ভয় ও ক্ষমতার মোহ থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকের উত্থান

রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনই হলো মূল ভিত্তি। কিন্তু কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা যখন জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের পরিবর্তে ভয় ও আশঙ্কার ওপর ভর করে তখন সেই ব্যবস্থার ভেতরেই অপরাধ ও দুর্নীতির জন্ম হয়। সে শাসকদল গোড়া থেকে মুণ্ডু পর্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সবাই আখের গোছাতে ব্যস্ত কারণ কখন জনগণের আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারাতে হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি একটি প্রমাণিত সত্য যে, ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি বা দল যখন কোনো কারণে নিজেদের অবস্থান নিয়ে সন্দিহান বা ভীত হয়ে পড়ে, তখন সমাজে অপরাধ ও দুর্নীতির মাত্রা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতি কেবল সুশাসনকেই ধ্বংস করে না, বরং পুরো রাষ্ট্র কাঠামোকে একটি গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
ভয়ের উৎস এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর: শাসকগোষ্ঠীর ভয়ের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়া, দেশ পরিচালনায় ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা, জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বিরোধী দলগুলোর ষড়যন্ত্র অথবা জনগণের কল্যাণের কথা না ভাবা এবং নিজস্ব অপকর্মের বিচার হওয়ার ভয়। যখন কোনো সরকার বা দল বুঝতে পারে যে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা বা টিকে থাকার তাগিদ তৈরি হয়। এই নিরাপত্তাহীনতা থেকেই জন্ম নেয় বেপরোয়া মনোভাব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিকোলো মেকিয়াভেলি তাঁর বিখ্যাত 'দ্য প্রিন্স' গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ভালোবাসার চেয়ে ভয়ের মাধ্যমে শাসন করা সহজ, তবে সেই ভয় যদি শাসকের নিজের ভেতর জন্ম নেয়, তবে তা স্বৈরাচার ও বিশৃঙ্খলার দিকে পরিচালিত করে।
জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি: ভীত শাসকগোষ্ঠীর প্রথম পদক্ষেপই হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের করায়ত্ব করা। বিচার বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয় না। কারণ, নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান সবসময় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা শুরু হয়, তখন সমাজে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়। আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে অপরাধীরা বুঝতে পারে যে, অপরাধ করলেও তাদের শাস্তি হবে না—যদি তারা ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে থাকে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ অপরাধী থেকে শুরু করে বড় বড় মাফিয়ারা তখন বুক ফুলিয়ে অপরাধ করে বেড়ায়, কারণ তারা জানে ক্ষমতার উৎসকে খুশি রাখতে পারলে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বা লুটপাটের অর্থনীতি: ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকে যে অর্থনৈতিক অপরাধ বা দুর্নীতির জন্ম হয়, তা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। যখন কোনো শাসকদল নিশ্চিত হতে পারে না যে তারা আগামীতে ক্ষমতা হারাবে, তখন তাদের মধ্যে অবৈধভাবে 'দ্রুত অর্থ উপার্জনের' প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। ক্ষমতা চলে গেলে সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতে পারে বা বিচারের মুখোমুখি হতে পারে—এই ভয়ে শাসকেরা এবং তাদের ঘনিষ্ঠ আমলারা নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করে।
প্রকল্পের নামে লুটপাট: সে লক্ষে বড় বড় প্রজেক্ট বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে বাজেটের সিংহভাগ অর্থ আত্মসাৎ করে। টেন্ডারবাজি, কমিশন বাণিজ্য এবং ভুয়া খরচের হিসাব দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য করা হয়।
ব্যাংকিং খাতের ধ্বংসসাধন: ক্ষমতার অপব্যবহার করে নামে-বেনামে ব্যাংক ঋণ নেওয়া হয় এবং তা ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি করা হয়। আর্থিক খাতের এই নৈরাজ্য একটি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায় -- বড় ছয়টি শিল্পগোষ্ঠীর ‘পাচার করা’ অর্থের বা ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ২৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা।
অনুগত অপরাধী চক্র ও পেশী শক্তির তোষণ: জনগণ যখন শাসকের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় পেশী শক্তি বা ক্যাডার বাহিনী। ফলে, দল বা ব্যক্তি নিজের স্বার্থেই অপরাধীদের লালন-পালন করতে বাধ্য হয়। মাদক ব্যবসায়ী, ভূমি দস্যু, চাঁদাবাজ এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়, যাতে তারা প্রয়োজনে বিরোধী মত বা গণ-আন্দোলনকে দমন করতে পারে। এই অপরাধীরা দলের জন্য 'বডিগার্ড' বা ঢাল হিসেবে কাজ করে। বিনিময়ে তারা সমাজকে জিম্মি করে নিজেদের অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তার করে। পুলিশ প্রশাসন তখন সাধারণ মানুষের সুরক্ষার চেয়ে এই অপরাধী চক্র এবং রাজনৈতিক প্রভুদের রক্ষা করতেই বেশি ব্যস্ত থাকে, যা অপরাধের গ্রাফকে দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী করে।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধ: অপরাধ ও দুর্নীতি যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন তা লুকানোর জন্য শাসকদল চরম দমনমূলক নীতি গ্রহণ করে। ভয় পাওয়া সরকার সবসময় স্বাধীন মতপ্রকাশকে শত্রুর চোখে দেখে। ফলস্বরূপ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বন্ধ করতে কালো আইন তৈরি করা হয়, গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয় এবং নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধ করা হয়। যখন গণমাধ্যম বা কোনো ব্যক্তি দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে ভয় পায়, তখন দুর্নীতিবাজরা আরও বেশি অন্ধ ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সমালোচনা বা নজরদারির কেউ না থাকায় অপরাধীরা এক ধরনের 'পবিত্রতা' বা দায়মুক্তির স্বাদ পায়, যা অপরাধের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়: একটি সমাজ বা দেশে যখন সততা ও পরিশ্রমের চেয়ে দুর্নীতি ও অপরাধের মাধ্যমে রাতারাতি ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো যায় অথবা সম্পদের পাহাড় গড়া যায়, তখন সামগ্রিক সামাজিক মূল্যবোধ ভেঙে পড়ে। যুবসমাজ কর্মজীবন গড়ার চেয়ে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ যখন দেখে যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই নিয়ম ভাঙা হচ্ছে, তখন আইনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ থাকে না। এই সামাজিক হতাশা চুরি, ছিনতাই, খুন ও পারিবারিক সহিংসতার মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি স্তরের অপরাধকেও উস্কে দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, ক্ষমতা হারানোর ভয় হলো একটি রাজনৈতিক ক্যানসারের মতো। এই ভয় শাসককে যেমন অন্ধ করে দেয়, তেমনি পুরো রাষ্ট্রকে দুর্নীতির চাদরে ঢেকে ফেলে। যখন কোনো দল নিজের পতনকে ভয় পায়, তখন তারা দেশ ও জনগণের কথা না ভেবে কেবল নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখা কিংবা দায় এড়ানোর পথ খোঁজে। আর এই প্রক্রিয়ার অনিবার্য পরিণতি হলো চরম দুর্নীতি, চরম অপরাধ এবং একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র ব্যবস্থা। একটি উন্নত, শান্তিময় ও অপরাধমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের জন্য তাই ক্ষমতার মোহ ও ভয় থেকে মুক্ত, গণতান্ত্রিক এবং সত্যিকারের জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক।
ভোরের আকাশ/ইউএম