শীতকাল মানেই ভ্রমণের শুরু। যে সময়ে নেই ভয়াবহ গরমে ক্লান্ত হওয়ার ভয়, নেই বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত সড়কের ঝামেলা। তীব্র দাবদাহ। এজন্যই প্রকৃতিপ্রেমীরা ঘুরতে বেছে নেন শীতকালকে। সব মিলিয়ে শীতকাল ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। আর এই উপযুক্ত সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে দরকার উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করা। এবারের শীতে দেশের কোন কোন স্থান ঘুরতে যেতে পারেন, চলুন জেনে নেওয়া যাক-সুন্দরবনবাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও ভারতের কিছু অংশ নিয়ে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বন। বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ইউনেসকো স্বীকৃত এই বনাঞ্চলটি বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রাণের আধার। এখানে জন্মানো সুন্দরী বৃক্ষের কারণে সুন্দরবন নামেই বিশ্বখ্যাতি পেয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের এই প্রধান বিচরণক্ষেত্রটি।ছবি: সংগৃহীতখানে ঘুরতে যেতে হলে অবশ্যই বন অধিদপ্তর নির্ধারিত ফি দিয়ে অনুমতি ও সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষী নিতে হয়। সেখানকার সবগুলো দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার একমাত্র মাধ্যম লঞ্চ ও ছোট জাহাজ। আগে সুন্দরবনে সাধারণত সবাই খুলনা বা মোংলা হয়েই যেত। তবে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার কারণে এখন সড়কপথেই সুন্দরবন ভ্রমণে যেতে পারছেন পর্যটকরা।শ্রীমঙ্গলমৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। শীতে শ্রীমঙ্গল গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন বেশ কয়েকটি স্থানে। শ্রীমঙ্গল শহরটা ছোট, তবে বেশ গোছানো। এই শহরের বাড়ি, মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ সব স্থাপনার মধ্যেই নান্দনিকতার ছাপ আছে। শহরের বেশির ভাগ জায়গাজুড়েই রয়েছে চা-বাগান। এখানে আপনি যেদিকেই তাকাবেন, দেখবেন চায়ের বাগান, যা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যাবে। যতদূর চোখ যায় কেবল সবুজের হাতছানি। চা বাগানের সারি সারি টিলা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর ঘন সবুজ অরণ্যের অপরূপ সৌন্দর্য।ছবি: সংগৃহীতশ্রীমঙ্গলের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে- লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, চা জাদুঘর, টি রিসোর্ট, ডিনস্টন সিমেট্রি, চাকন্যা ভাস্কর্য, নির্মাই শিববাড়ি, চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, খাসিয়াপুঞ্জি, টিপরা পল্লী, মনিপুরী পাড়া, গারো পল্লী, নীলকণ্ঠ টি কেবিন, বার্নিস টিলা, গলফ কোর্স, পাখি বাড়ি, বাদুর বাড়ি, লালমাটি পাহাড়, রাবার বাগান, আনারস বাগান, মাধবপুর লেক, হাইল হাওড়, বাইক্কা বিল প্রভৃতি।নিঝুম দ্বীপনোয়াখালীর হাতিয়া অঞ্চলে বঙ্গোপসাগরে ঘেরা ছোট্ট এই দ্বীপটির আয়তন প্রায় ১৪ হাজার ৫০ একর। শীতের মৌসুমে পুরো নিঝুম দ্বীপ ভরে যায় অতিথি পাখিতে। এখানকার সবচেয়ে সেরা আকর্ষণ হচ্ছে চিত্রা হরিণ। একসঙ্গে এত চিত্রা হরিণের দেখা দেশের আর কোথাও পাওয়া যায় না। নিঝুম দ্বীপের নামাবাজার সৈকত থেকে উপভোগ করা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্য।ছবি: সংগৃহীতসড়কপথে যে কোনো যানবাহনই ব্যবহার করা হোক না কেন, নিঝুম দ্বীপ যেতে হলে প্রথমে পৌঁছাতে হবে চেয়ারম্যান ঘাটে। এখানকার হাতিয়া যাওয়ার সি-ট্রাক বা ট্রলারগুলো নলচিরা ঘাটে নামিয়ে দেবে। এরপর মোটরসাইকেলে পৌঁছাতে হবে হাতিয়ার অন্য প্রান্ত মোক্তারিয়া ঘাটে। সেখান থেকে ট্রলারে নিঝুম দ্বীপ। তবে সবচেয়ে সেরা উপায় হচ্ছে ঢাকার সদরঘাট থেকে হাতিয়ার লঞ্চে ওঠে পড়া। হাতিয়ায় পৌঁছার পর তমুরদ্দীঘাট থেকে পাওয়া যাবে সরাসরি নিঝুম দ্বীপের ট্রলার।পঞ্চগড়বাংলাদেশের হিমালয় কন্যাখ্যাত জেলা পঞ্চগড়। হিমালয়ের পাদদেশে জেলাটির ভৌগোলিক অবস্থান হওয়ায় পঞ্চগড়কে বলা হছবি: সংগৃহীতয় হিমালয় কন্যা। কাঞ্চনজঙ্ঘা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পর্বত। প্রতিবছর শীতের সময় বাংলাদেশ থেকে দেখা মেলে এই পর্বতের। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেখা মেলে পর্বতের। শীতের আকাশ মেঘমুক্ত ও পরিষ্কার থাকায় ভেসে ওঠে তুষারশুভ্র হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘা।ছবি: সংগৃহীততেঁতুলিয়া উপজেলা শহরের সরকারি ডাকবাংলো চত্বর কিংবা জিরো পয়েন্ট থেকে দেখা মেলে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম পর্বতের। পাশাপাশি স্পষ্টভাবে দার্জিলিংয়ের সবুজে ঘেরা পাহাড় শ্রেণীও দেখা যায়।সেন্টমার্টিন দ্বীপবাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। স্থানীয়দের কাছে নারিকেল জিঞ্জিরা নামে পরিচিত। বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সর্ব দক্ষিণের মাত্র ১৭ বর্গকিলোমিটারের এই ক্ষুদ্র দ্বীপটির অবস্থান কক্সবাজার জেলা শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে। একদিকে নীল দিগন্তের কোণে ফেনিল সমুদ্রের মিশে যাওয়া, অন্যদিকে সারি সারি নারিকেল গাছ ঘেরা সাধারণ জীবন ভ্রমণপিপাসুকে অমোঘ আকর্ষণে কাছে টানে।ছবি: সংগৃহীতজাফলংসুদৃশ্য পাহাড় চুড়া, স্বচ্ছ জলরাশি আর নানান রঙের নুড়ি পাথরের এক অপূর্ব সমন্বয় সিলেটের জাফলং। নগর সভ্যতার যান্ত্রিক কোলাহল ছেড়ে জীবন এখানে এসে মাথা লুকোয় একটু শান্তির খোঁজে। প্রকৃতির মায়াবী পরশে আনন্দে নেচে ওঠে মন। তাই ভ্রমণ মন কে পরিপূর্ণ করে তুলতে যে কেউ আসতে পারেন পাহাড়, পানি ও পাথরভরা রূপকথার রাজ্য জাফলংয়ে। তাছাড়া এখন যুক্ত হয়েছে নতুন একটি ঝরনা মায়াবী ঝরনা।ছবি: সংগৃহীতপ্রকৃতি কন্যা হিসেবে সারা দেশে এক নামে পরিচিত সিলেটের জাফলং। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জাফলং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ জাফলংকে করেছে আকর্ষণীয়। সীমান্তের ওপারে ভারতীয় পাহাড়-টিলা, ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরাম ধারায় প্রবহমান।জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল পানি, উঁচু পাহাড়ের গহিন অরণ্য ও প্রকৃতির শুনশান নীরবতা পর্যটকদের দারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে। তাই যান্ত্রিক সভ্যতার সকল ব্যস্ততা ভুলে গিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও প্রকৃতির কাছে নিজেকে সঁপে দিতে প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ে। জাফলং থেকে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই পাবেন তামাবিল বর্ডার।কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। সাগরের উত্তাল ঢেউ যে কারও মন ভালো করে দেয়। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় সারা দিন। এ কারণেই ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতে থাকে পর্যটকদের ভিড়। এখন ট্রেনেও সহজেই যেতে পারেন কক্সবাজার। এছাড়া ঢাকার ফকিরাপুল, কলাবাগান, সায়েদাবাদ থেকে অধিকাংশ পর্যটক বাসেও যেতে পারেন কক্সবাজার। যেতে সময় লাগে ৮-১০ ঘণ্টা।ছবি: সংগৃহীতআবার চাইলে আকাশপথেও যেত পারেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার দিনে ২০টির বেশি ফ্লাইট কক্সবাজারে পরিচালনা করে। ফলে এক ঘণ্টারও কম সময়ে কক্সবাজার যেতে পারছেন পর্যটকরা।রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যবাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গা অবস্থিত সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায়। প্রায় ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর আয়তনের এই বনভূমিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ১৯৮২ সালে। এটি প্রায় ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রায় ৬২ প্রজাতির প্রাণী এবং প্রায় ১৬৭ প্রজাতির পাখির আবাস।ছবি: সংগৃহীতএই অভয়ারণ্যে আছে অপরূপ সুন্দর তিনটি ট্রেইল, গোটা বন একনজরে দেখার জন্য আছে সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছে টমটমে চড়ে যেতে হবে নতুন ব্রিজ। সেখান থেকে সিএনজিতে চুনারুঘাট মধ্যবাজার পৌঁছে আরেকটি সিএনজিতে কালেঙ্গা বাজার নামতে হবে। এরপর ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটলেই অভয়ারণ্যের প্রধান ফটক।শীতকালে ভ্রমণের সময় অবশ্যই সঙ্গে গরম কাপড় নেওয়া আবশ্যক। এছাড়া ওষুধপত্রের সঙ্গে ডেটল, স্যাভলন, ব্যান্ডেজ ও তুলার মতো কিছু ফার্স্ট এইড সামগ্রী সঙ্গে রাখা উচিত। সুপরিকল্পিত পূর্ব প্রস্তুতিই পারে একটি ভ্রমণ নিরাপদ করে তুলতে।ভোরের আকাশ/তা.কা
১ সপ্তাহ আগে
এক সময় গ্রাম বাংলার কৃষির প্রধান ভরসা ছিল গরু ও লাঙল দিয়ে হাল চাষ। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির বিস্তারে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় সেই ঐতিহ্যবাহী চাষ পদ্ধতি এখন প্রায় বিলুপ্ত।কৃষকরা জানান, লাঙল দিয়ে চাষে জমির গভীর অংশ আলগা হতো, গরুর পায়ে কাদা তৈরি এবং গোবর পড়ে জমির উর্বরতা বাড়ত। কিন্তু বর্তমানে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের ব্যবহারে অল্প সময়ে জমি চাষ সম্ভব হওয়ায় কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী হাল চাষ ছেড়ে দিচ্ছেন।এক সময় কাকডাকা ভোরে গরু, লাঙল ও জোয়াল কাঁধে নিয়ে কৃষকদের মাঠে যেতে দেখা যেত। এখন প্রয়োজন হলেই আধুনিক যন্ত্রে জমি চাষ করা হচ্ছে। এতে হালচাষ নির্ভর অনেক কৃষক পেশা পরিবর্তনে বাধ্য দিচ্ছেন।ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের মহেশপর গ্রামের কৃষক মমতাজ আলী ও নজরুল ইসলাম বলেন, শৈশবে হাল চাষ করেই বড় হয়েছি। তখন বাড়িতে কয়েক জোড়া বলদ, কাঠের লাঙল আর বাঁশের জোয়াল ছিল। এখন সেই দৃশ্য আর নেই।উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ নাসিরুল ইসলাম বলেন, গরু ও লাঙল ছিল পরিবেশবান্ধব ও ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি। তবে আধুনিক প্রযুক্তিতে কম সময়ে কম খরচে বেশি ফলন পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কৃষিতে আরও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন আসবে।আধুনিকতার স্রোতে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার গরু দিয়ে হাল চাষের বহু বছরের চিরচেনা ঐতিহ্য।ভোরের আকাশ/মো.আ.
২ সপ্তাহ আগে
বাঙালি বিয়েতে গায়ে হলুদের রীতিটি প্রাচীন, যা মূলত বর-কনের ত্বককে উজ্জ্বল করা, সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা এবং শুভ ও মঙ্গলময় সূচনাকে প্রতীকায়িত করে; এটি বৈদিক যুগ থেকেই প্রচলিত এবং পুরাণ অনুসারে পার্বতীকে প্রথম হলুদ মাখানো হয়েছিল, যা থেকে এর প্রচলন হয়, তবে এর আধুনিক রূপটি মুঘল আমল থেকে পরিবর্তিত হয়েছে। এটি শুধু একটি প্রথা নয়, বরং পরিবার ও বন্ধুদের অংশগ্রহণে আনন্দ ও উল্লাসের একটি উৎসব, যা নবদম্পতির সুখ-শান্তি ও দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন কামনা করে পালিত হয় এবং অপশক্তি দূর করতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করা হয়।ছবি: সংগৃহীতইতিহাস ও তাৎপর্যপ্রাচীন শিকড়: গায়ে হলুদের রীতি বৈদিক যুগ থেকেই ভারতীয় সমাজে প্রচলিত, যা "গাত্রহরিদ্রা" বা "অধিবাস" নামে পরিচিত ছিল।পৌরাণিক উৎস: পুরাণ অনুযায়ী, বিয়ের আগে শিবরাত্রির আগে পার্বতীকে প্রথম হলুদ মাখানো হয়েছিল, যা এই প্রথার জন্ম দেয়।বিশুদ্ধতা ও শুভতা: হলুদকে শুভ ও পবিত্র মনে করা হয়, যা বর-কনের নতুন জীবন শুরুর আগে তাদের শরীর ও মনকে শুদ্ধ করে।সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য: হলুদ ত্বককে উজ্জ্বল করে এবং সংক্রমণ থেকে বাঁচায়, যা বিয়ের আগে বর-কনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।অপশক্তি দূরীকরণ: এটি অশুভ শক্তি ও নজর থেকে নবদম্পতির দাম্পত্য জীবনকে রক্ষা করার একটি লোকাচার।সাংস্কৃতিক বিবর্তন: মুঘল আমল থেকে এই রীতির কিছু পরিবর্তন এসেছে, এবং এখন এটি একটি আনন্দময় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যেখানে সবাই অংশ নেয়।ছবি: সংগৃহীতবাঙালি বিয়ের আয়োজন মানেই মেহেন্দি, গায়েহলুদ, হলুদ গোসল, বিয়ে, বৌভাত। এসব রীতিনীতি আজকের নয়, হাজার হাজার বছর ধরে বিয়ের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে। বিভিন্ন অঞ্চল বা দেশ থেকে এসব রীতিনীতি বাংলায় এসেছে ব্রিটিশ, মিশর, পারস্যের মানুষদের হাত ধরে।বিয়ের আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হচ্ছে গায়েহলুদ। নব্বই দশকে এই আয়োজন যেমন হতো তার থেকে এখন কিছুটা ভিন্ন। আগে বিয়েরদিন সকালেই বর-কনেকে যার যার বাড়িতে বাড়ির মা-চাচি, খালা, বোন, নানি-দাদিরা হলুদ গায়ে মেখে গোসল করাতেন। বিভিন্ন ধরনের গীত গাইতেন, নাচ-গান করতেন।তবে এখন এই আয়োজন সাধারণত করা হয় সন্ধ্যার পর এবং বিয়ের এক বা দুদিন আগে। এখানে বর-কনেকে একসঙ্গে কিংবা আলাদাভাবে নিজ নিজ বাড়িতে হলুদ ছোঁয়ানো, খাওয়া-দাওয়া, নাচ-গান, ছবি তোলা, আড্ডা এসবের মধ্য দিয়ে আনন্দ করা হয়। এই যে নিয়ম বা আয়োজনের খানিকটা তফাত হলেও এর জনপ্রিয়তা এবং গুরুত্ব কোনোটিই কিন্তু এতটুকু কমেনি।ছবি: সংগৃহীতইতিহাসে দেখা যায়, এই প্রথার মূল উৎস স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য সংক্রান্ত। প্রাচীনকাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সমাজে হলুদ বা হলুদ জাতীয় মসলা বিশেষ করে হালদি বা হলুদের ব্যবহার করা হতো ত্বক পরিষ্কার রাখা, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া রোধ করা, এবং রোদে ও বাতাসে বের হওয়া দূষণ থেকে ত্বককে রক্ষা করার জন্য। তাই গায়েহলুদ কেবল আভিজাত্যপূর্ণ অনুষ্ঠান নয়, বরং কনের ত্বকের স্বাস্থ্য ও উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির জন্য প্রাচীন প্রথাগত চিকিৎসা ভাবনার প্রতিফলন।সামাজিক দিক থেকেও গায়েহলুদ অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এটি কনের ও বর পক্ষের পরিবারের মধ্যে মিলন ও আনন্দ উদযাপনের মাধ্যম। অনুষ্ঠানটি সাধারণত গান, নাচ, হাসি-ঠাট্টা এবং রঙিন সাজ-সজ্জার সঙ্গে পালিত হয়। পল্লী অঞ্চলে দেখা যায়, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন সকলে মিলে কনের হাতে হলুদের প্যাকেট ব্যবহার করে মাখন ও হলুদ মিশিয়ে তার ত্বককে উজ্জ্বল করার কাজ করেন। এই প্রথা কেবল আনন্দই দেয় না, বরং সামাজিক বন্ধন শক্ত করার একটি মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।গায়েহলুদ অনুষ্ঠানের নেপথ্যে একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার প্রতিফলনও রয়েছে। হলুদের হলুদ রংকে সততা, উজ্জ্বলতা এবং শুভতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। বিয়ের পূর্বে কনের শরীরে এই রঙের প্রয়োগ একরকম শুভ প্রেরণা ও সৌভাগ্যের আশ্বাস হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানটি কনের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত, যাতে সে নতুন জীবনের শুরুতে আত্মবিশ্বাসী ও আনন্দময় থাকে।ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, গায়েহলুদ প্রথা মূলত মুসলিম, হিন্দু এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংমিশ্রিত সংস্কৃতির একটি ফলাফল। প্রাচীন হিন্দু বিয়ের প্রথায় হলুদ ব্যবহারের সূত্র ধরা যায়, যেখানে কনের ত্বক ও চেহারাকে শুভ রঙে আচ্ছাদিত করার রীতি ছিল। মুসলিম সমাজেও ধীরে ধীরে এই অনুষ্ঠান গ্রহণ করে, যেখানে স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রথার সঙ্গে মিলিত হয়ে তা আধুনিক বাঙালি গায়ের অনুষ্ঠানে পরিণত হয়।বর্তমান কালে গায়েহলুদ শুধু স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য বা সামাজিক বন্ধনের মাধ্যমই নয়; এটি বাঙালি বিয়ের একটি আবেগপূর্ণ ও ভিজ্যুয়াল আকর্ষণও। কনের রঙিন সাজ, হলুদ-কমলা পোশাক, ফুলের মালা, গান এবং পারিবারিক মিলন সব মিলিয়ে এটি বাঙালি বিয়ের স্মরণীয় ও প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে ফটোশুট ও সামাজিক মাধ্যমে গায়েহলুদকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।গায়েহলুদ অনুষ্ঠান প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, সামাজিক বন্ধন এবং শুভতার প্রতীক হিসেবে বাঙালি বিয়ের অভিন্ন অংশ। এটি কেবল কনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও জীবন্ত রাখে। প্রথাটি প্রমাণ করে যে, বাঙালি সমাজে বিয়ের আগের প্রস্তুতি শুধু আনুষ্ঠানিক নয়, বরং একটি আনন্দময়, সুস্থ ও মিলনমুখর সামাজিক রীতি হিসেবে গড়ে উঠেছে।ভোরের আকাশ/তা.কা
২ সপ্তাহ আগে
গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ- এটি গ্রাম বাংলায় প্রচলিত একটি প্রবাদ। বর্তমান সময়ে পুকুর ভরা মাছ থাকলেও নেই কেবল গোলাভরা ধান। কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য কৃষকদের ধান রাখার সেই গোলাঘর।শস্য ভান্ডারখ্যাত দেশের বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা। এই জেলা ১৩ টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। দিনাজপুর জেলার প্রাচীন ঐতিহ্য ধানের গোলা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এ অঞ্চলের কৃষকের ধান রাখার জন্য ধানের গোলা তেমন আর চোখে পড়ে না। আগে কৃষক বলতে গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ ও গোলা ভরা ধান এখন প্রবাদ বাক্যে পরিণত হতে চলেছে। অতীতে গ্রামবাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক ধানের গোলা এখন বিলুপ্ত প্রায়।আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিক্ষেত ও কৃষকের ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা। অতীতে গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতে ধান মজুদ রাখার জন্য বাঁশ, বেত ও কাদা দিয়ে তৈরি করা হতো গোলাঘর। এর পর তার গায়ে ভিতরে ও বাহিরে বেশ পুরু করে মাটির আস্তারণ লাগানো হত। চোরের ভয়ে এর মুখ বা প্রবেশ পথ রাখা হত বেশ উপরে।এক সময়ে সমাজের নেতৃত্ব নির্ভর করত কার কয়টি ধানের গোলা আছে এই হিসেব কষে। শুধু তাই নয় কন্যা ও বর পক্ষের বাড়ির ধানের গোলার খবর নিতো উভয় পক্ষের লোকজন। যা এখন শুধু কল্পকাহিনী।গোলাঘর দেখা যেত অনেক দূর থেকে। জানা গেছে, একটি গোলাঘর তৈরি করতে খরচ হতো ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। প্রতি বছর ধান কাটার মৌসুমে কৃষাণিরা গোলাঘর লেপে (মাটির আস্তর) প্রস্তুত করে রাখতো। আগের দিনে গোলাঘর দেখে অনুমান করা যেতো এলাকায় কে কত বড় জোতদার। গোলা ঘরের বদলে মানুষ এখন চট ও প্লাস্টিকের বস্তায় ধান ভরে ঘরে মজুদ রাখছেন।গোলা নির্মাণ করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় আগে দক্ষ শ্রমিক ছিল। এখন আর দেশের বিভিন্ন জেলা শহর থেকে আসা গোলা নির্মাণ শ্রমিকদের দেখা মেলে না। তারা বাড়িতে এসে বাঁশ দিয়ে তৈরি করত ধানের গোলা। কাজ না থাকায় এখন তারা ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছে।এই গোলা ছিল সমভ্রান্ত কৃষক পরিবারের ঐতিহ্য। সে সময় ভাদ্র মাসে কাদা পানিতে ধান শুকাতে না পেরে কৃষকরা ভেজা আউশ ধান রেখে দিতো গোলা ভর্তি করে।গোলায় শুকানো ভেজা ধানের চাল হত শক্ত। কিন্তু সম্প্রতি রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আধুনিক কলের লাঙ্গল যেন উল্টে পাল্টে দিয়েছে গ্রাম অঞ্চলের চালচিত্র। গোলায় তোলার মত ধান আর তাদের থাকে না। গোলার পরিবর্তে কৃষকরা ধান রাখা শুরু করেছে আধুনিক গুদামঘরে। নতুন প্রজন্মের কাছে গোলাঘর একটি স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।দিনাজপুর সদর উপজেলার পশ্চিম শীবরামপুর গ্রামের ইকবাল জানান, গোলাঘর একটি পুরোনো ঐতিহ্য এটা আমার দাদার স্মৃতি এটা ১০০ বছরের পুরোনো আমার বাবা ব্যবহার করতো তার পর বর্তমানে আমি ব্যবহার কি এই গোলাঘর প্রায় (হারিয়ে) গেছে। একই গ্রামের অপর একজন বয়োবৃদ্ধ নূর জাহান বলেন, আগে আমরা কাজ শেষে একটু আরাম করতাম । এখন ঠান্ডা নাগাইনা (এসি) ঘর বানিয়ে তালা দিয়া রাখি।বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর।তারা জানান, আগের দিনে ধান রাখার জন্য গোলাঘর ব্যবহার করা হতো। গোলাঘরে ধান রাখায় ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উৎপাত থেকে ফসল রক্ষা পেতো। একটি বড় গোলা ঘরে সাধারণত ২-৩শ’ মণ পর্যন্ত ধান রাখা যেতো। উপজেলার কয়েকটি বসত বাড়ির আঙ্গিনায় এখনো দেখা মেলে গোলাঘরের। তবে এতে এখন আর ধান রাখা হয় না। গ্রাম-বাংলার এ ঐতিহ্যটুকু শুধুই স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছেন তারা।আগামী প্রজন্মের কাছে গোলাঘর একটি স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। আধুনিক গুদাম ঘর ধানচাল রাখার জায়গা দখল করছে। ফলে গোলা ঘরের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলা থেকে।ভোরের আকাশ/মো.আ.
২ সপ্তাহ আগে