হাম ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ: প্রস্তুতি, দায়ভার ও করণীয়

বাংলাদেশ বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—হাম রোগের পুনরুত্থান এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা। একদিকে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি ও জনসচেতনতার অভাবে হাম রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে ডেঙ্গু প্রতিবছর নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এই দুটি রোগের প্রকোপ শুধু স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নয়; বরং এটি প্রশাসনিক সক্ষমতা, সামাজিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
তথ্যমতে, মার্চ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে কেবল হামের উপসর্গ নিয়েই ৬০০-এর বেশি শিশু মারা গেছে এবং ৯৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে সরাসরি হাম আক্রান্ত হয়ে। অবশ্য এ বিষয়ে দোষারোপের রাজনীতি কম হয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকার গঠনের পর যেহেতু অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে তাই এর দায় সরকারের ওপর বর্তাবে এটা স্বাভাবিক। সরকার এ বিষয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণের আগেই ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেকেই এর জন্য পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন। দায়িত্ব কার ওপর বর্তাবে, সে বিষয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করার আগেই যে ক্ষতি হওয়ার, তা হয়ে গেছে। প্রায় ৬০০টি প্রাণ ঝরে গেছে; এ দায় বা সমালোচনা থেকে সরকার পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারবে না। ঠিক তেমনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিতে পারলে, পরীক্ষায় ফেল নিশ্চিত। অতীতেও দেশের জনগণকে ডেঙ্গুর জন্য বড় মাশুল গুণতে হয়েছে, ঝরে গেছে হাজার হাজার প্রাণ। ভবিষ্যতেও ডেঙ্গুর প্রকোপে প্রাণহানি ঘটলে এর দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।
অধিক জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। তারপর থেকেই প্রতি বছর বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। মশক নিধন ও ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সরকারের ব্যয় শত শত কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু দৃশ্যমান ফল নেই। উল্টো প্রতি বছরই দীর্ঘ হয় মৃত্যুর মিছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে রেকর্ড এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়, যা ২০২৪ সালে ৫৭৫ এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জনে নেমে আসে।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত নয় বছরে মশক নিধন, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনা বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ৭০০ কোটিরও বেশি টাকা। এমনকি সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে মশক নিধনের জন্য শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। শুধু ২০২৩ সালেই সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকারের ৪০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছিল। ২৭ বছর ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বাজেট ও ব্যয় বাড়লেও এটি নিয়ন্ত্রণে বড় ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই।
অন্য দিকে হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একসময় বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সফলতার কারণে হাম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও হাম আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো সরকারের গা-ছাড়া মনোভাব এবং শিশুদের শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত না হওয়া। প্রত্যন্ত অঞ্চল, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং বস্তিবাসী জনগোষ্ঠীর অনেক শিশু এখনও নিয়মিত টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
হাম রোগের সংক্রমণ এতটাই দ্রুত যে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত অরক্ষিত ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, অন্ধত্ব এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। ফলে হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন কোনো এলাকায় টিকাদানের হার কমে যায়, তখন সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্ন হলো, হাম রোগের বিস্তারের দায়ভার কার? এর দায়ভার শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। রাষ্ট্র, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম এবং অভিভাবক—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। সরকারকে টিকাদান কর্মসূচির মান ও বিস্তৃতি নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমকে ভুল তথ্য ও গুজব প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। একইসঙ্গে অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে যে টিকা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি শিশুদের মৌলিক স্বাস্থ্যসুরক্ষার অংশ।
বিশ্বব্যাপী কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে টিকাবিরোধী প্রচারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য অনেক ক্ষেত্রে টিকাদান কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশে এই প্রবণতা তুলনামূলক কম হলেও একে অবহেলা করার সুযোগ নেই। জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য এবং জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বর্ষা মৌসুম এলেই ডেঙ্গু আতঙ্ক ফিরে আসে। বাংলাদেশে ডেঙ্গু এক আতঙ্কের নাম। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে পূর্বের সরকারগুলো বরাবরই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। গত তিন বছরে বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে ওঠানামা করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে মোট ৪১৩ জনের মৃত্যু, ২০২৪ সালে ৫৭৫ জন এবং ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১,৭০৫ জন ডেঙ্গুতে মারা যান। গত ৯ বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশক নিধন, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনা বাবদ প্রায় ৭০৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর বাইরে শুধুমাত্র ২০২৩ সালে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ৪০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করা যায়নি। এর পেছনে পরিকল্পনার ঘাটতি, বাস্তবায়নের দুর্বলতা, সমন্বয়ের অভাব এবং জবাবদিহিতার সংকটকে অনেক বিশেষজ্ঞ দায়ী করেন।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক সমস্যা নয়; এটি দেশের প্রায় সব জেলায় বিস্তার লাভ করেছে। ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানির কারণে।
গত কয়েক বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা, তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং আর্দ্রতার বৃদ্ধি এডিস মশার বংশবিস্তারকে আরও সহজ করে তুলছে। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মৌসুমি অভিযান নয়, বছরব্যাপী পরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধে কী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। অথচ ইতোমধ্যে প্রায় বারো জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং হাসপাতালে ভর্তি আছে পাঁচ হাজারেরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দ্বিগুণেরও বেশি হওয়া সম্ভাবনা রয়েছে। মুখে বড় বড় কথা না বলে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। তা না হলে সরকার হিসাবে বিএনপির যেমন ক্ষতি হবে; তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি ও জনগণের।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সিটি করপোরেশনগুলোর। নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রায়ই দেখা যায় মশা নিধনের কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরিচালিত হয় এবং রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর তৎপরতা বাড়ে, কিন্তু আগাম প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে যায়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ফ্রিজের ট্রে বা যেকোনো পাত্রে জমে থাকা পানি মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। তাই সপ্তাহে অন্তত একদিন এসব স্থান পরিষ্কার করা এবং পানি জমতে না দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। হামের ক্ষেত্রে টিকাদান এবং ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস—এই দুটি পদক্ষেপ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বিপুলসংখ্যক মানুষকে রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু মৌসুমকে সামনে রেখে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা, স্যালাইন ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রাখতে হবে। একইভাবে হাম রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জনস্বাস্থ্য একটি মৌলিক ভিত্তি। একটি দেশ তখনই টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে, যখন তার জনগণ সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকে। হাম এবং ডেঙ্গুর মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে যদি মানুষের জীবনহানি ঘটে, তাহলে তা শুধু স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতা নয়; বরং সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও প্রতিফলন।
অতএব, হাম রোগের বিস্তার রোধে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত ও আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ, স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিষ্ঠা ও জনগণের সচেতন অংশগ্রহণের সমন্বয়েই কেবল এই দুই জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। অন্যথায় প্রতিবছরই আমাদের নতুন করে হাম ও ডেঙ্গুর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব গুণতে হবে।
লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক।
ভোরের আকাশ/ইউএম