মৃত্যু: একটি অনিবার্য সত্য ও চিরস্থায়ী জীবনের সূচনা

ভাই, এটা হলো সেই সত্য কথন, মন দিয়ে অন্তত একবার পড়ুন শেষ পর্যন্ত, যা হতে পারে আপনার সচেতন জীবনের নিশ্চিত ভবিষ্যতের এক অমূল্য উপলব্ধি। নিশ্চয়ই মহাসমুদ্রের বিশালতা গঠিত হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুর সমষ্টিতে। তেমনই মানুষের জীবনও গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোটো ছোটো চিন্তা, কথা ও কাজের মাধ্যমে। একটি ভালো চিন্তা কিংবা একটি ভালো কাজ মনে হয় তুচ্ছ, কিন্তু যখন তা হয় নিয়মিত, এক সময় তা এক মহাসাগরের মতো বিশাল আকার ধারণ করে-একটি পুণ্যময় আলোর জীবন সৃষ্টি করে।
আর ঠিক তেমনই প্রতিটি নেতিবাচক-নোংরা চিন্তা বা খারাপ কাজ, যত ছোটই হোক না কেন, সময়ের প্রবাহে জমতে জমতে এক ভয়ংকর সাগরে পরিণত হতে পারে, যা ব্যক্তির জীবনকে গ্রাস করে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে, জীবনকে করে লক্ষ্যহীন-উদ্দেশ্যহীন। ঠিক সেই আলো-অন্ধকারের শেষে মৃত্যু নামক সেই অনিবার্য সত্যের মুখোমুখি আমরা তো সবাই একদিন হবোই। যখন প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে, তখনই বন্ধ হয়ে যাবে আপনার-আমার দুনিয়ার সব হিসাব-নিকাশ। কিন্তু সেদিনই শুরু হবে এক নতুন অধ্যায়, এক চিরন্তন জীবন। সেই জীবনের জন্য আর প্রস্তুতির কোনো দ্বিতীয় সুযোগ মৃত্যু আমাদেরকে দিবে না।
কোরআনে আল্লাহ পরিষ্কার বলেছেন, ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে সম্পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে।’
একজন মানুষ হিসাবে আমরা কি কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, মৃত্যুর পর আমাদের ঠিকানা আসলে কোথায়?
ইসলাম আমাদের শেখায়, মৃত্যুর পর মানুষের জন্য দুটো চিরস্থায়ী গন্তব্য ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই-‘হয় চিরশান্তির বাগান জান্নাত, নয়তো চিরবিষাদের আগুন জাহান্নাম’। এর বাইরে তৃতীয় কোনো বিকল্প আল্লাহর আইনে নেই।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর যারা কুফরি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন।’ ভাই, এই কথাটা খুব গুরুত্ব দিয়ে বুঝে নিন। দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথাই নির্ধারণ করছে আপনার চিরকালের ঠিকানা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর একটি হাদিসে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন, ‘কবর হচ্ছে পরকালের প্রথম স্তর। যদি কেউ এখানে রক্ষা পায়, তাহলে পরের পথটা তার জন্য সহজ হবে। আর যদি এখানে রক্ষা না পায়, তাহলে পরের পথ হবে আরও ভয়াবহ।’
মনে রাখবেন, মৃত্যুর পরেই যে শাস্তি বা শান্তি শুরু হয়, তা শুধু কিয়ামতের পর নয়; বরং মৃত্যুর সময়ই মানুষ তার আমলের চূড়ান্ত ফলাফল কি হতে পারে তা টের পেতে থাকে। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, মৃত্যুর পরে কি আল্লাহর রহমতের কোনো দরজা খোলা নেই? অবশ্যই আছে! আল্লাহর রহমত অসীম। তাঁর প্রিয় নবী (সা.) কিয়ামতের দিন শাফাআত বা সুপারিশ করার অধিকার পাবেন। তাঁর এই সুপারিশে অনেক গুনাহগার মুসলমান জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু এটা ভেবে নিশ্চিত হয়ে বসে থাকা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ, শাফাআত পাওয়ার জন্য অন্তত তাওহিদের উপর অটল থাকা এবং শরিক থেকে দূরে থাকাটা তো নধংবষরহব হিসেবে দরকার।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম করুণায় যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শরীক করার গুনাহ ক্ষমা করেন না; এছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ দেখুন, শিরকই একমাত্র এমন গুনাহ যা ক্ষমার আয়তনের বাইরে, যদি না মানুষ তার জীবদ্দশায় তাওবা করে। বাকি সব গুনাহই তাঁর ক্ষমার আওতাভুক্ত।
ভাই, এইবার একটু থামুন। চিন্তা করুন। আজ এই মুহূর্তেই নিজেকে জিজ্ঞেস করুন- প্রতিটা দিন অতিক্রম হয়ে যাচ্ছে, প্রতিটি সেকেন্ড হারিয়ে যাচ্ছে, জীবন একটা সফর। চাই বা না চাই, বুঝি অথবা না বুঝি আমরা প্রত্যেকেই এই সফরের মধ্যে আছি। ‘আমি আসলে কোন পথে চলছি? আমার জীবনের প্রতিটি দিন কি আমাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?’ (এই দুটোর বাহিরে আর কোন রাস্তাই নাই) যে আল্লাহ আপনাকে-আমাকে সৃষ্টি করেছেন জরায়ুতে অতিক্ষুদ্র বিন্দু থেকে! দিয়েছেন সব সুযোগ-সুবিধা, তাঁর দিকে ফিরে আসার আর সময় কখন? আগামীকালের কোনো নিশ্চয়তা তো নেই। দুনিয়ার জীবনের এই ক্ষণিকের সুখ-শান্তি, এই ধোঁকার জীবনের মোহ, যেন আমাদের চিরস্থায়ী জীবনের ব্যাপারে গাফিল না করে দেয়।
রাসূল (সা.) বলতেন-
>‘আল্লাহর স্মরণ ছাড়া অন্য সব কথা হলো অনর্থক,
>‘আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া অন্য সব দৃষ্টি হলো অশ্রুপাত, আল্লাহর ইবাদত ছাড়া অন্য সব কাজ হলো ব্যর্থ।’
জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যকার এই সিদ্ধান্ত আপনাকে নিতে হবে না ভাই, বরং আপনার আমল বা কর্মই তা নির্ধারণ করবে কোথায় পৌঁছাবেন। এখনই সময় ফিরে আসার-
সেই আল্লাহর দিকে, যিনি আপনাকে- আমাকে ভালোবাসেন, যিনি আমাদের তাওবায় অত্যন্ত খুশি হন। আল্লাহ না করুন, যদি আজ রাতে মালাকুল মাউত আপনার প্রাণ নিয়ে যায়, তাহলে আপনি নিজেকে কোন অবস্থায় পেতে চান? এই চিন্তাই আপনার প্রতিটি নিঃশ্বাসকে ইবাদতে পরিণত করুক।
ভাই, উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে সবসময় এক সত্যকে স্মরণে রাখবেন, ‘আপনার হৃদয়ের স্পন্দন যেদিন বন্ধ হয়ে যাবে, সেদিন আপনার অতি আপনজনরাই আপনাকে মাটি চাপা দিয়ে চলে আসবে নির্জন কোন অন্ধকার কবরে।’
নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য এখনই প্রস্তুতি নিন। মহান আল্লাহর আদেশ এমনভাবে মেনে চলুন, যেন মালাকুল মউত (মৃত্যুর ফেরেশতা) যখন আপনার কাছে উপস্থিত হবে, তখন অতীতের কোনো কাজের জন্য যেন আফসোস করতে না হয়।
অনিশ্চিত জীবনের পরিণতি চিন্তা করে প্রজ্ঞার কাজ হলো প্রতিটি মুহূর্তকে সচেতনভাবে ব্যবহার করা। আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশ, সৎ কাজ, প্রতিটি ভালো চিন্তা যেন সেই মহাসমুদ্রের দিকে যাত্রার একটি বিন্দু হয়, যা শেষ পর্যন্ত আখেরাতে হয়ে উঠবে নাজাত ও সফলতার অফুরান উৎস। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে অটল থাকার তাওফিক দান করুন এবং তাঁর অসীম রহমতে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমীন।
লেখক : কলামিস্ট ও দাঈয়ি।
ভোরের আকাশ/এসএইচ