অবহেলিত হলেও পুষ্টিতে অনন্য ডেউয়া ফল

আমাদের গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে এমন অনেক ফল, যা অবহেলিত হলেও পুষ্টিগুণে অনন্য। এমনই এক চেনা অথচ বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রায় অপরিচিত ফল হলো ‘ডেউয়া’ বা ‘ঢেউয়া’। অঞ্চলভেদে এটি ‘ডেউফল’ নামেও পরিচিত। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফলটি দেখতে কিছুটা অসমান ও খসখসে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সুস্বাস্থ্যের এক বিশাল ভাণ্ডার।
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ডেউয়া ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম এবং শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে। অবহেলিত এই দেশি ফলের অসাধারণ কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
ডেউয়া ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। ভিটামিন সি আমাদের শরীরের শ্বেত রক্তকণিকার কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে, যা যেকোনো ধরণের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে। নিয়মিত ডেউয়া খেলে সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বর থেকে দূরে থাকা যায়।
২. লিভারের সুরক্ষায় অনন্য
আধুনিক অনিয়মিত জীবনযাত্রার কারণে অনেকেরই লিভারের সমস্যা বা জন্ডিস দেখা দেয়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে লিভারের কার্যক্ষমতা সচল রাখতে ডেউয়া ফলের জুস বা কাঁচা ডেউয়া খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ বের করে লিভারকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
৩. কোষ্ঠকাঠিন্য ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করে
ডেউয়া ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার বা আঁশ। এই আঁশ আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে সচল রাখে এবং খাবার সহজে হজম করতে সাহায্য করে। যাদের দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে, তারা পাকা ডেউয়া খেলে মলত্যাগ সহজ হয়। এছাড়া এটি পেটের অতিরিক্ত গ্যাস ও বুক জ্বালাপোড়া কমাতেও বেশ কার্যকরী।
৪. ত্বক ও চুলের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে
আজকাল আমরা ত্বকের ময়েশ্চারাইজিং বা চুলের উজ্জ্বলতার জন্য কত কিছুই না করি। অথচ প্রাকৃতিকভাবেই ডেউয়া ফলে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের ভেতরের কোলাজেন উৎপাদন বাড়ায়, যা বয়সের ছাপ ও বলিরেখা দূর করতে সাহায্য করে। এর পুষ্টিকর উপাদানগুলো চুলের গোড়া শক্ত করে এবং চুলে একটা প্রাকৃতিক গ্লসি ভাব এনে দেয়।
৫. রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূর করে
শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়, যার ফলে সারাদিন ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব হয়। ডেউয়া ফলে ভালো পরিমাণে আয়রন থাকে, যা শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সরাসরি অংশ নেয়। বিশেষ করে রক্তস্বল্পতায় ভোগা নারীদের জন্য এই ফলটি অত্যন্ত উপকারী।
৬. স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়
ডেউয়া ফলে থাকা পটাশিয়াম আমাদের রক্তনালীগুলোকে শিথিল রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকলে হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না, যা পরোক্ষভাবে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
খাওয়ার একটি দারুণ ঘরোয়া রেসিপি:
কাঁচা ডেউয়া কেটে লবণ, মরিচ ও সামান্য কাসুন্দি দিয়ে মেখে দুপুরের রোদে খাওয়া যেমন তৃপ্তিদায়ক, তেমনি পাকা ডেউয়ার ভেতরের অংশটুকু সামান্য গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে চটকে খেলে মুখের রুচি ফিরে আসে। বিশেষ করে জ্বর হওয়ার পর যাদের মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়, তাদের জন্য ডেউয়া এক মোঘল ওষুধ।
বিদেশি দামী ফল যেমন আপেল, আঙুর বা মাল্টার পেছনে ছুটে আমরা আমাদের হাতের নাগালে থাকা এসব দেশি ফলের পুষ্টিগুণকে অবহেলা করি। অথচ কোনো রকম রাসায়নিক বা ফরমালিন ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা এই ডেউয়া ফল আমাদের সুস্থতার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তাই চলতি মৌসুমে বাজারে বা গ্রামে এই ফলটি দেখলে খাদ্যতালিকায় রাখতে ভুলবেন না।
ভোরের আকাশ/জেআ