শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

নির্বাসন থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, দেশ পুনর্গঠনের অঙ্গিকার

মোহাম্মদ আক্তার হোসেন

প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৪০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: ভোরের আকাশ
ছবি: ভোরের আকাশ

ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় দেখা যায়, ক্ষমতা কখনো প্রশ্নকে ভয় পায়, সত্যকে সন্দেহ করে এবং জনপ্রিয়তাকে শত্রু মনে করে। তখনই জন্ম নেয় নির্বাসন রাষ্ট্রীয় দমননীতির এক নীরব অথচ নির্মম অস্ত্র। নির্বাসন মানে কেবল দেশছাড়া হওয়া নয়; এটি ভাষা, স্মৃতি, মাটি ও মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক গভীর যন্ত্রণা। অথচ ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো এই নির্বাসিত ব্যক্তিরাই বহু সময় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন।

নির্বাসন: রাষ্ট্রের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ
শক্তিশালী রাষ্ট্র কখনো মতভিন্নতায় ভীত হয় না। কিন্তু দুর্বল ও অনিশ্চিত শাসনব্যবস্থা ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে না। তাই নির্বাসন আসলে কোনো ব্যক্তির পরাজয় নয়; বরং তা রাষ্ট্রক্ষমতার নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রকাশ। যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে দেশছাড়া করতে বাধ্য করে, সে রাষ্ট্র নিজের গণতান্ত্রিক ভিত দুর্বল করে ফেলে।

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি: নির্বাসনের গর্ভে জন্ম নেওয়া সফল বিপ্লব
ইরানের আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির দীর্ঘ নির্বাসন ছিল এক ধরনের নীরব প্রস্তুতি। তুরস্ক, ইরাক ও ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন তাকে দমাতে পারেনি; বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে তার চিন্তাকে আরও বিস্তৃত করেছে। ১৯৭৯ সালে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একজন ধর্মীয় নেতার দেশে ফেরা নয়, তা ছিল একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার পতনের ঘোষণা। খোমেনির প্রত্যাবর্তন দেখিয়েছে, নির্বাসন অনেক সময় বিপ্লবের পাঠশালা হয়ে ওঠে।

নেলসন ম্যান্ডেলা: বন্দিত্ব ও প্রত্যাবর্তনের মহিমা
যদিও ম্যান্ডেলা নির্বাসিত ছিলেন না, তবে দীর্ঘ বন্দিত্ব শেষে তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নির্বাসনোত্তর প্রত্যাবর্তনের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সমর্থন, নৈতিক উচ্চতা ও অহিংস রাজনীতির শক্তি নিয়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটান। তার প্রত্যাবর্তন প্রতিহিংসার নয়, বরং ক্ষমা ও পুনর্মিলনের রাজনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

বেনজির ভুট্টো: তার প্রত্যাবর্তন ঝুঁকি ও গণতন্ত্রের মূল্য
বেনজির ভুট্টোর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। নির্বাসনের নিরাপদ জীবন ছেড়ে তিনি জানতেন, দেশে ফেরা মানেই মৃত্যু পর্যন্ত ঝুঁকি নেওয়া। তবু তিনি ফিরেছিলেন, কারণ দেশপ্রেম ও গণতন্ত্র কেবল স্লোগানে নয়, আত্মত্যাগে বেঁচে থাকে। তার প্রত্যাবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নির্বাসিত মানুষরা যখন ফেরেন, তারা ক্ষমতার লোভে নয়; ইতিহাসের দায় কাঁধে নিয়েই ফেরেন।

চার্লস দ্য গল: নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রনায়ক
ফ্রান্সের চার্লস দ্য গল নির্বাসনে থেকেও ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলেন। নাৎসি অধিকৃত ফ্রান্সের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি যে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিলেন, তা যুদ্ধশেষে তাকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করে। তার প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে, ভৌগোলিক দূরত্ব কখনো নেতৃত্বের গভীরতাকে কমাতে পারে না।

বুদ্ধিবৃত্তিক নির্বাসন ও চিন্তার প্রত্যাবর্তন
রাজনীতিকদের পাশাপাশি নির্বাসিত হয়েছেন লেখক, কবি ও চিন্তাবিদরাও। আলেকজান্দার সোলঝেনিৎসিন কিংবা ভ্যাক্লাভ হাভেলের মতো মানুষরা নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে কেবল সরকার বদলাননি, বদলে দিয়েছেন রাষ্ট্রের নৈতিক ভাষা। তাদের প্রত্যাবর্তন দেখিয়েছে- চিন্তার শক্তি কখনো সীমান্ত মানে না।

সমসাময়িক বিশ্ব: নির্বাসন এখনো শেষ হয়নি
আজও বিশ্বের নানা প্রান্তে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিরোধীরা নির্বাসনে জীবনযাপন করছেন। তাদের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের জন্য এক কঠিন প্রশ্ন রাষ্ট্র কি তার অতীতের ভুল স্বীকার করতে প্রস্তুত? নির্বাসিত মানুষের ফেরা মানেই কেবল একজন মানুষের আগমন নয়; তা রাষ্ট্রের আত্মসমালোচনার মুহূর্ত।

তারেক রহমান: নির্বাসন ও পরিণত থেকে প্রত্যাবর্তন 
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ত্যাগের অধ্যায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক ধারার সূচনা, তা পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়া এবং তার পরবর্তীতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিস্তৃত হয়। কিন্তু এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যেমন জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছে, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের নির্যাতন, হয়রানি ও প্রতিহিংসারও শিকার হয়েছে এ পরিবার। জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা ও তারেক রহমান এবং পুরো জিয়া পরিবারকে নিঃশেষ করে দেওয়ার এক গভীর ষড়যন্ত্র। 

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনীতিতে গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের ওপর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেন সিপাহী-জনতা। ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন জিয়া। রাষ্ট্র মেরামতে এক বৈপ্লবিক সাফল্য অর্জন করেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য জিয়াকে হত্যার পর থেকেই এ পরিবারটি কার্যত বারবার রাজনৈতিক টার্গেটে পরিণত হয়। বিশেষ করে দেশী-বিদেশী ও সামরিক এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারগুলোর সময়ে পরিবারটি নানাভাবে চাপে পড়ে।

তিনবারের সফল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে একাধিক মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়া, বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নিতে বাধা এসব বিষয় দেশ-বিদেশে মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে আলোচিত হয়। তারই নির্মম ধারাবাহিকতায় তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমান, বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান এবং দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতীক, তার বিরুদ্ধে ২০০৭-২০০৮ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় একের পর এক মামলা-হামলা, নির্যাতন ও নিপীড়ন শুরু হয়।

বর্তমান বাংলাদেশের যুব-নারী-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল পেশার মানুষের প্রাণপুরুষ তারেক রহমান অল্প বয়সে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। ১৯৮৮ সালে তিনি বিএনপি’র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। খুব সল্প সময়ে অর্থাৎ ২০০০ সালের শুরুর দিকে তিনি বিএনপি’র তৃনমূল নেতাদের প্রাণ-পুরুষ হয়ে ওঠেন। এতো অল্প বয়সে এতো বেশি জনপ্রিয়তা এক বিরল ঘটনা। আর এ জনপ্রিয়তা ও দেশপ্রেমই তার জন্য কাল হয়ে ওঠে। তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হন। দেশি-বিদেশী নানা সমীকরণে তিনি হামলা-মামলা, অত্যাচার, নির্যাতনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। তাকে ও তার গোটা পরিবারকে টার্গেট করে নিঃশেষ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে দীর্ঘদিন ধরে। দেশের তিনবারের সফল সাবেক প্রধানমন্ত্রী আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে ও বাড়ি ছাড়া করে ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষান্ত হয়নি। পুরো জিয়া পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। খালেদা জিয়া আজ জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তারেক রহমানকে স্বপরিবারে ছাড়তে হয় দেশ। ছোট ভাই আরাফাত রহমানকে অল্প বয়সে দিতে হয় জীবন। মোট কথা জিয়া পরিবারকে এ দেশের জন্য এবং দেশ-প্রেমের জন্য সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।

গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি অবস্থায় শারীরিক নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করা এবং অনুপস্থিত অবস্থায় বিচার ও সাজা প্রদান; এই পরিস্থিতি তাকে কার্যত রাজনৈতিক নির্বাসনে ঠেলে দেয়। আর এই নির্বাসন তারেক রহমানকে গড়েতোলে এক পরিপূর্ণ লৌহমানবে এবং যোগ্য দেশপ্রেমিক হিসাবে। দেশের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের মতে, এটি ছিল একটি “আইনগত নিপীড়ন”। আজ এক পরিণত রাজনীতিক হিসাবে তিনি দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। জোরপূর্বক নির্বাসন তাকে অলঙ্কিত করেছে। আজ সেই মহান নেতার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। বিশ্ব মিডিয়ায় তাকে নিয়ে শিরোনাম করছে ‘নিয়তির সন্তান’ (DESTINY'S CHILD)।

প্রত্যাবর্তন: প্রতিশোধ নয়, দেশ পুনর্গঠনের অঙ্গিকার
ইতিহাস বলে, সবচেয়ে মহৎ প্রত্যাবর্তনগুলো প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলেনি। নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতারা শিখিয়েছেন ক্ষমা দুর্বলতা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ রূপ। নির্বাসিত মানুষ যখন ফিরে আসে, তখন রাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে সংঘাতের মুখোমুখি কিংবা পুনর্মিলনের মাধ্যমে দেশ গঠন। নির্বাসন ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়, কিন্তু নির্বাসন থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন মানব সভ্যতার সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল মুহূর্তগুলোর একটি। কারণ এই প্রত্যাবর্তন রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে তুমি কি এখনো ভীত, নাকি পরিণত? যে রাষ্ট্র তার নির্বাসিত সন্তানদের কথা শোনার সাহস অর্জন করে, সেই রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের প্রথম পাতা থেকে শেষ অব্দি সম্মানের সাথে বিচরণ করে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ভোরের আকাশ/এসএইচ

স্বদেশ প্রত্যাবর্তননির্বাসন

শেয়ার করুন: