অরুণা শানবাগের ঘটনা যেভাবে বদলে দিয়েছিল ভারতের আইন

১৯৭৩ সালের ২৭ নভেম্বর। ভারতের মুম্বাইয়ের কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল (কেইএম) হাসপাতালের ২৫ বছর বয়সী নার্স অরুণা শানবাগের জীবনে ছিল নতুন স্বপ্ন। হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের সঙ্গে তার বাগদান হয়েছিল, সামনে ছিল নতুন জীবন শুরুর প্রস্তুতি।
কিন্তু হাসপাতালের বেজমেন্টে ঘটে যাওয়া একটি নৃশংস হামলা মুহূর্তেই বদলে দেয় সবকিছু।
ডিউটি শেষে পোশাক পরিবর্তনের সময় হাসপাতালের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী সোহনলাল বাল্মীকি তার ওপর হামলা চালান। তদন্তে উঠে আসে, অরুণা তার দায়িত্বে অবহেলা ও হাসপাতালের কুকুরের জন্য রাখা খাবার চুরির বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এর জেরেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি তার ওপর আক্রমণ করেন।
হামলার সময় গলায় শিকল পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হলে দীর্ঘ সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেন না পৌঁছানোর কারণে অরুণার মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরদিন সকালে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
তিনি বেঁচে থাকলেও আর কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাতের কারণে কথা বলা, চলাফেরা কিংবা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তী ৪২ বছর তিনি শয্যাশায়ী অবস্থায় জীবন কাটান।
অভিযুক্ত সোহনলাল বাল্মীকি গ্রেপ্তার হলেও মামলায় যৌন নির্যাতনের অভিযোগ যুক্ত হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সামাজিক কলঙ্কের আশঙ্কায় ঘটনার সেই অংশ প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ফলে ডাকাতি ও হামলার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি কারাদণ্ড ভোগ করেন এবং ১৯৮০ সালে মুক্তি পান।
এদিকে অরুণার ব্যক্তিগত জীবনও ভেঙে পড়ে। তার বাগদান টেকেনি। সময়ের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিও কমে আসে। তবে যে হাসপাতালে তার জীবন বদলে গিয়েছিল, সেই হাসপাতালের নার্সরাই চার দশকের বেশি সময় ধরে তার সেবা-যত্নের দায়িত্ব পালন করেন। তারা নিয়মিত খাবার খাওয়ানো, পরিচর্যা এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেন।
২০০৯ সালে সাংবাদিক ও লেখক পিঙ্কি বিরানি অরুণার পক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে নিষ্ক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করেন। ২০১১ সালে আদালত সেই আবেদন নাকচ করলেও একই রায়ে কঠোর শর্ত ও বিচারিক তত্ত্বাবধানে নিষ্ক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যুর নীতিগত স্বীকৃতি দেয়, যা ভারতের আইনি ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
দীর্ঘ ৪২ বছর শয্যাশায়ী থাকার পর ২০১৫ সালের ১৮ মে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৬৬ বছর বয়সে মারা যান অরুণা শানবাগ। শেষ বিদায়েও তার পাশে ছিলেন সেই নার্সরা, যারা বছরের পর বছর তাকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো আগলে রেখেছিলেন।
ভোরের আকাশ/জেআ