কীভাবে একটি দুর্ঘটনা তৈরি করেছিল দেয়াশলাই?

আগুন মানুষের সভ্যতার চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে। তবে সেই আগুনকে পকেটে নিয়ে ঘোরার মতো সহজ করে তুলেছে যে ছোট্ট কাঠিটি, তার নাম ‘দেয়াশলাই’ বা ম্যাচবক্স। আজ রান্নাঘর থেকে শুরু করে যেকোনো প্রয়োজনে একটি কাঠি ঘষলেই যেখানে মুহূর্তে আগুন জ্বলে ওঠে, সেখানে এই আবিষ্কারের পেছনে লুকিয়ে আছে চমৎকার এক ইতিহাস।
ঠিক ২০০ বছর আগের (১৮২৬ সাল) একটি অনিচ্ছাকৃত ছোট দুর্ঘটনাই মানবজাতিকে উপহার দিয়েছিল আগুন জ্বালানোর এই জাদুকরী ও সহজ উপায়।
রসায়নাগারের এক খামখেয়ালী দুর্ঘটনা থেকে কীভাবে তৈরি হলো প্রথম দিয়াশলাই, সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস নিয়ে এই প্রতিবেদন।
আবিষ্কারক কে ছিলেন?
১৮২৬ সালের কথা। ইংল্যান্ডের স্টকটন-অন-টিজ নামক এলাকার এক ফার্মাসিস্ট ও রসায়নবিদ ছিলেন জন ওয়াকার (John Walker)। তিনি মূলত ল্যাবরেটরিতে নানা ধরণের রাসায়নিক উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালোবাসতেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, তিনি কোনো দিয়াশলাই বা ম্যাচবক্স আবিষ্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছিলেন না; তিনি তৈরি করতে চেয়েছিলেন বিস্ফোরক বা নতুন কোনো রাসায়নিক মিশ্রণ।
সেই ঐতিহাসিক ‘দুর্ঘটনা’
একদিন জন ওয়াকার তার গবেষণাগারে একটি কাঠের কাঠির সাহায্যে কয়েকটি রাসায়নিক উপাদান একসাথে মেশাচ্ছিলেন। সেই মিশ্রণে ছিল অ্যান্টিমনি সালফাইড (Antimony Sulfide), পটাসিয়াম ক্লোরেট (Potassium Chlorate), আঠা এবং স্টার্চ।
মিশ্রণটি নাড়তে নাড়তে একসময় কাঠির মাথায় সেই আঠালো রাসায়নিকের একটি দলা বা ফোঁটা শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়। কাজ শেষে ওয়াকার লক্ষ্য করলেন কাঠির মাথায় ওই শক্ত পদার্থটি লেগে আছে। তিনি অবহেলাবশত কাঠিটি পরিষ্কার করার জন্য তাঁর ঘরের পাথুরে মেঝেতে জোরে একটি ঘষা দেন। আর তখনই ঘটে সেই জাদুকরী ঘটনা!
মেঝেতে ঘষা লাগার সাথে সাথে তীব্র ঘর্ষণে হঠাৎ করেই দপ করে জ্বলে ওঠে আগুন। ওয়াকার নিজেই এই কাণ্ড দেখে চমকে যান। তিনি বুঝতে পারেন, কোনো পাথর বা চকমকি ঘষার ঝামেলা ছাড়াই কেবল ঘর্ষণের মাধ্যমে কত সহজে আগুন জ্বালানো সম্ভব!
‘ফ্রিকশন লাইটস’ এবং দেয়াশলাইর বাণিজ্যিক যাত্রা
এই দুর্ঘটনার পর জন ওয়াকার তাঁর আবিষ্কারকে আরও নিখুঁত করার কাজে লেগে যান। ১৮২৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি নিজের তৈরি এই কাঠির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘ফ্রিকশন লাইটস’ (Friction Lights)।
- শুরুর দিকে তিন ইঞ্চি লম্বা কার্ডবোর্ডের বাক্সে এই কাঠিগুলো বিক্রি হতো।
- প্রতিটি বাক্সের সাথে এক টুকরো শিরীষ কাগজ (Sandpaper) দেওয়া হতো, যাতে কাঠিটি ঘষে আগুন জ্বালানো যায়।
- তবে জন ওয়াকার এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কোনো ‘পেটেন্ট’ বা স্বত্ব নিজের নামে করাননি। তিনি চেয়েছিলেন এই সহজ প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের উপকারে আসুক।
পরবর্তীতে আধুনিকায়ন
ওয়াকারের তৈরি প্রথম দেয়াশলাইটি কিন্তু পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না। কাঠি জ্বলার সময় তীব্র গন্ধ ও ধোঁয়া হতো, এমনকি কখনো কখনো জ্বলন্ত ফুলকি ছিটকে এসে দুর্ঘটনা ঘটতো। পরবর্তীতে ১৮৩০ সালে ফরাসি রসায়নবিদ চার্লস সোরিয়া এতে ‘সাদা ফসফরাস’ ব্যবহার করেন, যা গন্ধ দূর করলেও ছিল প্রচণ্ড বিষাক্ত।
অবশেষে ১৮৫৫ সালে সুইডেনের বিজ্ঞানী জে ই লুন্ডস্ট্রম (J.E. Lundstrom) আবিষ্কার করেন আজকের ‘নিরাপদ দেয়াশলাই’ বা সেফটি ম্যাচ (Safety Match)। তিনি বিষাক্ত উপাদানের বদলে লাল ফসফরাস ব্যবহার করেন এবং কাঠিটি বাক্সের গায়ে ছাড়া অন্য কোথাও ঘষলে যেন আগুন না জ্বলে, সেই নিরাপদ প্রযুক্তি নিশ্চিত করেন।
ইতিহাসের শিক্ষা:
পেনিসিলিন থেকে শুরু করে দেয়াশলাই—বিজ্ঞানের ইতিহাসের অনেক বড় বড় এবং যুগান্তকারী আবিষ্কারই ঘটে গেছে রসায়নাগারের কোনো না কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল বা দুর্ঘটনার মাধ্যমে। আজ থেকে ঠিক দুই শতাব্দী আগে জন ওয়াকারের মেঝের সেই ছোট্ট ঘষাটি যদি সেদিন না লাগতো, তবে হয়তো মানবজাতিকে দেশলাইর আলো পেতে আরও বহু বছর অপেক্ষা করতে হতো।
ভোরের আকাশ/জেআ