বিশ্বব্যাপী দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কদের মৃত্যু যদিও স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়, তবুও থেকে যায় নানাহ প্রশ্ন। অনেক সময় এই ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ আসলে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, মানসিক চাপ, রাজনৈতিকভাবে একঘরে করে রাখা এবং ধারাবাহিক অপমানের চূড়ান্ত পরিণতি। ইতিহাস বলে--সব মৃত্যু গুলির শব্দে হয় না; কিছু মৃত্যু ঘটে নীরব নিপীড়নের ভারে। রাষ্ট্রনায়ক মানেই একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি রাজনৈতিক অবস্থান, একটি আদর্শ এবং অনেক ক্ষেত্রে জনগণের আশা-ভরসার প্রতীক। যখন কোনো রাষ্ট্রনায়ক রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করেন, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলেন, দেশপ্রেমের কথা বলেন, বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন এবং জনতার কথা বলেন; তখনই তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রযন্ত্রের বা বিদেশী প্রভুদের মূল লক্ষ্যবস্তুতে। এই অস্বস্তি দূর করতে রাষ্ট্র সবসময় সরাসরি সহিংস পথ বেছে নেয় না; অনেক সময় বেছে নেয় ধীর, পরিকল্পিত কূটকৌশল এবং ‘আইনসম্মত’ নিপীড়নের পথ।স্বাভাবিক মৃত্যুর আড়ালে অস্বাভাবিক বাস্তবতাএকজন রাষ্ট্রনায়ক দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক চাপ, আইনি হয়রানি, সম্মানহানি এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করলে তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়বেই। অনিদ্রা, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও ভয় -- এসব মিলিয়ে শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত অসুস্থতায় মৃত্যু হলে রাষ্ট্র তা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলে দায় সারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো -- এই মৃত্যু কি সত্যিই স্বাভাবিক, নাকি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ফল? যখন একজন রাষ্ট্রনায়ককে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে বাধ্য করা হয়, গণমাধ্যমে চরিত্রহননের শিকার করা হয়, নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয় কিংবা রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে করে রাখা হয়-- তখন সেই ব্যক্তির মৃত্যু কেবল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না।রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নীরব রূপরাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সবসময় দৃশ্যমান হয় না। অনেক সময় এটি ঘটে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, আইনের অপব্যবহারে, কিংবা রাষ্ট্রীয় নীরবতায়। নিরাপত্তা না দেওয়া, চিকিৎসার সুযোগ সীমিত করা, বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি না দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি -- এসবই নিপীড়নের নীরব কিন্তু কার্যকর অস্ত্র। এই নিপীড়ন রাষ্ট্রকে আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ রাখে। কারণ কোথাও রক্ত নেই, কোথাও গুলির শব্দ নেই। অথচ ফলাফল একই-- একজন রাষ্ট্রনায়ক ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যান।বিচারহীনতা ও নৈতিক দায়রাষ্ট্র সাধারণত স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোনো তদন্তের প্রয়োজন মনে করে না। কিন্তু যখন সেই মৃত্যুর পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাস থাকে, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই দায় স্বীকারের প্রবণতা প্রায় অনুপস্থিত। রাষ্ট্র যদি নিজেই প্রশ্ন তোলে না-- এই মৃত্যু কি এড়ানো যেত? আমরা কি দায়িত্বশীল ছিলাম? তবে সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নৈতিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগোয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুধু হত্যার ক্ষেত্রেই নয়, নিপীড়নের ফলে হওয়া তথাকথিত স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।গণতন্ত্র ও মানবিক রাষ্ট্রের পরীক্ষাক্ষণএকটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী রাষ্ট্রনায়কের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তাঁর মৃত্যু যদি স্বাভাবিকও হয়, তবুও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে-- তিনি নিপীড়নের শিকার হননি, তাঁর জীবন রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে সংকুচিত হয়নি। রাষ্ট্র যদি এই ন্যূনতম মানবিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে সেই রাষ্ট্র কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিণত হয়-- যেখানে ক্ষমতা আছে, কিন্তু নৈতিকতা নেই।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া এমন এক নাম, যার জীবন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, রাজনৈতিক সংগ্রাম, ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ এবং দীর্ঘ নিপীড়নের এক জটিল সমন্বয়। তিনি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের সঙ্গে যুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র। তাঁর জেল জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম তাই কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়-- এটি একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার চরিত্র ও বিরোধী রাজনীতির প্রতি আচরণের প্রতিচ্ছবি।খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আবির্ভাব কোনো পরিকল্পিত নয়; যা ছিলো স্রষ্টার মহাপরিকল্পনার অংশ। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তিনি হঠাৎ করেই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন-- যে ইতিহাস সবার জানা। একজন গৃহিণী থেকে জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে উঠে আসা ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বড় সংগ্রাম। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রামের মূল কেন্দ্র ছিল স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি কারাবরণ করেন, রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হন এবং একাধিকবার গৃহবন্দী অবস্থায় থাকেন। এই সময় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে ওঠে একজন আপসহীন বিরোধী নেত্রী হিসেবে।১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার পতনের পর তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই অর্জনের পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, বারবার গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিজ্ঞতা। তবে ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর ওপর রাষ্ট্রীয় চাপ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয় -- যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিলো।সভা-সমাবেশে বাধা, বাসভবনের সামনে পুলিশি অবস্থান এবং দলীয় কর্মসূচিতে কঠোর দমন-পীড়ন তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে ক্রমশ সংকুচিত করে তোলে। এক সময় তিনি ঘর ছাড়া হন ও আদরের ছোট সন্তানকে হারান। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা ঘোষণার মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন রাজনৈতিক বন্দী হিসেবেই তাঁকে কারাজীবন কাটাতে হয়। কারাগারে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। চিকিৎসা নিয়ে জটিলতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না পাওয়া এবং কারাবন্দী অবস্থায় মানসিক চাপ-- সব মিলিয়ে তাঁর জেল জীবন হয়ে ওঠে এক মানবিক সংকটের প্রতীক।যা ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি না পাওয়া, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকা এবং চলমান মামলাগুলো তাঁর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতাই নির্দেশ করে। খালেদা জিয়ার জেল জীবন কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির বাস্তবতার একটি প্রতীক। তাঁর গ্রেপ্তার, কারাবাস ও সীমাবদ্ধ মুক্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে--ক্ষমতার বাইরে থাকা নেতাদের জন্য রাষ্ট্র কতটা কঠোর হতে পারে। সমর্থকদের কাছে তিনি আপসহীন প্রতিরোধের প্রতীক; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর জেল জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।খালেদা জিয়ার সংগ্রাম ও জেল জীবন বাংলাদেশের রাজনীতির আয়নায় প্রতিফলিত একটি দীর্ঘ ও জটিল গল্প। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না; শুধু তার রূপ বদলায়। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম মুখ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারক হয়েও খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের হাতে বন্দী হয়েছেন একজন সাধারণ কয়েদির মতো-- এই বাস্তবতা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নয়। শর্তাধীন মুক্তির পর খালেদা জিয়া কার্যত গৃহবন্দী অবস্থায় থাকেন। রাজনীতি করতে পারেন না, বিদেশে চিকিৎসার স্বাধীনতা পান না, প্রতিটি সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র এখানে আইন প্রয়োগকারী নয়, বরং নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।যে রাষ্ট্র বিরোধী নেতাকে মানবিক আচরণ দিতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের গণতান্ত্রিক বৈধতাকেই দুর্বল করে। ইতিহাস একদিন নির্ধারণ করবে-- এটি আইনের শাসনের উদাহরণ ছিল, না রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দলিল। তবে একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না-- একজন প্রবীণ, অসুস্থ বিরোধী নেত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় দমন দিয়ে নয়, মানবিকতা দিয়ে। সেই পরীক্ষায় আমরা কতটা উত্তীর্ণ হয়েছি-- সেই রায় ইতিহাসই দেবে।আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক বাস্তবতাএটি কেবল বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়। বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালেই দেখা যায়, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ফলে জনপ্রিয় বা সংস্কারপন্থী নেতাদের জীবন ঝরে গেছে। ক্ষমতাবান রাষ্ট্রযন্ত্র সব জায়গাতেই একই কৌশল ব্যবহার করে-- তদন্তকে প্রভাবিত করা, তথ্য গোপন রাখা এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাকে বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেওয়া। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুবার এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অজুহাতে কার্যকর পদক্ষেপ খুব কমই নেওয়া হয়। ফলে রাষ্ট্রগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্টভোরের আকাশ/এসএইচ
১ সপ্তাহ আগে
ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় দেখা যায়, ক্ষমতা কখনো প্রশ্নকে ভয় পায়, সত্যকে সন্দেহ করে এবং জনপ্রিয়তাকে শত্রু মনে করে। তখনই জন্ম নেয় নির্বাসন রাষ্ট্রীয় দমননীতির এক নীরব অথচ নির্মম অস্ত্র। নির্বাসন মানে কেবল দেশছাড়া হওয়া নয়; এটি ভাষা, স্মৃতি, মাটি ও মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক গভীর যন্ত্রণা। অথচ ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো এই নির্বাসিত ব্যক্তিরাই বহু সময় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন।নির্বাসন: রাষ্ট্রের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশশক্তিশালী রাষ্ট্র কখনো মতভিন্নতায় ভীত হয় না। কিন্তু দুর্বল ও অনিশ্চিত শাসনব্যবস্থা ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে না। তাই নির্বাসন আসলে কোনো ব্যক্তির পরাজয় নয়; বরং তা রাষ্ট্রক্ষমতার নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রকাশ। যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে দেশছাড়া করতে বাধ্য করে, সে রাষ্ট্র নিজের গণতান্ত্রিক ভিত দুর্বল করে ফেলে।আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি: নির্বাসনের গর্ভে জন্ম নেওয়া সফল বিপ্লবইরানের আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির দীর্ঘ নির্বাসন ছিল এক ধরনের নীরব প্রস্তুতি। তুরস্ক, ইরাক ও ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন তাকে দমাতে পারেনি; বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে তার চিন্তাকে আরও বিস্তৃত করেছে। ১৯৭৯ সালে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একজন ধর্মীয় নেতার দেশে ফেরা নয়, তা ছিল একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার পতনের ঘোষণা। খোমেনির প্রত্যাবর্তন দেখিয়েছে, নির্বাসন অনেক সময় বিপ্লবের পাঠশালা হয়ে ওঠে।নেলসন ম্যান্ডেলা: বন্দিত্ব ও প্রত্যাবর্তনের মহিমাযদিও ম্যান্ডেলা নির্বাসিত ছিলেন না, তবে দীর্ঘ বন্দিত্ব শেষে তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নির্বাসনোত্তর প্রত্যাবর্তনের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সমর্থন, নৈতিক উচ্চতা ও অহিংস রাজনীতির শক্তি নিয়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটান। তার প্রত্যাবর্তন প্রতিহিংসার নয়, বরং ক্ষমা ও পুনর্মিলনের রাজনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।বেনজির ভুট্টো: তার প্রত্যাবর্তন ঝুঁকি ও গণতন্ত্রের মূল্যবেনজির ভুট্টোর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। নির্বাসনের নিরাপদ জীবন ছেড়ে তিনি জানতেন, দেশে ফেরা মানেই মৃত্যু পর্যন্ত ঝুঁকি নেওয়া। তবু তিনি ফিরেছিলেন, কারণ দেশপ্রেম ও গণতন্ত্র কেবল স্লোগানে নয়, আত্মত্যাগে বেঁচে থাকে। তার প্রত্যাবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নির্বাসিত মানুষরা যখন ফেরেন, তারা ক্ষমতার লোভে নয়; ইতিহাসের দায় কাঁধে নিয়েই ফেরেন।চার্লস দ্য গল: নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রনায়কফ্রান্সের চার্লস দ্য গল নির্বাসনে থেকেও ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলেন। নাৎসি অধিকৃত ফ্রান্সের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি যে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিলেন, তা যুদ্ধশেষে তাকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করে। তার প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে, ভৌগোলিক দূরত্ব কখনো নেতৃত্বের গভীরতাকে কমাতে পারে না।বুদ্ধিবৃত্তিক নির্বাসন ও চিন্তার প্রত্যাবর্তনরাজনীতিকদের পাশাপাশি নির্বাসিত হয়েছেন লেখক, কবি ও চিন্তাবিদরাও। আলেকজান্দার সোলঝেনিৎসিন কিংবা ভ্যাক্লাভ হাভেলের মতো মানুষরা নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে কেবল সরকার বদলাননি, বদলে দিয়েছেন রাষ্ট্রের নৈতিক ভাষা। তাদের প্রত্যাবর্তন দেখিয়েছে- চিন্তার শক্তি কখনো সীমান্ত মানে না।সমসাময়িক বিশ্ব: নির্বাসন এখনো শেষ হয়নিআজও বিশ্বের নানা প্রান্তে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিরোধীরা নির্বাসনে জীবনযাপন করছেন। তাদের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের জন্য এক কঠিন প্রশ্ন রাষ্ট্র কি তার অতীতের ভুল স্বীকার করতে প্রস্তুত? নির্বাসিত মানুষের ফেরা মানেই কেবল একজন মানুষের আগমন নয়; তা রাষ্ট্রের আত্মসমালোচনার মুহূর্ত।তারেক রহমান: নির্বাসন ও পরিণত থেকে প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ত্যাগের অধ্যায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক ধারার সূচনা, তা পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়া এবং তার পরবর্তীতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিস্তৃত হয়। কিন্তু এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যেমন জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছে, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের নির্যাতন, হয়রানি ও প্রতিহিংসারও শিকার হয়েছে এ পরিবার। জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা ও তারেক রহমান এবং পুরো জিয়া পরিবারকে নিঃশেষ করে দেওয়ার এক গভীর ষড়যন্ত্র। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনীতিতে গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের ওপর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেন সিপাহী-জনতা। ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন জিয়া। রাষ্ট্র মেরামতে এক বৈপ্লবিক সাফল্য অর্জন করেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য জিয়াকে হত্যার পর থেকেই এ পরিবারটি কার্যত বারবার রাজনৈতিক টার্গেটে পরিণত হয়। বিশেষ করে দেশী-বিদেশী ও সামরিক এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারগুলোর সময়ে পরিবারটি নানাভাবে চাপে পড়ে।তিনবারের সফল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে একাধিক মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়া, বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নিতে বাধা এসব বিষয় দেশ-বিদেশে মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে আলোচিত হয়। তারই নির্মম ধারাবাহিকতায় তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমান, বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান এবং দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতীক, তার বিরুদ্ধে ২০০৭-২০০৮ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় একের পর এক মামলা-হামলা, নির্যাতন ও নিপীড়ন শুরু হয়।বর্তমান বাংলাদেশের যুব-নারী-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল পেশার মানুষের প্রাণপুরুষ তারেক রহমান অল্প বয়সে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। ১৯৮৮ সালে তিনি বিএনপি’র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। খুব সল্প সময়ে অর্থাৎ ২০০০ সালের শুরুর দিকে তিনি বিএনপি’র তৃনমূল নেতাদের প্রাণ-পুরুষ হয়ে ওঠেন। এতো অল্প বয়সে এতো বেশি জনপ্রিয়তা এক বিরল ঘটনা। আর এ জনপ্রিয়তা ও দেশপ্রেমই তার জন্য কাল হয়ে ওঠে। তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হন। দেশি-বিদেশী নানা সমীকরণে তিনি হামলা-মামলা, অত্যাচার, নির্যাতনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। তাকে ও তার গোটা পরিবারকে টার্গেট করে নিঃশেষ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে দীর্ঘদিন ধরে। দেশের তিনবারের সফল সাবেক প্রধানমন্ত্রী আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে ও বাড়ি ছাড়া করে ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষান্ত হয়নি। পুরো জিয়া পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। খালেদা জিয়া আজ জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তারেক রহমানকে স্বপরিবারে ছাড়তে হয় দেশ। ছোট ভাই আরাফাত রহমানকে অল্প বয়সে দিতে হয় জীবন। মোট কথা জিয়া পরিবারকে এ দেশের জন্য এবং দেশ-প্রেমের জন্য সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি অবস্থায় শারীরিক নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করা এবং অনুপস্থিত অবস্থায় বিচার ও সাজা প্রদান; এই পরিস্থিতি তাকে কার্যত রাজনৈতিক নির্বাসনে ঠেলে দেয়। আর এই নির্বাসন তারেক রহমানকে গড়েতোলে এক পরিপূর্ণ লৌহমানবে এবং যোগ্য দেশপ্রেমিক হিসাবে। দেশের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের মতে, এটি ছিল একটি “আইনগত নিপীড়ন”। আজ এক পরিণত রাজনীতিক হিসাবে তিনি দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। জোরপূর্বক নির্বাসন তাকে অলঙ্কিত করেছে। আজ সেই মহান নেতার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। বিশ্ব মিডিয়ায় তাকে নিয়ে শিরোনাম করছে ‘নিয়তির সন্তান’ (DESTINY'S CHILD)।প্রত্যাবর্তন: প্রতিশোধ নয়, দেশ পুনর্গঠনের অঙ্গিকারইতিহাস বলে, সবচেয়ে মহৎ প্রত্যাবর্তনগুলো প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলেনি। নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতারা শিখিয়েছেন ক্ষমা দুর্বলতা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ রূপ। নির্বাসিত মানুষ যখন ফিরে আসে, তখন রাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে সংঘাতের মুখোমুখি কিংবা পুনর্মিলনের মাধ্যমে দেশ গঠন। নির্বাসন ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়, কিন্তু নির্বাসন থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন মানব সভ্যতার সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল মুহূর্তগুলোর একটি। কারণ এই প্রত্যাবর্তন রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে তুমি কি এখনো ভীত, নাকি পরিণত? যে রাষ্ট্র তার নির্বাসিত সন্তানদের কথা শোনার সাহস অর্জন করে, সেই রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের প্রথম পাতা থেকে শেষ অব্দি সম্মানের সাথে বিচরণ করে।লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্টভোরের আকাশ/এসএইচ
২ সপ্তাহ আগে
গল্পটা শুরু করা যায় জাপান ও বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি নিয়ে। জাপান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কৃষিপণ্য আমদানিকারক দেশ। জাপানের মোট ভূমির মাত্র ২০ শতাংশ কৃষিকাজের উপযোগী। এ স্বল্প পরিমাণ জমিকে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে ফসল উৎপাদনের সর্বোচ্চ উপযোগিতা অর্জন করে। জাপানের সাথে বাংলাদেশের অনেক বিষয়ে মিল আছে। জাপানিরা ভাত-মাছ খায়। জাপানে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪ ভাগ ও আমাদের ৪০ ভাগ কৃষি কাজের সাথে জড়িত।জাপানের জিডিপিতে কৃষির অবদান শতকরা ২ ভাগ এবং আমাদের অবদান শতকরা ১৩ দশমিক ৬৫ ভাগ। বাংলাদেশে মোট জমির ৫৮ শতাংশ এবং জাপানে মোট জমির ১৩ শতাংশ চাষযোগ্য। দেশটির আবহাওয়া কৃষি উপযোগী। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয় এবং মাটিও উর্বর। অনুকূল আবহাওয়া, জমির উৎপাদক শক্তি এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বল্প জমি থেকে অধিক উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে জাপান। কৃষিতে বাংলাদেশের ও সফলতাও কম নয়; স্বাধীনতার ৪৯ বছরে বাংলাদেশে কৃষিতে ঘটেছে এক নীরব বিপ্লব। বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশ্বে ফসলের জাত উদ্ভাবনে প্রথম, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, চাল উৎপাদনে চতুর্থ, আম উৎপাদনে সপ্তম, আলু উৎপাদনে অষ্টম এবং খাদ্যশস্য উৎপাদনে দশম। এ সফলতার পেছনে রয়েছে বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ।বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি ও হাওরবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে সেই জাপান থেকে ছুটে এসেছেন একজন কৃষি উন্নয়ন গবেষক। যিনি ৩৮ বছর ধরে কাজ করছেন বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে। যার কথা বলছি তিনি জাপানি উন্নয়ন গবেষক টেতসুও সুতসুই। তখন সবে ২৩ বছরের যুবক টেটসুও সুটসুই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করেছেন। কর্মজীবনে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জীবনের আনন্দ অনুসন্ধানে এবং জীবিকা প্রয়োজনকে তিনি একসঁতোয় গেঁথে নিলেন মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হওয়ার প্রত্যয়ে। মনস্থ করলেন বেছে নিবেন জাপানের বাইরের কোনো দেশ। যে দেশের মানুষ এখনো মাঝে মাঝে অনাহারে থাকে কিংবা সুচিকিৎসার অভাবে কাতরাতে থাকে।অনেক খোঁজ খবর নিয়ে সুতিই চলে আসলেন বাংলাদেশে। সময়টা ১৯৮৫ সাল। সুযোগ এসে যায় জাইকা’র ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করার। ১৯৮৬ সালে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণে জুনিয়র এক্সপার্ট হিসেবে জাইকা’র একটি প্রকল্পের মাধ্যমে কুমিল্লা ‘বার্ড’-এ। এক নাগারে চার বছর দিন রাত শুধু কাজ আর কাজ করলেন। তাঁর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় কুমিল্লার আশ-পাশ জেলা ও উপজেলায় প্রচুর মৎস্যচাষ শুরু হলো। কমিউনিটি পর্যায়ে এই মৎস্যচাষ তখন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠে।প্রজেক্টের মেয়াদ শেষে ১৯৮৯ সালে তিনি ফিরে যান জাপানে। জাপানে ফিরে গেলেও মন পড়ে রয় বাংলাদেশে। কারণ বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের ভালবাসা তাঁর হৃদয় জয় করেছে। এখানকার মানুষের দু:খ-কষ্ট ও জীবন সংগ্রাম তাঁকে খুব আকৃষ্ট করে। তিনি আবার বাংলাদেশে আসার পথ খুঁজতে থাকেন। ঠিক চার বছর পর ১৯৯৪ সালে সুতসুই আবার পেয়ে যান আর একটি পথ। ‘শাপলা নীড়’ নামে একটি জাপানি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার ফান্ড রাইজিং কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। দুই বছর এই পদে তাঁর কাজের ফলে বাংলাদেশে শাপলা নীড় এর কার্যক্রম বেশ সম্প্রসারণ হয়।এরপর ১৯৯৬ সালে শাপলা নীড় এর টোকিও সচিবালয়ের ফেয়ার ট্রেড ডিভিশনের প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৮ সালে শাপলা নীড়ের আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে আবার ফিরে আসে বাংলাদেশে। তিনি যোগদান করেই শুরু করেন শাপলা নীড়কে আরো বেশী সংখ্যক মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজে লাগানোর। তিনি পর্যায়ক্রমে শাপলা নীড় এর কার্যালয় ও কার্যক্রম নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ইত্যাদি জেলায় সম্প্রসারণ করতে থাকেন। তাঁর মূলনীতি হলো মানুষকে আত্ম-নির্ভরশীলতার দিকে নিয়ে যাওয়া। সব সময় সাহায্যের দিকে না তাকিয়ে নিজস্ব সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা।অথচ তখন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সাহায্য ব্যাপকভাবে আসছে। তিনি তখন ঠিক উল্টো পথে। তিনি বিশ্বাস করতেন এই প্রচুর সাহায্য প্রাপ্তি বাংলাদেশি মানুষকে পরনির্ভরশীল করে তুলবে। তাঁর আদর্শ ও বিশ্বাস নিয়ে তিনি দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলতে চলতে ২০০২ সালে একই প্রতিষ্ঠানের উপ-মহাসচিব হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে তিনি আবার জাপান ফিরে যান। শারীরিকভাবে তিনি জাপানে গেলেও মন পড়ে থাকতো বাংলাদেশে।২০০৮ সালে সুতসুই উক্ত সংস্থার মহাসচিব হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন। একই বছর শাপলা নীড় থেকে অবসরপ্রাপ্ত হয়ে তিনি আবার গঠন করেন ‘শেয়ার দ্যা প্লানেট অ্যাসোসিয়েশন’ নামে আরো একটি উন্নয়ন সহায়তা সংস্থা। হবিগঞ্জের হাওর এলাকায় জাইকার সহায়তায় তার প্রতিষ্ঠান শেয়ার দ্য প্ল্যানেট অ্যাসোসিয়েশন স্থানীয় এনজিও এসেড এর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে একটি প্রকল্প। এবার সুতসুই এগিয়ে এসেছেন হাওর এলাকায় গবেষণার কাজে। তার সহায়তায় হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার বাঘজোর গ্রামে নির্মাণ হচ্চে ‘সুতসুই সান হাওর রিসার্চ এন্ড রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’।জাপানি ভাষায় প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘মিরানি নো দিইচি’। সুতসুই এর নামেই হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান। এ থেকে প্রমাণ হয় তিনি বাংলাদেশকে এবং হাওরাঞ্চলকে কতটা ভালবাসেন। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন- ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে হাওর অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট আয়তনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হাওর অঞ্চল। অঞ্চলটি সাতটি জেলার ৫৩ উপজেলাকে যুক্ত করেছে। হাওর কেবল প্রাকৃতিকভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এলাকা নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাণিসম্পদ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এ ছাড়া দেশের মোট গবাদি পশুর প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ অঞ্চলে পালন করা হয়। এখানকার প্রাকৃতিক চারণভূমি (বাথান) ও পানির সহজলভ্যতা গবাদি পশুর প্রজনন বৃদ্ধিতে সহায়ক। গবাদি পশু দুধ, মাংস, চামড়া ও সার উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দেশের মোট হাঁসের প্রায় ২২ শতাংশ এ অঞ্চল সরবরাহ করে।কৃষিক্ষেত্রেও হাওরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশের মোট বোরো ধানের ৬০ শতাংশ হাওর থেকে আসে। পাশাপাশি নদী, খাল, বিল এবং জলাশয় মৎস্য উৎপাদনের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। কিন্তু কৃষিজমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োগের কারণে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য প্রাণঘাতী পরিবেশ তৈরি করে। ফলে শৈবাল বৃদ্ধির কারণে পানির নিচে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়, যা মাছসহ জলজ জীবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। হাওরের মাটি অত্যন্ত উর্বর, যা ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমরা দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী করতে পারি। হাওর অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ কৃষি, মৎস্য ও গবাদি পশু লালন-পালনে সরাসরি জড়িত। তাদের মাধ্যমে আমরা খাদ্য নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে পারি। খাল, বিল ও নদীর সুরক্ষা করে মাছ উৎপাদন আরও বাড়ানো যেতে পারে। হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে ঘাস ও চারণভূমি, যা গবাদি পশু পালনে খরচ কমিয়ে আনে।যাইহোক বাংলাদেশ প্রেমি জাপানি গবেষক সুৎসুই আরো বৃহৎ পরিসর নিয়ে বাংলাদেশের দু’টি অঞ্চলকে টার্গেট করে উন্নয়ন সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেন। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলকে নিয়ে জলাবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির প্রসার ও চাষাবাদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে তিনি ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁর সকল কার্যক্রম স্থানীয় পর্যায়ের এনজিওদের সম্পৃক্ত করে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন চলতে থাকে। তিনি বাংলাদেশে ‘সিসিএএএন’ নামে একটি নেটওয়ার্কও তৈরি করেন।এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি), হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, টয়োটা ফাউন্ডেশন, জাপানি কৃষি ও জলবায়ু উন্নয়ন বিষয়ক কয়েকটি সরকারি সংস্থা এবং বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কৃষি নিয়ে কাজ করে এমন ১৪টি এনজিও-কে এক সুতার গেঁথে উন্নয়ন কৌশল, তথ্য ও সম্পদ ভাগাভাগির মাধ্যমে সীমিত সম্পদকে অধিকতর মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।বর্তমানে যেখানে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে নিপতিত উন্নত দেশসমূহ তাদের উন্নয়ন সহায়তা আমাদের দেশ থেকে কমিয়ে দিচ্ছে সেখানে নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষটি বিভিন্ন সহায়তার উৎস তালাশ করে সেখান থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে বাংলাদেশে অন্ত:ত ১৪টি উন্নয়ন উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছেন। এই উদ্যোগগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সহায়তার প্রায় ৮০% সম্পদ বিশেষ কৌশলসহ সরাসরি সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছে যায়। যার ব্যবহারের ফলে ৪-৫ বছরের মধ্যে সুবিধাভোগীরা আত্মনির্ভরশীলতার পথে অগ্রসর হয়। উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি এই মানুষটি খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে জাপানের কায়েটসু ইউনিভার্সিটি, এশিয়া ইউনিভার্সিটি, টোকিও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও উটসুনোমিয়া ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন।বহির্বিশ্বে মানবতার কল্যাণে কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সুতসুই জাপানের আশাহি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার এ্যাওয়ার্ড, ওকিনাওয়া পিস প্রাইজ, হিরোসিমা পিস প্রাইজ, এ্যাক্সেলেন্ট এনপিও এ্যাওয়ার্ড ও জাপান পার্টনারশিপ প্রাইজ উইনার এ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। অথচ বহির্বিশ্বের মধ্যে কাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই তার বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিবেদিত। প্রশ্ন হচ্ছে এই নিবেদিত প্রাণ পরদেশি মানুষটিকে বাংলাদেশ কীভাবে মূল্যায়ন করবে- সেই ভাবনা কি সরকারের কৃষি বিভাগের আছে?সবশেষে বলবো, জাপানে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অল্প সময়ে কৃষক একাই অনেক বেশি পরিমাণ জমি চাষাবাদ করতে পারেন। জমি চাষ, চারা তৈরি, চারা রোপণ, ফসল কাটা, মাড়াই এবং বাজারজাতকরণের উপযোগী করা- সব কিছুই কৃষক যন্ত্রের সাহায্যে করতে পারেন। এটাই হলো আধুনিক জাপানি কৃষির বৈশিষ্ট্য। জাপানে হেক্টর প্রতি চালের উৎপাদনও আমাদের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। আমাদের দেশে হেক্টর প্রতি চালের গড় উৎপাদন ২ দশমিক ২০ টন, জাপানে হেক্টর প্রতি চালের উৎপাদন ৬ দশমিক ৫৪ টন।এছাড়া জাপানে ভার্টিক্যাল ফার্মিং পদ্ধতিও ইদানীং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে গ্রিনহাউজে একের পর এক তাকে ফসল ফলানো হয়। কিয়াটো ও টোকিও অঞ্চলে এ ধরনের চাষ পদ্ধতির দেখা যায় বেশি। কৃষি ও কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দিয়ে দেশটির কৃষিকে করে তোলা হয়েছে আধুনিক থেকে আধুনিকতর, বাণিজ্যিক ও স্মার্ট। অন্যান্য শিল্পের ব্যাপক অগ্রগতির কারণে জাপানের অর্থনীতিতে কৃষি এখন অত্যন্ত গৌণ খাত। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের জন্য অত্যন্ত শিক্ষণীয় একটি জায়গা হতে পারে জাপানের সম্ভাবনাময় আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি খাত। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বাংলাদেশ প্রেমী কৃষি গবেষক সুতসুই-এর অনবদ্য ভূমিকার রাষ্ট্রীয় মূল্যায়নের দাবি রাখে।লেখক : সাংবাদিক, অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক।ভোরের আকাশ/এসএইচ
১ মাস আগে
হাইব্রিড বা নব্যদের বিষয়ে কিছু লেখার আগে একটি সংক্ষিপ্ত পারিবারিক উদাহরণ না বললেই নয়। ধরুন, কোনো শিশুর মা মারা গেলে বা বাবার সঙ্গে তার মায়ের বিচ্ছেদ হলে, বাবা শিশুকে লালন-পালনের জন্য পুনরায় বিয়ে করেন। তখন শিশুটির জীবনে আসে একজন নতুন ‘মা’। শিশুটি তাকে ভালোবাসে, মায়ের মতোই ধরে নেয়, এবং সেই মা-ও শিশুটিকে আপন সন্তানের মতোই লালন-পালন করেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে শিশুটি বড় হলে বুঝে ফেলে, এই ‘মা’ তার জন্মদাত্রী নন। তখন তার হৃদয়ে জন্ম নেয় শূন্যতা। সে খুঁজে ফেরে তার প্রকৃত মাকে। যেখানে থাকুন না কেন, জন্মদাত্রী মা যেন ভালো থাকেন, সেটাই হয় তার প্রার্থনা।রাজনীতির ময়দানেও কিছুটা এমনই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিএনপির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দলের ক্ষেত্রে বর্তমানে ‘হাইব্রিড’ বা ‘নব্য’ নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য দলের প্রকৃত চেতনা ও আত্মত্যাগের ইতিহাসকে ম্লান করে দিচ্ছে। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গঠিত এই দলটি বিগত প্রায় পাঁচ দশকে পাঁচবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এবং দুবার বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন আপসহীন নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে একশ্রেণির নব্য নেতাকর্মীর আগমন ঘটেছে, যাদের অতীতে দলের দুঃসময়ে মাঠে দেখা যায়নি। ২০০৯ সালের পর থেকে ১৬ বছর ধরে বিএনপির নেতাকর্মীরা আওয়ামী শাসনামলে গুম-খুন, মামলা-হামলা, কারাবরণসহ নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন না, বরং নিজেদের গুটিয়ে রেখেছিলেন, তারাই আজ পদ-পদবি পাওয়ার আশায় সক্রিয়। জনপ্রিয় এই দলটির সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই অনেকে আবার দলের নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করছেন, জড়িয়ে পড়ছেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। এসব ঘটনায় বিএনপিকে পড়তে হচ্ছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। অথচ দলের জন্য যাদের ত্যাগ রয়েছে, তারা দলের ক্ষতি হোক এটা কখনোই চাইবে না।গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর, বিএনপিতে এসব হাইব্রিড নেতার দৌরাত্ম্য আরও বেড়েছে। পদ-পদবি নিয়ে সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার-এসব ঘটনায় বিএনপির ত্যাগী ও মূলধারার নেতাকর্মীদের মনে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ। পুরান ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালে সোহাগ হত্যাকাণ্ডে দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা দলটিকে আরও চাপে ফেলেছে।যদিও এ ঘটনায় অভিযুক্তদের আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে, তবুও জনসম্মুখে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। বিএনপিকে লক্ষ্য করে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় উঠে। জামায়াত ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দলের সমালোচনার মূখে পড়তে হয়েছে খোদ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও।আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দলের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা দায়িত্বশীলতার অভাব দেখাচ্ছেন। কেউ কেউ স্ববিরোধী বক্তব্য দিয়ে দলের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য তার উদাহরণ। শোকজ ও বহিষ্কারের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও, তার বক্তব্যের প্রভাব থেকে যায়। এতে দলের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা সহজে মেরামতযোগ্য নয়।ইদানীং দেখা যাচ্ছে, ‘বিএনপি’, ‘জিয়া’, ‘আরাফাত রহমান কোকো’ প্রভৃতি নাম ব্যবহার করে প্রায় শতাধিক ভূইঁফোড় সংগঠন গজিয়েছে, এই ভূঁইফোড় সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের নাম করে অর্থের বিনিময়ে বিতর্কিত লোকদের পদ-পদবি দিচ্ছে, এরাই আবার দলবিরোধী কাজে জড়াচ্ছে। এগুলো দলটির ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।বিএনপিকে এখনই এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। তাই বিএনপি ও তার অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে আমি বলতে চাই, হাইব্রিড-নব্যদের দৈারাত্ব এখনই থামান। নতুবা এরাই হবে বিএনপির গলার কাঁটা। এদেরকে চিহিৃত করা উচিত। দলের নেতৃবৃন্দকে বুঝতে হবে, যারা দুঃসময়ে মাঠে ছিলেন, নির্যাতিত হয়েছেন, তারাই প্রকৃত বিএনপিকর্মী। বিভিন্ন সময়ের দলের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের চিত্র অবলোকন করলে আচ করা যায় হাইব্রিড-নব্যদের মধ্যে স্নাইপার গ্রুপের সদস্যরাও ঘাপটি মেরে রয়েছে। যারা দেশে-বিদেশে বিএনপির সুনাম ক্ষুণ্ন করার চক্রান্তে লিপ্ত। দলটির হাইকমাণ্ডকেও ভাবতে হবে, সুবিধাজনক সময়ে যারা সুবিধা নিতে এসে ‘বিএনপির লোক’ সেজেছেন, তারাই আদতে দলের ক্ষতির কারণ। এসব হাইব্রিড, সুবিধাবাদী, সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিদের দলে ঠাঁই দিলে দলের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। আমি মনে করি, আজ প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত শুদ্ধি অভিযান। হাইব্রিড ও নব্যদের সনাক্ত করার পাশাপাশি দলের নেতৃবৃন্দকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দলের প্রতি দায়বদ্ধ, আদর্শনিষ্ঠ, পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের হাতেই দলের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব তুলে দিতে হবে। তাহলে বিএনপি আবারও ফিরে পেতে পারে তার হারানো গৌরব।লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
৪ মাস আগে