শিরোনাম
ঢামেকে চলছে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট, ভোগান্তিতে রোগীর স্বজনরাচার দফা কমার পর সোনার ভরিতে বাড়ল ২২১৬ টাকাব্রাজিলে নির্বাচনে হেরে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালেন বলসোনারোবিশ্ববাজারে বেড়েছে তেলের দামদেহরক্ষীসহসহ বেলুচ রাজপুত্রকে অপহরণভারতের উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণবপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জেবিআইসি গভর্নরের বৈঠকবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীঢামেকে চলছে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট, ভোগান্তিতে রোগীর স্বজনরাচার দফা কমার পর সোনার ভরিতে বাড়ল ২২১৬ টাকাব্রাজিলে নির্বাচনে হেরে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালেন বলসোনারোবিশ্ববাজারে বেড়েছে তেলের দামদেহরক্ষীসহসহ বেলুচ রাজপুত্রকে অপহরণভারতের উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণবপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জেবিআইসি গভর্নরের বৈঠকবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে সাত বছরেও সংস্কার হয়নি শহীদ জিয়া শিশু পার্ক

মাজাহারুল ইসলাম

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে এক বছরের কাজে সাত বছর পার হলেও সংস্কার হয়নি শহীদ জিয়া শিশু পার্ক। আধুনিকায়নের নামে সাত বছর আগে রাজধানীর শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশু পার্ক বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। তখন বলা হয়েছিল, এক বছরের মধ্যে এই পার্কের আধুনিকায়নের কাজ শেষ হবে। কিন্তু সাত বছর পার হলেও এ কাজ শেষ হওয়ার কোনো খবর নেই। কবে নাগাদ এ সংস্কার কাজ শেষ হবে বা কবে নাগাদ আবার পার্কটি চালু হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।

ঢাকাবাসীর অভিযোগ, ঈদ বা সাপ্তাহিক ছুটিতে নগরে শিশু-কিশোরদের বিনোদনে পছন্দের শীর্ষে ছিল শাহবাগের শিশু পার্ক। এখানে ছিল অল্প টাকায় সব শ্রেণির মানুষের বিভিন্ন রাইডে চড়ার সুযোগ। শিশু-কিশোরের কোলাহলে মেতে উঠতো পুরো শাহবাগ এলাকা। আধুনিকায়নের নামে সাত বছর ধরে পার্কটি বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এতে আনন্দ-বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা।

এদিকে পার্কটি খোলা আছে বা পার্কের সংস্কার কাজ শেষ হয়েছে মনে করে ঈদ বা সরকারি ছুটির দিনগুলোতে শিশুদের নিয়ে পার্কের সামনে এখনো ভিড় করেন অনেক অভিভাবক। কিন্তু পার্কের বেহাল অবস্থা দেখে আক্ষেপ নিয়েই ফিরে যান তারা। প্রত্যাশা থাকলেও এবার ঈদুল ফিতরেও চালু হলো না পার্কটি। শহীদ জিয়া শিশু পার্কের জায়গার মালিক গণপূর্ত অধিদপ্তর। তবে পরিচালনার দায়িত্ব ছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টদের দাবি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে পার্কটি আধুনিকায়নের কাজ যথাসময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। যদিও এখন পার্কের রাইড কেনাসহ আনুষঙ্গিক সব কাজ খুব দ্রুত গতিতে চলছে। ২০২৭ সালের জুনে পার্কটি চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।

ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে পার্কটি আধুনিকায়নে তাদের প্রস্তাব দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, শাহবাগে যে শিশুপার্ক রয়েছে, সেটির সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্য একটি প্রকল্পের (স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ-তৃতীয় পর্যায়) আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ৭৮ কোটি টাকা দেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এর কারণ ওই প্রকল্পের জন্য শিশুপার্কের নিচ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পার্কিং হবে। এতে পার্কের কিছু রাইড ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নতুন রাইড কেনার পাশাপাশি পার্কের আধুনিকায়নের জন্য মূলত ওই টাকা দিতে চেয়েছিল মন্ত্রণালয়। কিন্তু টাকার পরিমাণ কম হওয়ায় প্রস্তাব নাকচ করেন ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পার্কের সামনে একটি বিজ্ঞপ্তি টাঙিয়ে এটি বন্ধ ঘোষণা করে দেয় ডিএসসিসি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় শিশু পার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন থাকায় অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় শিশু পার্ক সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে। পরে ২০২০ সালের মে মাসে ডিএসসিসির মেয়রের দায়িত্ব নেন শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি নিজেদের উদ্যোগে শিশু পার্ক আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত নেন।

এজন্য ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করে ডিএসসিসি। ২০২৩ সালের আগস্টে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রকল্প পাসের সময় ঠিক হয়, প্রকল্পের ৪৮৩ কোটি টাকা দেবে সরকার। সরকারের দেওয়া টাকার অর্ধেক হবে অনুদান, বাকি অর্ধেক ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। আর দক্ষিণ সিটির নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করা হবে ১২০ কোটি টাকা।

এ প্রকল্পের বেশির ভাগ ব্যয় (৪৪১ কোটি টাকা) ধরা হয় শিশু পার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনা ও স্থাপন বাবদ। তখন এসব রাইড ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আনার পরিকল্পনা করা হয়। তবে দরপত্র চূড়ান্তের আগেই এসব রাইডের দাম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কিছুদিন আগে গোপনে দেশ ছাড়েন মেয়র শেখ তাপস। এরপর রাইড কেনার কাজ আটকে যায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পার্কের রাইড কেনাসহ সার্বিক প্রকল্পটি মূল্যায়ন করে ডিএসসিসি। দূর হয় পার্কের অবকাঠামো উন্নয়নের সব বাধা।

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিছুর রহমান বলেন, বাজারদর যথাযথ মূল্যায়ন করেই ওই প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর প্রকল্পের মালামালের দাম নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। পরে এর দাম পুনর্মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে ডিএসসিসি। সেই কমিটিও সব কিছু যাচাই করেছে। দামে কোনো ব্যত্যয় হয়নি। এখন দ্রুত সময়ের মধ্যে শিশু পার্কের রাইডগুলো কেনার প্রস্তুতি চলছে। আর সার্বিক প্রকল্পের কাজ ৩৭ শতাংশ শেষ হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ডিএসসিসির সাবেক মেয়র তাপসের আগ্রহে চার বছর আগে (২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ) এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা নেমে এসেছে। পার্কের নিচে গর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে প্রকল্প নিয়েছিল, তা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শেষ হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, আগে শিশু পার্কটি যে জায়গায় ছিল, এখন তার বড় একটি অংশে ভূগর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণ করা হয়েছে। এ পার্কিংয়ের ছাদ মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচু। এছাড়া আগে শিশুপার্কের ভেতরে যে রাইডগুলো ছিল এখন তার অস্তিত্ব নেই। পার্কের সামনে নয়টি টং দোকান বসেছে। এসব দোকানে মানুষ বসে চা-পানি-সিগারেট খাচ্ছেন। এ অবস্থা দেখে অসংখ্য শিশু-কিশোর বাবা-মায়ের সঙ্গে মন খারাপ করে ফিরে যাচ্ছে। ঈদের ছুটি থাকায় পার্কের ভেতর কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি। গতকাল বিকেল ৩টায় স্কুলপড়ুয়া সন্তানকে নিয়ে শিশুপার্কের সামনে আসেন লালবাগের হাসিব আল হাসান। কিন্তু পার্কের এ অবস্থা দেখে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

এ সময় আলাপকালে তিনি বলেন, একটি পার্কের সংস্কার কাজ শেষ করতে সাত বছর লাগে? ঈদের ছুটিতে শিশু-কিশোরদের বেড়ানোর জন্য ঢাকায় কোনো জায়গা নেই। আগে আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন থেকে এ পার্কে বেড়াতে আসতাম। এখন নিজের শিশুর খেলার জায়গা নেই। মতিঝিল থেকে শাহবাগে শিশু পার্কে আসেন আনিছ মিয়া। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী-সন্তান। তবে বেহাল পার্ক দেখে ফিরে যান।

এ সময় আনিছ মিয়া নামের এক ব্যক্তি বলেন, আগে এ শিশু পার্কে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাচ্চাদের নিয়ে আসতেন অভিভাবকেরা। আর পার্কে মাত্র ১০ টাকা হারে ছয়টি রাইড ব্যবহার করতে পারতো শিশুরা। ছুটির দিনগুলোতে পার্কে কোলাহল লেগে থাকতো। কিন্তু সংস্কারের নামে পার্কটি সাত বছর ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছাড়া আর কিছুই নয়। ভূগর্ভস্থ পার্কিং করতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পার্কটি বন্ধ রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান।

সম্প্রতি তিনি বলেন, শিশুদের মানসিক বিকাশে খেলাধুলার বিকল্প নেই। কিন্তু পর্যাপ্ত পার্ক-মাঠ না থাকায় ঢাকার শিশুদের সেই সুযোগ নেই। এ ব্যর্থতার দায় নগর কর্তৃপক্ষের। অবিলম্বে পার্কের আধুনিকায়নের কাজ শেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য তা খুলে দিতে হবে। সম্প্রতি ডিএসসিসির প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, আমি ডিএসসিসির দায়িত্ব নেওয়ার পর পার্কের সংস্কার কাজের খোঁজখবর নিয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের বলেছি। আশা করি এবার প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবো।

ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ সূত্র জানায়, ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীন এ শিশুপার্ক স্থাপন করা হয়। ১৫ একর জমির ওপর এ পার্কের অবস্থান। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাছে এ পার্ক হস্তান্তর করা হয়। তখন এটি ‘ঢাকা শিশু পার্ক’ নামে পরিচিত ছিল। প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা যখন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হন, তখন তিনি এ পার্কের নামকরণ করেন ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’। তবে শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র হওয়ার পর ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে পার্কটির নতুন নামকরণ হয় ‘হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্ক’। পরে গত ২০ ফেব্রুয়ারি ডিএসসিসির বোর্ড সভায় পার্কটির নাম ফের ‘শহীদ জিয়া শিশুপার্ক’ করা হয়।

ভোরের আকাশ/নি

শহীদ জিয়া শিশু পার্ক

শেয়ার করুন: