ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ বাহাদুর শাহ পার্কের পানির ট্যাংক

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার ও পুরান পল্টনের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাহাদুর শাহ পার্ক (সাবেক ভিক্টোরিয়া পার্ক) কেবল একটি ঐতিহাসিক উদ্যান নয়, এটি ঢাকার প্রথম আধুনিক সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার এক নীরব সাক্ষী। ১৯ শতকের শেষভাগে আর্সেনিক ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে ঢাকাবাসীকে বাঁচাতে এই উদ্যানেই নির্মিত হয়েছিল ঢাকার প্রথম বিশাল উঁচুকৃত লোহার পানির ট্যাংক।
ঢাকার নবাব পরিবার ও ব্রিটিশ প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই পানির ট্যাংকটি তৎকালীন নগর পরিকল্পনায় এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে।
১. কেন প্রয়োজন হয়েছিল এই পানির ট্যাংক?
১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়েও ঢাকা শহরের মানুষের সুপেয় পানির প্রধান উৎস ছিল বুড়িগঙ্গা নদী, বিভিন্ন দিঘি ও কুয়ো (কূপ)। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে কলেরা ও ডায়রিয়ার মতো মারণব্যাধি প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিত।
এই সংকট নিরসনে ঢাকার দানবীর খাজা আব্দুল গনি (নবাব আহসানউল্লাহর পিতা) ১৮৭৪ সালে ঢাকাবাসীর জন্য বিশুদ্ধ ফিল্টারড পানি সরবরাহের উদ্দেশ্যে একটি প্রজেক্টের সূচনা করেন। তিনি এর জন্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা অনুদান দেন, যা তৎকালীন সময়ে ছিল এক প্রকাণ্ড অংক।
২. আলেকজান্ডার ওয়াটার ওয়ার্কস ও পার্কের পানির ট্যাংক
১৮৭৮ সালে চাঁদনী ঘাটে বুড়িগঙ্গার পানি শোধনাগার বা ‘আলেকজান্ডার ওয়াটার ওয়ার্কস’ স্থাপন করা হয়। সেখান থেকে পরিশোধিত পানি পুরো পুরান ঢাকায় সঠিক প্রেশারে বা চাপে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি উঁচু রিজার্ভার বা ওয়াটার ট্যাংকের প্রয়োজন পড়ে।
স্থান নির্বাচন: শহরের কেন্দ্রস্থল হওয়ায় তৎকালীন ভিক্টোরিয়া পার্কের (বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্ক) ভেতরের উত্তর-পূর্ব কোণে একটি বিশাল লোহার ওয়াটার টাওয়ার বা উঁচু ওয়াটার ট্যাংক স্থাপন করা হয়।
প্রকৌশল বিস্ময়: লোহার বিশাল স্তম্ভের ওপর বসানো এই ট্যাংকটি ছিল তৎকালীন প্রযুক্তির অনন্য নিদর্শন। বুড়িগঙ্গা থেকে পাম্প করা পানি এতে জমা হতো এবং সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঢাকা শহরের মোড়ে মোড়ে থাকা কলের সাহায্যে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।
৩. সিপাহী বিদ্রোহের রক্তঝরা ইতিহাসের সাথে সংযুক্তি
বাহাদুর শাহ পার্ক এমনিতেই ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহী ভারতীয় সিপাহীদের ধরে এনে ইংরেজ শাসকেরা এই পার্কের গাছে গাছে ফাঁসি দিয়েছিল।
বিদ্রোহের ঘটনার ঠিক দুই দশক পর নির্মিত এই পানির ট্যাংকটি পার্কের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সিপাহীদের স্মৃতিবিজড়িত এই পার্কে নির্মিত ট্যাংকটি দীর্ঘ কয়েক দশক পুরান ঢাকাবাসীর সুপেয় পানির তৃষ্ণা মিটিয়েছে।
৪. আধুনিকায়ন ও স্মৃতির রূপান্তর
২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা শহরের ব্যাপ্তি বেড়ে গেলে এবং আধুিক পাম্পিং স্টেশন ও গভীর নলকূপ চালু হলে বাহাদুর শাহ পার্কের এই লোহার পানির ট্যাংকের উপযোগিতা আস্তে আস্তে কমে আসে। পরবর্তীতে স্থানটি পুনঃউন্নয়ন ও ১৮৫৭ সালের শহীদদের স্মরণে একটি বিশালাকার স্মারক স্তম্ভ নির্মাণ করার সময় পুরনো ট্যাংক কাঠামোটি সরিয়ে ফেলা হয়।
বাহাদুর শাহ পার্কের সেই পানির ট্যাংকটি আজ আর শারীরিকভাবে বিদ্যমান নেই, কিন্তু ঢাকার নগর অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে এটি চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। বুড়িগঙ্গার নোংরা পানি থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্ত করে আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার এই প্রথম পদক্ষেপটি পুরান ঢাকার স্মৃতিকথায় আজও উজ্জ্বল।
ভোরের আকাশ/জেআ