪১)
২. নিষ্ঠুরতা ঈমানহীনতার লক্ষণ
কারও প্রতি কঠোর হওয়া, মানুষের বিপদে পাশে না দাঁড়ানো কিংবা অন্যের কষ্ট দেখেও উদাসীন থাকাকে ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। যার অন্তরে দয়া নেই, সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।
- হাদিসের হুঁশিয়ারি: রাসুলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৭৩৭৬)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, “কেবল দুর্ভাগা ও পাপিষ্ঠ ব্যক্তির অন্তর থেকেই দয়া-মায়া ছিনিয়ে নেওয়া হয়।” (জামে আত-তিরমিজি)
৩. সাধারণ মানুষের অধিকার ও পরোপকার
ইসলাম সমাজে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতাকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দেওয়া এবং ঋণগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
- আল্লাহর সাহায্য লাভ: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহ তাআলাও ততক্ষণ সেই বান্দার সাহায্যে নিয়োজিত থাকেন।” (সহীহ মুসলিম)
এমনকি কোনো মানুষের সাথে দেখা হলে একটু মুচকি হাসি দেওয়া কিংবা কাউকে পথ দেখিয়ে দেওয়াকেও ইসলামে ‘সদকা’ বা দানের সমতুল্য সওয়াব হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
৪. দুর্বল ও এতিমদের প্রতি বিশেষ সহমর্মিতা
সমাজে যারা অবহেলিত, অসহায় ও দুর্বল—যেমন এতিম, বিধবা ও মিসকিন—তাদের প্রতি ইসলাম সবচেয়ে বেশি কোমল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
- কোরআনের বাণী: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে কঠোরভাবে বলেছেন, “সুতরাং আপনি এতিমের প্রতি কঠোরতা করবেন না এবং সাহায্যপ্রার্থীকে ধমক দেবেন না।” (সূরা আদ-দুহা, আয়াত: ৯-১০)
- জান্নাতের সুসংবাদ: রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর হাতের তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল জোড়া করে দেখিয়ে বলেছেন, “আমি এবং এতিম প্রতিপালনকারী ব্যক্তি জান্নাতে এভাবে একসাথে থাকব।” (সহীহ বুখারী)
৫. অমুসলিমদের প্রতিও ইসলামের উদারতা
অনেকে মনে করেন ইসলাম কেবল মুসলমানদের প্রতিই দয়া করতে বলে, যা সম্পূর্ণ ভুল। ইসলামে যুদ্ধক্ষেত্রেও নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং ধর্মযাজকদের ওপর আঘাত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর চরম শত্রু, যারা তাঁকে নিজ মাতৃভূমি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল এবং নির্যাতন করেছিল, তাদের সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে দয়ার এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
দয়াশীল আচরণের পরকালীন প্রতিদান:
- জাহান্নাম হারাম হওয়া: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না কোন ব্যক্তির জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম এবং কার জন্য জাহান্নাম তাকে স্পর্শ করা নিষিদ্ধ? সে হলো এমন ব্যক্তি, যে মানুষের কাছাকাছি (সহজ সরল), নম্র ও দয়ালু স্বভাবের।” (জামে আত-তিরমিজি)
- মিজানের পাল্লা ভারী হওয়া: কিয়ামতের দিন মুমিনের মিজানের পাল্লায় সুন্দর চরিত্র এবং মানুষের প্রতি দয়াশীল আচরণের চেয়ে ভারী কোনো আমল আর থাকবে না।
আজকের হিংসা-বিদ্বেষ, যুদ্ধ ও হানাহানির বিশ্বে ইসলামের এই দয়া ও মানবতার শিক্ষা সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন—সর্বক্ষেত্রে মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল ও পরোপকারী হওয়াই একজন প্রকৃত মুমিনের আদর্শ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সৃষ্টির প্রতি দয়াশীল হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।