ঘুরে আসুন চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল

চারদিকে চোখ জুড়ানো সবুজ পাহাড়, দিগন্তজোড়া চা বাগানের ঢেউ খেলানো রূপালী সবুজ গালিচা আর লেকের শীতল পরিবেশ—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন তার রূপের সমস্ত ডালি উজাড় করে দিয়েছে এখানে। বলছি বাংলাদেশের পর্যটন কন্যা ও চায়ের রাজধানী হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল-এর কথা।
কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি গিয়ে নিবিড় প্রশান্তি পেতে চাইলে ঘুরে আসার জন্য শ্রীমঙ্গলের কোনো বিকল্প নেই। প্রকৃতির এই সবুজ স্বর্গে কী দেখবেন, কীভাবে যাবেন এবং কোথায় থাকবেন—জেনে নিন তার বিস্তারিত ভ্রমণ গাইড।
শ্রীমঙ্গলের দর্শনীয় স্থানসমূহ
শ্রীমঙ্গলে দেখার মতো অসংখ্য চোখজুড়ানো জায়গা রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান আকর্ষণগুলো হলো:
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান: জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এক অনন্য ক্রান্তীয় বৃষ্টিবহুল অরণ্য। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ট্রেন লাইন ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতা রোমাঞ্চকর। এখানে বিরল প্রজাতির উল্লুক, মুখপোড়া হনুমানসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে।
লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জি: লাউয়াছড়া বনের ভেতরেই গড়ে উঠেছে আদিবাসী খাসিয়াদের নিজস্ব সংস্কৃতির পুঞ্জি বা গ্রাম। খাসিয়াদের জীবনযাত্রা এবং পান চাষের অপূর্ব দৃশ্য এখানে চোখে পড়ে।
বধ্যভূমি ৭১ ও চা জাদুঘর: শ্রীমঙ্গল শহরের পাশেই অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ 'বধ্যভূমি ৭১'। পাশেই রয়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী চা শিল্পের ইতিহাস সংবলিত দেশের একমাত্র চা জাদুঘর।
ব্লেক হ্রদ: মাধবপুর চা বাগানের ভেতরে অবস্থিত পাহাড়ি লেক। লেকের নীল পানিতে ফুটে থাকা শাপলা আর চারপাশের সবুজ চা বাগানের টিলা মন ভরিয়ে দেয়। (কাছাকাছি রয়েছে নীলকণ্ঠ টি কেবিন, যেখানে মিলবে বিখ্যাত ‘সাত রঙের চা’)।
বাইল্যা বিল : পাখিপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অভয়ারণ্য। শীতকালে বা বর্ষায় রূপসী এই বিলে হাজার হাজার অতিথি পাখির জলকেলি দেখার দৃশ্য অতুলনীয়।
হামহাম জলপ্রপাত: অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য শ্রীমঙ্গলের গহীন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা এই ঝরনাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। দুর্গম পাহাড়ি পথ ও কাদা ঝিরি পেরিয়ে হামহামে পৌঁছানোর রোমাঞ্চই আলাদা।
কীভাবে যাবেন?
ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজেই সড়ক ও রেলপথে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়।
ট্রেনে: ঢাকা (কমলাপুর) থেকে প্রতিদিন পারাবত, জয়ন্তিকা, উপবন ও কালনী এক্সপ্রেস ট্রেন শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সময় লাগে প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা।
বাসে: ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল বা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে হানিফ, শ্যামলী, এনা কিংবা সিলেটগামী যেকোনো নন-এসি/এসি বাসে উঠে শ্রীমঙ্গল বাসস্ট্যান্ডে নামা যায়।
কোথায় থাকবেন ও কী খাবেন?
থাকা: শ্রীমঙ্গলে সব বাজেটের পর্যটকদের জন্য থাকার চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। পরিবেশ ও সুবিধা অনুযায়ী থ্রি-স্টার থেকে ফাইভ-স্টার রিসোর্ট (যেমন: গ্র্যান্ড সুলতান, দুসাই, বালিশিরা টি রিসোর্ট) যেমন আছে, তেমনি শহর ও চা বাগানের আশেপাশে বেশ কিছু মানসম্মত কটেজ, ইকো-রিসোর্ট ও হোটেল রয়েছে।
খাওয়া: শ্রীমঙ্গল শহরের ‘পানসী’, ‘পাঁচ ভাই’ কিংবা ‘কুটিবাড়ি’ রেস্তোরাঁয় স্বল্পমূল্যে নানা পদের ঐতিহ্যবাহী ভর্তা-ভাত, হাঁসের মাংস ও দেশি মাছের পদ পাওয়া যায়। আর বিখ্যাত ‘নীলকণ্ঠ টি কেবিন’-এর সাত স্তরের চা কিংবা আনারস রসে তৈরি বিশেষ চা চেখে দেখতে ভুলবেন না।
প্রকৃতিকে ভালোবাসুন এবং ভ্রমণের সময় প্লাস্টিক, বোতল বা উচ্ছিষ্ট ফেলে পরিবেশ নোংরা করবেন না। স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতি ও স্থানীয়দের প্রতি সম্মান বজায় রাখুন।