সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি কী বার্তা দিচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রের বোমায় ক্ষতবিক্ষত ইরান। গত রাতেও বিভিন্ন শহর ও স্থাপনায় হামলা করেছে মার্কিন বাহিনী। বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। ইরানের অর্থনীতি বহু বছর ধরেই অবরুদ্ধ। কিন্তু ইরানের অপরাধ কী? দেশটির একমাত্র অপরাধ যুক্তরাষ্ট্রের দাসত্ব স্বীকার না করা। আরেক অপরাধ তারা ‘পরমাণু বোমা বানোর চেষ্টা’ করছে। যদিও তেহরানের দাবি তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। কিন্তু কে শোনে কার কথা? এ যেন মবের রাজ্য। আগে শা...লা রে মার। তারপর কথা!
যুদ্ধংদেহী যুক্তরাষ্ট্র এবার ইরান যুদ্ধে গিয়ে বড় বিপদে পড়েছে। তারা ইরানকে পরমাণু অস্ত্র থেকে বিরত রাখতে গিয়ে কত না অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ইরানের হাতে কী পরমাণু অস্ত্র আছে? তারা কী সত্যি পরমাণু বোমা বানিয়ে ফেলেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ। সিংহভাগ মানুষ বিশেষ করে এশিয়ার লোকজন মনে করে ইরান পরমাণু বোমা বানিয়ে ফেলেছে। এ কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকার করছে না। এই ধারণা বোধ হয় স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও। কারণ তিনি বার বার ইরানের পরিশোধিত ইউরেনিয়াম কব্জায় নেওয়ার কথা বলেছেন। আপ্রাণ চেষ্টাও করেছেন। সেটা যখন সম্ভব হলো না, তখন তিনি নতুন পথে হাঁটছেন। এবার তিনি সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পরমাণু চুক্তি করতে যাচ্ছেন। এটি প্রায় চূড়ান্ত। এই চুক্তি হলে রিয়াদ পরমাণু বোমা বানাতে পারবে। কিন্তু ট্রাম্প কেন এই সিদ্ধান্ত নিলেন? সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যুদ্ধের সময় ইরান বেশ কয়েক বার সৌদি আরব আক্রমণ করেছে। হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনে করছেন যে ইরানের পরমাণু অস্ত্র রয়েছে এবং প্রতিরক্ষা রশদ হিসেবে সৌদি আরবেরও এই অস্ত্র থাকা উচিত। একই ধরনের তাগিদ অনুভব করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি চূড়ান্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন; যার আওতায় ভবিষ্যতে নিজস্ব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ পেতে পারে সৌদি আরব। তবে এ চুক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের মার্কিন নিরাপত্তা শর্তগুলো শিথিল করায় পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের নতুন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্স জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর এটি পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হবে। চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের ১২৩ ধারা অনুযায়ী একটি ‘১২৩ এগ্রিমেন্ট’। এ ধরনের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার আইনি কাঠামো নির্ধারণ করে। বর্তমানে ৫১টি সরকার ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে এ ধরনের ২৬টি চুক্তি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তিতে তথাকথিত ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ রাখা হয়নি। ওই শর্ত থাকলে সৌদি আরব নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করতে পারত না; যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া চুক্তিতে আইএইএর ‘অ্যাডিশনাল প্রটোকলে’ যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। এই প্রটোকল কার্যকর থাকলে সংস্থাটি কোনো দেশের ঘোষণাবহির্ভূত স্থাপনাতেও আকস্মিক পরিদর্শন চালাতে পারে। এ চুক্তি পারমাণবিক জ্বালানির ক্ষেত্রে সহযোগিতার আইনি সুযোগ তৈরি করলেও সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তি বা সক্ষমতা দিতে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য থাকবে না।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে বলে ওয়াশিংটনের আশা। প্রথমদিকের সুবিধাভোগীদের মধ্যে থাকতে পারে মার্কিন কোম্পানি ওয়েস্টিং হাউস।
জো বাইডেন প্রশাসনের সময় সৌদি আরবের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তির আলোচনা হলেও সেটি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সেই উদ্যোগ থমকে যায়। ট্রাম্প প্রশাসন এবার ইসরায়েলকে স্বীকৃতির শর্ত থেকে পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়টি আলাদা করেছে। এই চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উভয় দলের কিছু আইনপ্রণেতা এবং ইসরায়েলের কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির আড়ালে ভবিষ্যতে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অতীতে প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও তা করবে।
রয়টার্স লিখেছে, চুক্তিটি কংগ্রেসে জমা দেওয়ার পর প্রায় ৯০ দিনের পর্যালোচনা চলবে। কংগ্রেস চাইলে যৌথ প্রস্তাব পাস করে এটি আটকে দিতে পারে। তবে প্রেসিডেন্টের ভিটো ক্ষমতা এড়াতে হলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। ফলে বাস্তবে চুক্তিটি আটকে দেওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
সুতরাং, একটি বিষয় কিন্তু পরিষ্কার সৌদি আরবের পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ সুগম হয়ে গেল। যুবরাজ সালমানের কথায় স্পষ্টÑরিয়াদ পরমাণু অস্ত্র পেতে চায়। সাদা চোখে দেখলে এটা দোষের নয়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, পাকিস্তান, চীন, ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্র থাকলে সৌদি আরবের কেন থাকবে না? মানবজাতি-সভ্যতার জন্য অভিশাপ পরমাণু অস্ত্র কমানোর দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারে অস্ত্র উৎপাদন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ঠিক এই সময় সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি নতুন শঙ্কা তৈরি করল। নতুন করে প্রশ্ন সামনে চলে এলোÑ ইরান কী পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে? লেখক: সাংবাদিক।
ভোরের আকাশ/এনএস