মাদক, সন্ত্রাস ও ধর্ষণ: রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের মতো উদার গণতান্ত্রিক মুসলিম দেশে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং নানাবিধ সামাজিক অবক্ষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। সংবাদমাধ্যমে এসব বিষয়ে প্রতিনিয়ত শিরোনাম হচ্ছে; অতীতেও যেমন হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতেও হয়তো হবে। এর প্রতিবাদে আন্দোলন-সংগ্রাম ও দোষারোপের রাজনীতি চোখে পড়ার মতো; সাধুবাদ জানাই, বা হাততালি দিতেও কৃপণতা করছি না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিবাদ ও আন্দোলন হওয়া স্বাভাবিক। আর এই স্বাভাবিক প্রতিবাদ বা আন্দোলন সংগ্রাম বাংলার আপামর জনতার কাছে তখনই অস্বাভাবিক বলে মনে হয়, যখন দেখা যায় সংকীর্ণ দলীয়, গোষ্ঠীগত, ধর্মীয় কিংবা বর্ণগত স্বার্থ সামনে চলে আসে। ফলে অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে; তারা সুসংগঠিত হয়ে অপরাধ করে যাচ্ছে। কমছে না ধর্ষণ, মাদক, সন্ত্রাস ও অন্যায়-অবিচার।
মন্ত্রী, আমলা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কারও আন্তরিকতার কমতি নেই। অথচ ফলাফল একেবারে শূন্য। যেকোনো সুস্থ চিন্তা-চেতনার মানুষ কিংবা রাষ্ট্রপরিচালক নিজেরাও চান না, এসব জঘন্য অপরাধ সমাজে চলতে থাকুক। তাহলে সমস্যা কোথায়? তাদের ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ, জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার অভিলাষ ও অবৈধ উপার্জন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী। যখন দেখি একজন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধি অপরাধীদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন, অবৈধ অর্থের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত, তখন হতাশ না হয়ে আর উপায় কী?
মন্ত্রী মহোদয়দের ‘কঠোর বক্তব্যের’ পরও যখন দেখি আমার-আপনার আশপাশের মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজরা বহাল তবিয়তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে, তখন আর যাই হোক, কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য লোক দেখানো ও রাজনৈতিক বক্তব্য ছাড়া কিছুই মনে হয় না।
অনেকেই হয়তো ভুলে গেছি, গত ২৬ মে ২০২৬ রাজধানীতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ‘ন্যাশনাল অপারেশন মনিটরিং সেন্টার’ পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার যেকোনো ধরনের অনিয়ম, সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখবে। অতীতের সব সরকার, মন্ত্রীবর্গ, এমনকি প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও ‘জিরো টলারেন্স’ শব্দযুগল কমপক্ষে হাজারবার উচ্চারণ করেছেন।
আরেক বক্তব্যে ৪ মে ২০২৬ তারিখে সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির প্রথম সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে।’ প্রায় এক মাস হয়ে গেল, অপরাধীরা আগের মতোই আছে এবং তাদের অপকর্মও করে যাচ্ছে। তাহলে ‘জিরো টলারেন্স’-এর মানে কী?
আর এই ‘জিরো টলারেন্স’-এর অর্থ বলতে একজন খেটে খাওয়া রিকশাচালকের ব্যঙ্গাত্মক উক্তি, ‘জিরো টলারেন্স অর্থ হলো ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, মাদক ও অপরাধ বেড়ে যাওয়া।’
বিচারহীনতা, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, অপরাধীদের সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সখ্যতা, অবৈধ লেনদেন সর্বোপরি আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বেশির ভাগের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের প্রবণতার কারণেই অপরাধ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
আমরা হয়তো অনেকেই ভুলে গেছি—২০১৩ সালের আগস্ট মাসে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমানকে তাদের নিজ বাসায় নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করেন তাদেরই মাদকাসক্ত মেয়ে ঐশী রহমান।
ভুলে গেছি ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে ঢাকার গুলশানের বাড়িতে লতিফুর রহমানের কন্যা শাজনীন তাসনিম রহমানকে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার কথা।
ভুলতে বসেছি ২০২০ সালের অক্টোবরে সিলেটের মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজ এলাকায় স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার হওয়া নারীর কথা।
১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট রাতে দিনাজপুরে ঘটে যাওয়া ইয়াসমিন আক্তার ধর্ষণ ও হত্যার কথা। দীর্ঘ দশ বছরেও সুরাহা হয়নি কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ তনুর লাশ উদ্ধার করা হয়।
দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে জাকিয়া সুলতানা রুপা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বগুড়ায় চাকরির পরীক্ষা শেষে ‘ছোঁয়া পরিবহন’ বাসে করে কর্মস্থল ময়মনসিংহের দিকে ফিরছিলেন জাকিয়া সুলতানা রুপা।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে বোনের শ্বশুর কর্তৃক ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হন আট বছরের শিশু আছিয়া। ওই বছরের ১৩ মার্চ ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় ২০২৬ সালের ১ মার্চ ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার শিকার হয় সাত বছর বয়সী শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরা।
এ বছরের ৮ মার্চ নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে লঞ্চে ঢাকা যাওয়ার পথে এক কলেজশিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেছে ওই উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বড়দেইল গ্রামের মোহাম্মদ সাকিব উদ্দিন (২৬) এবং একই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের জোটখালী গ্রামের মোহাম্মদ নুরুজ্জামান মিঠু (৩২)। কথিত আছে, স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ধর্ষকদের পক্ষ অবলম্বন করছেন।
এ বছরের ১৯ মে সবচেয়ে আলোচিত ও জঘন্য অপরাধের ঘটনা ঘটে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে। আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে ঘাতক সোহেল রানা। এ অপরাধের সহযোগী ছিল মানুষরূপী সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। সেখানে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং ঘরের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে তার বিচ্ছিন্ন মাথা পাওয়া যায়।
এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং পচনধরা সমাজের আংশিক চিত্র বটে।
আন্দোলন-সংগ্রাম অনেক হয়েছে, অথচ অপরাধ কমছে না। আন্দোলনের মুখে সরকারেরও হয়তো পতন হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের চাকরি যাবে; অপরাধ কি দমন হবে? না, তা হয়নি এবং হবেও না। তাহলে উপায় কী?
এগুলো সমাজের নৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের বহুমাত্রিক প্রতিফলন। একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সচেতনতা দুর্বল হয়ে পড়লে এসব অপরাধ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম বড় কারণ হলো নৈতিক শিক্ষার অভাব, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি এবং মাদকের সহজলভ্যতা।
মাদক বর্তমানে সমাজ ধ্বংসের সবচেয়ে ভয়ংকর উপাদানগুলোর একটি। তরুণ সমাজের একটি অংশ যখন ইয়াবা বা অন্যান্য মাদকে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস হয় এবং অপরাধজগতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে সমাজে অপরাধের হার বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
শিশু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বর্তমানে সামাজিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে লজ্জাজনক দিকগুলোর একটি। শিশু ধর্ষণের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক। উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশু নির্যাতনের বড় অংশই ঘটে পরিচিত মানুষের মাধ্যমে। আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক, প্রতিবেশী বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠছে। ফলে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
এর পেছনে নৈতিকতার অবক্ষয়, পারিবারিক অসচেতনতা, পর্নোগ্রাফির অপব্যবহার, মাদকাসক্তি এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করে। যখন একজন শিশু নিরাপদ থাকে না, তখন সমাজের মানবিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অপরাধীরা রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে এবং সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়।
সামাজিক অবক্ষয়ের আরেকটি বড় কারণ হলো পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার সংকট। আগে পরিবার ছিল নৈতিক শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। বাবা-মা সন্তানকে সততা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার শিক্ষা দিতেন। কিন্তু আধুনিক ব্যস্ত জীবনে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব এবং অশালীন কনটেন্ট তরুণদের মানসিকতায় নেতিবাচক পরিবর্তন আনছে। ফলে সহিংসতা, অশালীনতা ও অপরাধকে তারা স্বাভাবিকভাবে নিতে শুরু করছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বেকারত্বও অপরাধ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। সমাজে যখন ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়ে এবং তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয় না, তখন হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। এই হতাশা অনেককে মাদক, সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে ফেলে। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত কিছু বেকার তরুণ সহজেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়। ফলে অপরাধ একটি সংগঠিত রূপ লাভ করে।
এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, পরিবারকে আবার নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই মানবিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষা নয়, নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। তৃতীয়ত, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। সীমান্তে মাদক পাচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
একই সঙ্গে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সামাজিক অবক্ষয় কখনো কমবে না। শিশু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
উপর্যুক্ত প্রস্তাবনাগুলোর বিষয়ে বহু বছর ধরেই বিভিন্ন সংগঠন বা রাজনৈতিক দল জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, ধর্ষণ ও সামাজিক অবক্ষয় আজ বাংলাদেশের জন্য শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর মানবিক ও নৈতিক সংকট। একটি সমাজ তখনই সভ্য বলা যায়, যখন নারী ও শিশুরা নিরাপদ থাকে। কিন্তু আজ বাংলাদেশে সেই নিরাপত্তাবোধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তাই রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থাকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি ভয়, সহিংসতা ও মানবিকতাহীন সমাজ উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে।
লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক।
ভোরের আকাশ/এনএস