‘হাল ছেড়ো না’

জীবনের সংগ্রামে মানুষ যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, যখন প্রতিকূলতার পর প্রতিকূলতা এসে তার জীবনকে দুর্গম পাহাড়ের মতো কঠিন করে তোলে, যখন চারদিকে অন্ধকার আর হতাশা ছাড়া কিছুই দেখা যায় না—তখন হতাশার গভীর অন্ধকারে ডুবে যাওয়াই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি বাণী আমাদের পথ দেখায়: “হাল ছেড়ো না বন্ধু, সৃষ্টিকর্তা শক্তিশালী যোদ্ধাদেরকেই কঠিন পরীক্ষা দেন।” এই বাণী কেবল সান্ত্বনার কথা নয়; এটি জীবনযুদ্ধের এক মহান কৌশল।
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: “মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না?” (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ২)। অর্থাৎ শুধু ঈমানের দাবি করলেই জীবন মসৃণ হয়ে যাবে না; ঈমানের সত্যতা প্রমাণিত হয় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। এ কথা সত্য যে, আল্লাহ প্রত্যেক মানুষকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী পরীক্ষায় ফেলেন। কিন্তু তিনি কখনোই কারও সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপান না। এই বিশ্বাসটুকুই মানুষকে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও দাঁড় করাতে পারে। যে যোদ্ধা যত শক্তিশালী, তার পরীক্ষাও তত কঠিন হয়। কারণ সাধারণ কঠিনত্ব তাকে পরাস্ত করতে পারে না; তাকে পরীক্ষায় ফেলতে হলে প্রয়োজন হয় বিশেষ চ্যালেঞ্জের। আল্লাহর কাছে প্রিয় বান্দারা কখনো পরীক্ষাহীন থাকেন না।
জীবনের এই দর্শন বুঝতে পারলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যায়। তখন আমরা ব্যর্থতাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখি না, বরং সেটাকে দেখি উন্নতির সোপান হিসেবে। প্রতিটি বিপদ আসলে আমাদের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে জাগ্রত করার জন্য আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থাপনা। যে ধাতু যত কঠিন, তাকে গড়ে তুলতে তত বেশি তাপ ও আঘাতের প্রয়োজন। তেমনি মানবচরিত্রকেও পরিশুদ্ধ ও মজবুত করতে কঠিন কঠিন পরীক্ষারই প্রয়োজন। পরীক্ষা শাস্তি নয়, প্রশিক্ষণ। এটি আমাদের ধৈর্য, তাওয়াক্কুল, ইখলাস ও আত্মসমর্পণ শেখায়।
আল্লাহ আরও বলেন: “নিশ্চয় কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আসে, নিশ্চয় কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আসে।” (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৫-৬)। জীবনে যখন কঠিন সময় আসে, তখন হতাশ না হয়ে ভাবতে হবে—এই চ্যালেঞ্জ আসলে আমার মধ্যে লুকিয়ে থাকা শক্তিশালী যোদ্ধাটিকেই খুঁজে বের করার জন্য। আল্লাহ যখন আমাকে এই পরীক্ষা দিচ্ছেন, কষ্টে ফেলছেন, তার মানে তিনি আমার মধ্যে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সামর্থ্য রেখেছেন। আমাদের দায়িত্ব হলো ধৈর্যধারণ করা, পরিশ্রম করা এবং আল্লাহর উপর অগাধ বিশ্বাস রাখা। কারণ প্রতিটি কঠিনতার পরে আসে সুবিশাল সফলতা, প্রতিটি অন্ধকারের পরেই আসে উজ্জ্বল ভোর। এই বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে মানুষ জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধেও বিজয়ী হতে পারে। আল্লাহর রহমত সবসময় ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকে—এটা যেন আমরা কখনোই ভুলে না যাই।
আরও মনে রাখতে হবে, কষ্ট কেবল পরীক্ষা নয়; তা আমাদের গুনাহ মোচনের এবং মর্যাদা বৃদ্ধিরও মাধ্যম। নবী (সা.) বলেছেন, মুমিনের জীবনে যত কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা ও দুঃখ আসে, তার বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহগুলো ঝরে ফেলেন। তাই বিপদকে শত্রু ভাবা উচিত নয়; বিপদ হলো আত্মার প্রশিক্ষক। যে মানুষ কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, সে কখনো একা নয়। তার সঙ্গে থাকেন ফেরেশতারা, তার সঙ্গে থাকেন আল্লাহর রহমত।
প্রিয় পাঠক, প্রকৃত বীররা কখনো জীবনযুদ্ধ থেকে পলিয়ে যায় না। আপনি যে এই মুহূর্তে যুদ্ধ করছেন, সেটাই প্রমাণ করে আপনি আল্লাহর বিশেষ একজনের সৈনিক। তিনি আপনাকে সাধারণ সৈনিক বানাননি, বরং বিশেষ বাহিনীর যোদ্ধা বানিয়েছেন—জীবনযুদ্ধের বিশেষ বিশেষ মিশনের জন্য। তাই আপনার পরীক্ষা কঠিন, কারণ আপনার মিশনও বিশেষ।
তাই এখনই মনে-প্রাণে ফিরে আসুন মহান রব আল্লাহর দিকে। জীবনটা একটা চলমান সেকেন্ড, যেটা শেষ হয়েই যাবে। আপনার হতাশার ধাপ, আপনার সংগ্রামের ধাপ, আপনার অশ্রুর ধাপ—বিন্দু বিন্দু সবই আল্লাহর দরবারে লিপিবদ্ধ হচ্ছে মহান প্রতিদানের প্রত্যাশায়। আজ আপনি হয়তো কুয়ার তলায়, কিন্তু ভুলবেন না ইউসুফ (আ.)–ও কুয়া থেকে শুরু করেছিলেন মিসরের ঐতিহাসিক সিংহাসনের যাত্রা। তাই আপনার বর্তমান অবস্থা আপনার শেষ অবস্থা নয়।
“আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ার এটাই সবচেয়ে সুবর্ণ সুযোগ!” যখন যে মানুষটিকে সবাই ছেড়ে দেয়, যখন সব সহায় শেষ হয়ে যায়—ঠিক তখনই তো আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী হয়। সুতরাং, হাল ছাড়বেন না! আপনার নৌকা ডুবির আগ মুহূর্তে, আল্লাহর সাহায্যের বাতাস বইবেই। হয়তো আপনি এখন অন্ধকার সুড়ঙ্গে আছেন; কিন্তু সুড়ঙ্গের শেষেই আলো অপেক্ষা করছে।
ভয় পাবেন না। ইউনুস (আ.) ছিলেন মাছের পেটে, আইয়ুব (আ.) ছিলেন দীর্ঘ রোগে, মুসা (আ.) ছিলেন সমুদ্র আর ফিরাউনের সৈন্যের মাঝখানে। প্রত্যেকের কাছে মানবিকভাবে কোনো পথ ছিল না; কিন্তু আল্লাহর হুকুমে অসম্ভবও সম্ভব হয়েছে। আপনার জীবনেও সেই মুজিজা ঘটতে পারে, যদি আপনি আল্লাহর উপর ভরসা না ছাড়েন।
মনে রাখবেন, পৃথিবীতে যেমন কেউ স্থায়ী নয়, তেমনি কারও সমস্যাও স্থায়ী নয়। আসলে লক্ষ্যহীন তীর কোথাও পৌঁছাতে পারে না, তাই জীবনের মহৎ লক্ষ্য ঠিক রাখুন, মৃত্যুকে সবসময় স্মরণে রাখুন। আপনি পারবেন, কারণ আল্লাহ আপনার সাথে আছেন! আর আল্লাহ যখন থাকেন, তখন কোনো শক্তিই আপনাকে পরাজিত করতে পারবে না। তাই হাল ছেড়ো না; ধৈর্য, দোয়া ও বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাও। আল্লাহর রহমত তোমার সঙ্গেই আছে।
এ কে এম মাহাবুব আলম হিরা
লেখক: কলামিস্ট
ভোরের আকাশ/এনএস