বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরণের পতন, উদ্বেগে উদ্যোক্তারা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক আমদানির বাজারে ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরণের পতন দেখা গেছে। সামগ্রিকভাবে ইইউর পোশাক আমদানি কমলেও প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য সবচেয়ে বেশি কমেছে, যা দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে মনে করছে এ খাতের উদ্যোক্তারা।
ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য চার মাসে বিশ্ব থেকে ইইউর মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে ২৭ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩১ বিলিয়ন ইউরো। এ সময় আমদানির পরিমাণ (ভলিউম) ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য ৫ দশমিক ২২ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ ইউরোপে দুর্বল ভোক্তা চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যহ্রাস—উভয় কারণেই বাজার সংকুচিত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রপ্তানি ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ইউরো। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রপ্তানি মূল্য কমার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ইউনিট মূল্য ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ হ্রাস পাওয়া। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণও ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ কমে ৪৩৫ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন কেজিতে দাঁড়ায়।
এপ্রিল মাসের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের এপ্রিলের তুলনায় ২০২৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য ১৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ, রপ্তানি পরিমাণ ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে প্রতিযোগী দেশগুলোর চিত্র ছিল ভিন্ন। চীন তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে ছিল। দেশটির রপ্তানি মূল্য মাত্র ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ কমলেও রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে বাজার ধরে রাখতে দেশটি ইউনিট মূল্য ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যনীতি অনুসরণ করেছে।
তুরস্কের রপ্তানি ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ কমলেও তাদের ইউনিট মূল্য সামান্য বেড়েছে। অর্থাৎ দেশটির পতন মূলত রপ্তানির পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে হয়েছে।
ভারতের রপ্তানি ১২ দশমিক ১০ শতাংশ কমেছে, যেখানে মূল্য ও পরিমাণ দুই ক্ষেত্রেই হ্রাস দেখা গেছে।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশটির রপ্তানি মাত্র শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ কমেছে। যদিও রপ্তানির পরিমাণ ৭ দশমিক ১১ শতাংশ কমেছে, কিন্তু ইউনিট মূল্য ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় তারা উচ্চমূল্যের পণ্যের মাধ্যমে রপ্তানি আয় ধরে রাখতে পেরেছে।
কম্বোডিয়ার রপ্তানি ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ কমলেও তাদের ইউনিট মূল্য বেড়েছে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। সেখানে পতনের মূল কারণ ছিল রপ্তানির পরিমাণ ১৬ দশমিক ১২ শতাংশ কমে যাওয়া।
অন্যদিকে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে। দেশটির রপ্তানি মূল্য ১৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমলেও রপ্তানির পরিমাণ ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে ইউনিট মূল্য ২২ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রপ্তানি আয় হ্রাস পেয়েছে।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর কেউই একই সঙ্গে মূল্য ও পরিমাণ উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের মতো বড় ধরনের দুর্বলতার মুখে পড়েনি। চীন মূল্য কমিয়ে রপ্তানির পরিমাণ ধরে রাখতে পেরেছে, আবার ভিয়েতনাম কম পরিমাণ রপ্তানি করেও উচ্চমূল্যের মাধ্যমে আয় ধরে রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশ একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক বিজিএমইএ পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের এই দ্বিমুখী দুর্বলতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সামগ্রিক বাজার সংকুচিত হলেও প্রতিযোগী দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে মূল্য ও বাজার অংশীদারিত্ব ক্ষয় হওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, মূল্য সংযোজন এবং বাজার কৌশলে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
ভোরের আকাশ/এনউব