রাষ্ট্রনায়কদের স্বাভাবিক মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন

বিশ্বব্যাপী দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কদের মৃত্যু যদিও স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়, তবুও থেকে যায় নানাহ প্রশ্ন। অনেক সময় এই ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ আসলে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, মানসিক চাপ, রাজনৈতিকভাবে একঘরে করে রাখা এবং ধারাবাহিক অপমানের চূড়ান্ত পরিণতি। ইতিহাস বলে--সব মৃত্যু গুলির শব্দে হয় না; কিছু মৃত্যু ঘটে নীরব নিপীড়নের ভারে। রাষ্ট্রনায়ক মানেই একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি রাজনৈতিক অবস্থান, একটি আদর্শ এবং অনেক ক্ষেত্রে জনগণের আশা-ভরসার প্রতীক। যখন কোনো রাষ্ট্রনায়ক রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করেন, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলেন, দেশপ্রেমের কথা বলেন, বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন এবং জনতার কথা বলেন; তখনই তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রযন্ত্রের বা বিদেশী প্রভুদের মূল লক্ষ্যবস্তুতে। এই অস্বস্তি দূর করতে রাষ্ট্র সবসময় সরাসরি সহিংস পথ বেছে নেয় না; অনেক সময় বেছে নেয় ধীর, পরিকল্পিত কূটকৌশল এবং ‘আইনসম্মত’ নিপীড়নের পথ।
স্বাভাবিক মৃত্যুর আড়ালে অস্বাভাবিক বাস্তবতা
একজন রাষ্ট্রনায়ক দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক চাপ, আইনি হয়রানি, সম্মানহানি এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করলে তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়বেই। অনিদ্রা, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও ভয় -- এসব মিলিয়ে শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত অসুস্থতায় মৃত্যু হলে রাষ্ট্র তা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলে দায় সারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো -- এই মৃত্যু কি সত্যিই স্বাভাবিক, নাকি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ফল? যখন একজন রাষ্ট্রনায়ককে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে বাধ্য করা হয়, গণমাধ্যমে চরিত্রহননের শিকার করা হয়, নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয় কিংবা রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে করে রাখা হয়-- তখন সেই ব্যক্তির মৃত্যু কেবল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না।
রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নীরব রূপ
রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সবসময় দৃশ্যমান হয় না। অনেক সময় এটি ঘটে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, আইনের অপব্যবহারে, কিংবা রাষ্ট্রীয় নীরবতায়। নিরাপত্তা না দেওয়া, চিকিৎসার সুযোগ সীমিত করা, বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি না দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি -- এসবই নিপীড়নের নীরব কিন্তু কার্যকর অস্ত্র। এই নিপীড়ন রাষ্ট্রকে আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ রাখে। কারণ কোথাও রক্ত নেই, কোথাও গুলির শব্দ নেই। অথচ ফলাফল একই-- একজন রাষ্ট্রনায়ক ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যান।
বিচারহীনতা ও নৈতিক দায়
রাষ্ট্র সাধারণত স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোনো তদন্তের প্রয়োজন মনে করে না। কিন্তু যখন সেই মৃত্যুর পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাস থাকে, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই দায় স্বীকারের প্রবণতা প্রায় অনুপস্থিত। রাষ্ট্র যদি নিজেই প্রশ্ন তোলে না-- এই মৃত্যু কি এড়ানো যেত? আমরা কি দায়িত্বশীল ছিলাম? তবে সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নৈতিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগোয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুধু হত্যার ক্ষেত্রেই নয়, নিপীড়নের ফলে হওয়া তথাকথিত স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
গণতন্ত্র ও মানবিক রাষ্ট্রের পরীক্ষাক্ষণ
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী রাষ্ট্রনায়কের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তাঁর মৃত্যু যদি স্বাভাবিকও হয়, তবুও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে-- তিনি নিপীড়নের শিকার হননি, তাঁর জীবন রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে সংকুচিত হয়নি। রাষ্ট্র যদি এই ন্যূনতম মানবিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে সেই রাষ্ট্র কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিণত হয়-- যেখানে ক্ষমতা আছে, কিন্তু নৈতিকতা নেই।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া এমন এক নাম, যার জীবন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, রাজনৈতিক সংগ্রাম, ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ এবং দীর্ঘ নিপীড়নের এক জটিল সমন্বয়। তিনি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের সঙ্গে যুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র। তাঁর জেল জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম তাই কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়-- এটি একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার চরিত্র ও বিরোধী রাজনীতির প্রতি আচরণের প্রতিচ্ছবি।
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আবির্ভাব কোনো পরিকল্পিত নয়; যা ছিলো স্রষ্টার মহাপরিকল্পনার অংশ। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তিনি হঠাৎ করেই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন-- যে ইতিহাস সবার জানা। একজন গৃহিণী থেকে জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে উঠে আসা ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বড় সংগ্রাম। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রামের মূল কেন্দ্র ছিল স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি কারাবরণ করেন, রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হন এবং একাধিকবার গৃহবন্দী অবস্থায় থাকেন। এই সময় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে ওঠে একজন আপসহীন বিরোধী নেত্রী হিসেবে।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার পতনের পর তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই অর্জনের পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, বারবার গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিজ্ঞতা। তবে ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর ওপর রাষ্ট্রীয় চাপ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয় -- যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিলো।
সভা-সমাবেশে বাধা, বাসভবনের সামনে পুলিশি অবস্থান এবং দলীয় কর্মসূচিতে কঠোর দমন-পীড়ন তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে ক্রমশ সংকুচিত করে তোলে। এক সময় তিনি ঘর ছাড়া হন ও আদরের ছোট সন্তানকে হারান। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা ঘোষণার মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন রাজনৈতিক বন্দী হিসেবেই তাঁকে কারাজীবন কাটাতে হয়। কারাগারে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। চিকিৎসা নিয়ে জটিলতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না পাওয়া এবং কারাবন্দী অবস্থায় মানসিক চাপ-- সব মিলিয়ে তাঁর জেল জীবন হয়ে ওঠে এক মানবিক সংকটের প্রতীক।
যা ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি না পাওয়া, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকা এবং চলমান মামলাগুলো তাঁর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতাই নির্দেশ করে। খালেদা জিয়ার জেল জীবন কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির বাস্তবতার একটি প্রতীক। তাঁর গ্রেপ্তার, কারাবাস ও সীমাবদ্ধ মুক্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে--ক্ষমতার বাইরে থাকা নেতাদের জন্য রাষ্ট্র কতটা কঠোর হতে পারে। সমর্থকদের কাছে তিনি আপসহীন প্রতিরোধের প্রতীক; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর জেল জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
খালেদা জিয়ার সংগ্রাম ও জেল জীবন বাংলাদেশের রাজনীতির আয়নায় প্রতিফলিত একটি দীর্ঘ ও জটিল গল্প। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না; শুধু তার রূপ বদলায়। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম মুখ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারক হয়েও খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের হাতে বন্দী হয়েছেন একজন সাধারণ কয়েদির মতো-- এই বাস্তবতা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নয়। শর্তাধীন মুক্তির পর খালেদা জিয়া কার্যত গৃহবন্দী অবস্থায় থাকেন। রাজনীতি করতে পারেন না, বিদেশে চিকিৎসার স্বাধীনতা পান না, প্রতিটি সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র এখানে আইন প্রয়োগকারী নয়, বরং নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
যে রাষ্ট্র বিরোধী নেতাকে মানবিক আচরণ দিতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের গণতান্ত্রিক বৈধতাকেই দুর্বল করে। ইতিহাস একদিন নির্ধারণ করবে-- এটি আইনের শাসনের উদাহরণ ছিল, না রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দলিল। তবে একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না-- একজন প্রবীণ, অসুস্থ বিরোধী নেত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় দমন দিয়ে নয়, মানবিকতা দিয়ে। সেই পরীক্ষায় আমরা কতটা উত্তীর্ণ হয়েছি-- সেই রায় ইতিহাসই দেবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক বাস্তবতা
এটি কেবল বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়। বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালেই দেখা যায়, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ফলে জনপ্রিয় বা সংস্কারপন্থী নেতাদের জীবন ঝরে গেছে। ক্ষমতাবান রাষ্ট্রযন্ত্র সব জায়গাতেই একই কৌশল ব্যবহার করে-- তদন্তকে প্রভাবিত করা, তথ্য গোপন রাখা এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাকে বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেওয়া। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুবার এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অজুহাতে কার্যকর পদক্ষেপ খুব কমই নেওয়া হয়। ফলে রাষ্ট্রগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ভোরের আকাশ/এসএইচ