কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি দখল ও ঝাউবন উজাড় : প্লট বাণিজ্যে: হুমকিতে উপকূল ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন বালিয়াড়ি ও ঝাউবাগান উজাড় করে অবৈধভাবে প্লট তৈরি ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালী একাধিক ভূমিদস্যু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। সরকারি খাস জমি জাল স্ট্যাম্প ও নিজস্ব তৈরি কাগজপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা, কামাল উদ্দীন, সিরাজুল ইসলাম, আবুল কালাম, বশির আহমদ, তাজউদ্দীন, নুরুল আমিন, নুরুল আবছার সোলাইমান ও আরমান চৌধুরীসহ অনেকেই জানান, দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিত একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে বালিয়াড়ি দখল করছে।
ঝাউবন কেটে দখল, এরপর প্লট বিক্রি: অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে ঝাউগাছ কেটে জমি খালি করা হয়। এরপর বালিয়াড়ি খনন করে তৈরি করা হয় মৎস্য ঘের। পরে ওই জমি ঘিরে দখল নিশ্চিত করে প্লট আকারে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন ক্রেতার কাছে।
সরেজমিনে নাজিরারটেক সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শত শত ঝাউগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বালিয়াড়ি ঘিরে নির্মাণ করা হয়েছে মৎস্য ঘের, ভাগ করা হয়েছে প্লট আকারে জমি এবং স্থাপন করা হয়েছে পাহারাদার ও সিসিটিভি ক্যামেরা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এই দখল সিন্ডিকেটে মহেশখালীর বাসিন্দা সায়েম নামের এক আইনজীবীসহ কয়েকজন প্রভাবশালীর নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা হচ্ছেন, মোঃ সেলিম, সৈয়দ আলম,সোহেল, মোস্তাক, নাছির, মিজান, মনির,সাইফুল, গিয়াস উদ্দিন, মনির, হুমায়ুন ও কায়ছারসহ আরো অনেক।এদের মধ্যে রোহিঙ্গা নাগরিক ও আছে। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও রোহিঙ্গা শ্রমিক ব্যবহার করে দখল কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানের পাশেই নতুন দখল: একদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্ট, সুগন্ধা ও কলাতলী এলাকায় সহস্রাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে। অন্যদিকে মাত্র দুই কিলোমিটার উত্তরে বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশে নাজিরারটেক এলাকায় প্রায় ৭০০ একর বালিয়াড়ি নতুন করে দখলের শিকার হচ্ছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন: এত বড় দখল বাণিজ্য চললেও কারা এর পেছনে শক্তি জোগাচ্ছে? স্থানীয়দের দাবি, বন পাহারাদারসহ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারী কিছু ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এই দখল প্রক্রিয়ায় জড়িত। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দখলদারদের রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও দখল কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।অভিযুক্তের বক্তব্য অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত এক ব্যক্তির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। সর্বশেষ ১৪ এপ্রিল ফোনে বিষয়টি শুনে ব্যস্ততার কথা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন এবং পরবর্তীতে আর সাড়া দেননি ওই আইনজীবী।
ভয়ে নীরব স্থানীয়রা: স্থানীয়দের মতে, দখলকারীদের পরিচয় অনেকেই জানেন। তবে প্রভাবশালী হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ প্রতিবাদ করে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বন বিভাগের অবস্থান কক্সবাজার বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. হাবিবুল হক বলেন,“দখলের বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। তবে বন বিভাগের একার পক্ষে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন। যৌথ অভিযান হলে দখলমুক্ত করা সম্ভব।”
তিনি জানান, পূর্বে হিমছড়ি এলাকায় অভিযানে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। তাই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
প্রশাসনের আশ্বাস; কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা তাসনিম বলেন,“দখলদার যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তালিকা প্রস্তুত করে আইনের আওতায় আনা হবে। খুব দ্রুত কঠোর অভিযান শুরু করা হবে।”
প্রশাসনের দাবি: অনেক সময় অভিযান পরিচালনার আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা: পরিবেশবিদদের মতে, ঝাউবন উপকূলীয় বালিয়াড়িকে স্থিতিশীল রাখে এবং সাগরের ভাঙন থেকে উপকূল রক্ষা করে। নির্বিচারে ঝাউগাছ নিধন ভবিষ্যতে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন: নাজিরারটেক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সমুদ্রভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একই সঙ্গে বিশ্বের দীর্ঘতম ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত এই এলাকাটি পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, নাজিরারটেক ও আশপাশের অঞ্চলকে জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।
এখন দেখার বিষয়: দীর্ঘদিনের দখল বাণিজ্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ঘোষিত অভিযান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়—এখন সেদিকেই তাকিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।
ভোরের আকাশ/এনউব