মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করতেই হবে

সভ্যসমাজের জন্য বড় ক্ষত গুম। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার করতে হবে; তাকে গুম করে ফেলা যাবে না। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৬ বছর শাসনকালে গুম নিয়ে বেশ অস্বস্তি ছিল। ওই সময় ৬২৯ ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন বলছে।
যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের গুম কমিশনের কাছে ১ হাজার ৮৩৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। ১ হাজার ৭৭২টি অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪২৭ জন পরে জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছে। এখনো ৩৪৫ জন এখনো নিখোঁজ আছেন। তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কমিশনের ভাষ্য, তদন্তে র্যাব, পুলিশ, ডিবি, সিটিটিসি, এনএসআই ও ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সম্পৃক্ততার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত গুমের ঘটনায় অনেক ভুক্তভোগী রাজনৈতিক পরিচয় বা সন্দেহের ভিত্তিতে আটক হন এবং কমিশন সাক্ষাৎকার নেওয়া ২৫৩ জনের মধ্যে ১০১ জন তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করেন। যাদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৩৭ জন; বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৩১ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২৫ জনসহ আরও একাধিক দলের সমর্থক ছিলেন। কমিশনের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘আর কেউ গুমের শিকার হবে না।’ তার দেড় বছরের শাসনামলে কেউ গুমের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ নেই।
এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করে। স্বাভাবিকভাবে আশা করা হয় এই সরকারের আমলেও কেউ গুমের শিকার হবে না। কারণ বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে গুমের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিল এবং তাদের অনেক নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে চৌধুরী আলম এবং ইলিয়াস আলীর আজও সন্ধান মেলেনি। কিন্তু সরকারের তিন মাসের মাথায় বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখ নামে একজন জেলে গুমের শিকার হয়েছেন। ১০ এপ্রিল রাতে শত শত লোকের সামনে কোস্টগার্ডের লোকজন তাকে তুলে নিয়ে যায়। জয়মনির ঘোল এলাকা থেকে তুলে নেওয়ার আগে তাকে ব্যাপক মারধর করা হয়। তখন মিরাজ শেখ তাকে মারধরের কারণ জানতে চান। যদিও কোস্টগার্ডের সদস্যরা তখন বলেছিলেন ‘পরে জানতে পারবে।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী গত ১০ই এপ্রিল রাতে মোংলার সুন্দরবন সংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকা থেকে কোস্টগার্ডের সদস্যদের মিরাজ শেখকে স্পিড বোটে করে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন। পরদিন তার পরিবার মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ডের কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাদের মিরাজ শেখ ‘একটি অভিযানে আছেন’ এবং বিকেলে ফিরবেন বলে জানানো হয়। কিন্তু তার পরিবার বিকেলে সেখানে আবার গেলে কোস্টগার্ড তাদের জানায়, মিরাজ শেখ সেখানে কখনোই ছিলেন না।
মিরাজ শেখের বোন লিজা ইসলামের ভাষ্য, মাছ ধরার পাশাপাশি মিরাজ শেখ ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালাতেন। গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে তিনি বাগেরহাট-মোংলায় ভাড়ায় সেটি চালাতেন। ১০ই এপ্রিল ঘটনার দিন ভোর চারটায় মাছ ধরতে ঘর থেকে বের হন মিরাজ শেখ। সকাল ১১টার দিকে ঘরে ফিরে খেয়ে ঘুমান তিনি। সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠে গোসল করে ভাত খেয়ে বাড়ির কাছাকাছি একটি চায়ের দোকানে যান মিরাজ। সেসময় তার মোটর সাইকেলটিও সেখানে ছিল। আল আমিনের চায়ের দোকানে যান তার ভাই। ওই চায়ের দোকানের ঠিক উল্টো দিকে নদীর ভেতরে কোস্টগার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশন। ওই স্টেশন থেকে দুইজন কোস্টগার্ড ও আমাদের গ্রামের মাঝি মিজান যে তাদের বোট চালায়, তারা নদীর পাড়ে চায়ের দোকানের সামনে এসে আমার ভাইকে ধরে মারধর শুরু করে। সেসময় আশেপাশে শ’খানেক মানুষ সেখানে জড়ো হয়।
এ সময় মিরাজ জানতে চান তিনি কী করেছেন, অপরাধ কী? তাকে তারা উত্তর দেয় ‘পরে জানতে পারবে’। ছোট নৌকায় তার ভাইসহ চারজন যাওয়া যাবে না বলে আরেকটি নৌকায় যায় কোস্টগার্ডের দুইজন এবং পরে নদীর ভেতরে থাকা হারবাড়িয়া কোস্টগার্ডের পন্টুনে তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পন্টুনের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই কক্ষের থাই গ্লাস কালো কম্বল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। ওই মুহূর্তে আমার ভাবীসহ মা-বাবা সবাই উপস্থিত ছিল, সবাই নিজের চোখে দেখে এবং গ্রামবাসীও ছিল। কম্বল টানানোর পরে আমার ভাইয়ের অনেক চিৎকার শোনা যায়, আমার ভাইকে অনেক মারধর করে। আধা ঘণ্টা পরে সেখানে কোস্ট গার্ড লেখা একটি স্পিডবোট আসে, যেটিতে করে মিরাজ শেখকে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে কোথায় নেওয়া হয় তা জানানো হয়নি পরিবারকে। আট থেকে দশজন সবাই ইউনিফর্ম পরে ছিল। তারা ওই স্টেশনে উঠে ওর সাথে ছবি ও ভিডিও করে। আমার ভাইকে ওরা ধাক্কা দিয়া বোটে ফেলায়। ওকে এতটা মারছিল যে ও হাঁটতে পারছিল না, খোঁড়ায় খোঁড়ায় হাঁটছিল। পরে তার স্ত্রী মুক্তা খাতুন স্থানীয় মেম্বারকে তার স্বামীকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অবহিত করলে তিনি হারবাড়িয়া স্টেশন কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তাকে ফোন করেন। তবে তিনি রিসিভ করেননি বলে দাবি করেন লিজা ইসলাম। পরে মুক্তা খাতুন নিজেই ওই কর্মকর্তাকে ফোন করলে রিসিভ করেন তিনি। ওই কর্মকর্তা বলেন, তোমার স্বামীকে নিয়েছি আমরা সন্দেহভাজন হিসেবে। যদি কোনো অপরাধ পাই তাহলে মামলা দেবো। যদি অপরাধ না পাই তাহলে ছেড়ে দেব দুই-তিনদিন পরে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে যারা গুম হন তাদের বেশিরভাগই রাজনীতি সংশ্লিষ্ট। ফলে সেগুলোর সঙ্গে সরকার এবং দলের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কিন্তু মিরাজ শেখের বিষয়টি পুরোপুরি ভিন্ন। কারণ তিনি একজন জেলে। মাছ ধরার পর বাকি সময় তিনি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন। তিনি রাজনীতি করতেন না। ফলে এই ঘটনায় সরকার বা দলের জড়িত থাকার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু তাহলে একজন নিরীহ জেলে কেন গুমের শিকার হলেন? এর উত্তর হতে পারে এরকম তিনি নদীতে মাছ ধরতেন। কোস্টগার্ডের কাজও নদীতে। হয়তো তিনি এই বাহিনীর বড় কোনো অপকর্মের প্রত্যক্ষদর্শী। হয়তো তারা সাক্ষীকে চিরতরে সরিয়ে দিয়েছে।
সরকারের উচিত হবে মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করা। তাকে উদ্ধারে প্রয়োজনে বিশেষ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। মিরাজকে উদ্ধারে ব্যর্থ হলে গুমের মতো জঘন্য কলঙ্কের দাগ লাগবে সরকারের গায়ে। অন্যদিকে কোস্টগার্ডকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একজন নিরীহ জেলেকে গুম করা নিশ্চয়ই বাহিনীর সিদ্ধান্ত নয়। গুটি কয়েক সদস্য হয়তো ব্যক্তি স্বার্থে তাকে গুম করেছে। এই ঘটনা এই বাহিনীর জন্যও কলঙ্কের। আশাকরি তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। যত দ্রুত সম্ভব অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করবে। দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে বাহিনীর নিজস্ব স্বার্থে। এই ঘটনার বিচার না হলে অন্যরা একই ধরনের অপকর্ম করতে উৎসাহী হতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক।
ভোরের আকাশ/এনএস