কেন গ্রিনল্যান্ডের নাম ‘গ্রিন’ আর আইসল্যান্ডের নাম ‘আইস’?

মানচিত্রের দিকে তাকালে পৃথিবীর দুটি বিখ্যাত বড় দ্বীপ—গ্রিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের নাম দেখে যে কেউ কিছুটা বিভ্রান্ত হতে পারেন। যে দেশটির নাম ‘গ্রিনল্যান্ড’ বা ‘সবুজ ভূমি’, তার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা জুড়ে রয়েছে মাইলের পর মাইল কঠিন বরফের চাদর। অন্যদিকে, যে দেশের নাম ‘আইসল্যান্ড’ বা ‘বরফের দেশ’, সেখানে বরফের চেয়ে সবুজ ঘাস, আগ্নেয়গিরি ও নয়নাভিরাম প্রকৃতির সমারোহই বেশি!
নামের এই অদ্ভুত বিপরীতমুখী আচরণের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীর ভাইকিং জলদস্যু, প্রতারণা এবং ঐতিহাসিক চাতুর্যের এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
১. ‘গ্রিনল্যান্ড’: ইতিহাসের প্রথম বড় বিপণন কৌশল
গ্রিনল্যান্ডের নামকরণের গল্পটি যুক্ত রয়েছে ইতিহাসের এক কুখ্যাত ও চালাক ভাইকিং জলদস্যু ‘লাল এরিক’ -এর নামের সাথে।
অনাকাঙ্ক্ষিত আবিষ্কার: খ্রিস্টাব্দ ৯৮২ সালের দিকে লাল এরিক নরওয়ে থেকে আইসল্যান্ডে আসেন। কিন্তু সেখানে একটি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ায় তাকে তিন বছরের জন্য আইসল্যান্ড থেকে নির্বাসিত করা হয়। নির্বাসনে গিয়ে তিনি পশ্চিম দিকে সমুদ্রযাত্রা করেন এবং সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত এক বিশাল বরফাবৃত দ্বীপে গিয়ে পৌঁছান।
বিপণন চাতুরী: তিন বছর নির্বাসনের মেয়াদ শেষ হলে এরিক যখন আইসল্যান্ডে ফিরে আসেন, তখন তিনি চান যে অন্য মানুষরাও তাঁর আবিষ্কৃত সেই দ্বীপে গিয়ে বসতি স্থাপন করুক। কিন্তু ‘বরফের দ্বীপ’ বললে তো কেউ সেখানে যেতে চাইবে না!
নামকরণ: আইসল্যান্ডের অধিবাসীদের আকৃষ্ট করতে এরিক চালাকি করে সেই চরম শীতল ও বরফে ঢাকা মহাদেশের নাম রাখেন ‘গ্রিনল্যান্ড’ (সবুজ ভূমি)। ভাইকিংদের ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, এরিক মনে করেছিলেন যে একটি সুন্দর ও লোভনীয় নাম দিলে মানুষ খুব সহজেই সেখানে গিয়ে বসতি গড়ে তুলবে।
এরিকের এই চাতুরি কাজে দিয়েছিল; তাঁর মিষ্টি কথায় ভুল করে বহু নরওয়েজীয় ও আইসল্যান্ডীয় অধিবাসী জাহাজ সাজিয়ে গ্রিনল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিল!
২. ‘আইসল্যান্ড’: রাগ ও শত্রুকে দূরে রাখার নাম!
আইসল্যান্ডের ক্ষেত্রে ঘটনাটি ঘটেছিল ঠিক এর বিপরীত। এর নামকরণের পেছনে ছিল ভয়, বিষাদ এবং নিরাপত্তার রাজনীতি।
প্রথম নাম ছিল ‘স্নো-ল্যান্ড’: খ্রিস্টীয় নবম শতকে এক ভাইকিং নাবিক নদ্দোদুর প্রথম এই দ্বীপে পৌঁছান। তিনি যখন পা রাখেন, তখন তুষারপাত হচ্ছিল বলে এর নাম দিয়েছিলেন ‘স্নোল্যান্ড’। পরবর্তীতে আরেক ভাইকিং এর নাম রাখেন ‘গার্ডারশোমার’ ।
ফ্লোকি এবং আইসল্যান্ডের জন্ম: পরবর্তীতে ‘ফ্লোকি ভিলগার্ডারসন’ নামে এক দুর্ধর্ষ ভাইকিং তাঁর পরিবার ও গবাদিপশু নিয়ে এই দ্বীপে পাকাপাকিভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে আসেন। কিন্তু শীতকাল এলে প্রচণ্ড ঠান্ডায় তাঁর সমস্ত গবাদিপশু মারা যায়। চরম হতাশা ও কষ্টে ফ্লোকি যখন পাহাড়ের চূড়ায় ওঠেন, তখন তিনি চারপাশের সমুদ্রে কেবল বিশাল বিশাল বরফখণ্ড ভেসে বেড়াতে দেখেন।
শত্রু তাড়াতে নাম রাখা: ক্ষোভ, কষ্ট ও বিরক্তি থেকে তিনি এই দ্বীপের নাম দেন ‘আইসল্যান্ড’ ।
ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি: স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, আইসল্যান্ডের চমৎকার সবুজ প্রকৃতি এবং উর্বর জমিও এই নামকরণের পেছনে বড় কারণ ছিল। ভাইকিংরা চেয়েছিল অন্যান্য ইউরোপীয় দস্যু বা শত্রুরা যেন এই সুন্দর দ্বীপের খোঁজ পেয়ে দখল করতে না আসে। তাই তারা ইচ্ছা করেই এমন এক ভীতিকর ‘বরফের দেশ’ নাম ছড়িয়ে দিয়েছিল, যাতে বাইরের মানুষ একে বসবাসের অযোগ্য ভেবে এড়িয়ে চলে!
বর্তমান বাস্তবতা: বরফ ও সবুজের খেলা
প্রকৃতির নিয়মে এই দুই দ্বীপের নামের বিভ্রান্তি আজ আরও দৃশ্যমান:
- গ্রিনল্যান্ড: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রিনল্যান্ডের বিশাল বরফের স্তর আগের চেয়ে দ্রুত গলছে।
- আইসল্যান্ড: গলফ স্ট্রিম থেকে আসা উষ্ণ সামুদ্রিক বাতাসের কারণে আইসল্যান্ডের তাপমাত্রা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে অনেক সহনীয় এবং গ্রীষ্মকালে এটি সত্যি এক সবুজ স্বর্গে পরিণত হয়।
প্রায় এক হাজার বছর আগে ভাইকিংদের নেওয়া প্রচার কৌশল ও রাজনৈতিক চাল আজও বিশ্ব মানচিত্রে এক বড় রসিকতা হয়ে টিকে রয়েছে। এক ভাইয়ের চালাকি আর অন্য ভাইয়ের বিষাদই আজ বিশ্বের দুটি দ্বীপকে ঐতিহাসিক এক মিথে পরিণত করেছে।
ভোরের আকাশ/জেআ