সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা

আর মাত্র ২২ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ৫১টি রাজনৈতিক দল। দলগুলোর মনোনীত প্রার্থীরা জয়ের টাগের্ট নিয়ে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও উৎসবমুখর প্রচার-প্রচারণায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একইসঙ্গে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির তফসিল অনুযায়ী, প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি এবং ভোটগ্রহণ ১২ ফেব্রুয়ারি। ইতোমধ্যে যাছাই-বাচাই ও আপিলের শুনানি শেষে দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে বৈধ প্রার্থী দাঁড়িয়েছে ২২৫৩ জন। বৈধ সকল প্রার্থীই এখন ভোটের মাঠে সরব রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। তফসিল মতে, আগামীকাল থেকেই মাঠে গড়াবে প্রচার। শুরু হবে ভোটযুদ্ধ। কিন্তু মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়ার পর ও প্রতীক বরাদ্দের আগেই প্রচার শুরু করেছে প্রার্থীরা। সবমিলিয়ে দেশ এখন পুরোপুরি নির্বাচনমুখী। তবুও শঙ্কা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে।
গত কয়েকদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও ইসির কর্মকাণ্ড ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তাতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে দেশের সাধারণ জনগণ- এমনটাই বলেছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, তফসিল অনুযায়ী প্রচার শুরুর আগেই নানা ইস্যুতে চারদিক থেকে চাপ বাড়ছে ইসির ওপর। প্রতীক বরাদ্দের আগেই লাগামহীন প্রচার, আচরণবিধির ধারাবাহিক লঙ্ঘন, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্ক, প্রার্থীদের ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যু এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে প্রতিদিনই উত্তেজনা বাড়ছে ভোটের মাঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অসহায়ত্ব এবং প্রার্থীদের আক্রমণাত্মক আচরণ। ফলে নির্বাচনের আগেই ইসির নিয়ন্ত্রণক্ষমতা নিয়ে আস্থা হারানোর কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছে, ইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাত্বিতের অভিযোগ এনে নির্বাচনে না যাওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এনসিপি। ইসি একপাক্ষিক আচরণ করছে বলে অভিযোগ জামায়াতের। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, ইসির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দলটি সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত। ভোটমুখী পরিবেশেও ঘোলাটে এই পরিস্থিতিতে গ্রাম থেকে শহরের সাধারণ জনগণের মুখে প্রশ্ন-কী হবে। হবে তো নির্বাচন।
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে চ্যালেঞ্জ
আগামী নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ব্যাপক পরিসরে চালু হবে পোস্টাল ব্যালট। কিন্তু শুরু থেকেই এ ব্যবস্থাকে ঘিরে বিতর্কে পড়েছে ইসি। সম্প্রতি বাহরাইন, সৌদি আরব ও কুয়েতে পোস্টাল ব্যালট প্রেরণ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে ইসি। সেখানে একটি বাসায় অনেক ব্যালট পেপারের ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এরপর পোস্টাল ব্যালট ও ব্যালটে ধানের শীষের প্রতীক বিন্যাস নিয়ে আপত্তি তুলে ইসির কাছে ব্যাখ্যা চায় বিএনপি। প্রতীক নিয়ে দেশে ও বিদেশে একই ধরনের পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত, ব্যালটে প্রার্থীর নাম ও ছবি না থাকা, প্রতীক বিন্যাস এবং ব্যালট ভাঁজে নির্দিষ্ট প্রতীক আংশিক ঢেকে যাওয়ার অভিযোগসহ সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন ভোটব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
পক্ষপাতের অভিযোগ
পোস্টাল ব্যালট পেপারে অনিয়ম, জামায়াতকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারসহ তিনটি অভিযোগের প্রতিবাদে রোববার থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ইসির সামনে দিনভর ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্রদল। নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কূটকৌশলের অভিযোগ তুলে বিএনপি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলেছে দলটি। একই সঙ্গে দলটির প্রতি ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা। নির্বাচন কমিশন একপাক্ষিক আচরণ করছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপি।
দলটি ধারণা, ইসি একটি বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি নমনীয়। বিষয়টি তাদের মনে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছে জামায়াত ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অনেক ক্ষেত্রে কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে, যা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অন্তরায় হতে পারে। তবে বিদ্যমান ত্রুটিগুলো দ্রুত সমাধান করলে এই কমিশনের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব মনে করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, ভোটারদের কাছে পৌঁছানো পোস্টাল ব্যালটগুলো ত্রুটিপূর্ণ। নির্দিষ্ট একটি দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যেই এই ব্যালট তৈরি করা হয়েছে। অবিলম্বে প্রতীক সংবলিত সঠিক ব্যালট পেপার সরবরাহ করতে হবে।
কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, যেসব কর্মকর্তা পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপি ইস্যুতে উত্তেজনা
সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা ঘোষণা নিয়ে সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের আদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য রাজনৈতিক দল বা জনগণের যে কনফিডেন্স অর্জনের কথা ছিল নির্বাচন কমিশনের, তা হারিয়েছে তারা। এ নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমরা বিশ্বাস রাখতে পারছি না। এ নির্বাচনে আমরা অংশ নেব কিনা তা আমরা এখনো বিবেচনা করতে পারছি না।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব, ঋণখেলাপি বা ঋণখেলাপির গ্যারান্টারদের অনেককে ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়েছি। যদি এভাবে নির্বাচনের কার্যক্রম সামনের দিকে যেতে থাকে, তাহলে আমরা শঙ্কা প্রকাশ করছি, বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন বাস্তবায়ন করতে পারবে না ইসি। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে একটা বড় ধরনের কনসার্ন (উদ্বেগ) তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এটাকে গুরুত্বসহকারে নেওয়ার বিষয় আছে। প্রত্যাশা করি, এটা তারা রিভাইস করবেন। কিছু সমস্যা আছে; দেখে, সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও আছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো কোনো মহল কিছু কিছু ইস্যু তৈরি করতে পারে, নির্বাচনটা যাতে আবার একটু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে কিংবা অনিশ্চিত করা যায়। এ ধরনের কোনো প্রচেষ্টা এখন সফল হবে না। আর নির্বাচন হবে কি না, এটা নিয়ে নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত কেউ কেউ শঙ্কা প্রকাশ করতেই থাকবে। গোটা জাতি এখন ইলেকশন মুডে চলে গেছে। দলগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারে নামার অপেক্ষায়। সুতরাং কোনো প্রচেষ্টা-অপচেষ্টা সফল হবে না।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আমাদের সবারই দাবি। এটার জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই-সংগ্রাম করে আসছি। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল সবাইকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু নানা বাহানা তুলে অনেকে নির্বাচন যদি পণ্ড করার চেষ্টা করে-এটা দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে হবে, জনগণ তা গ্রহণ করবে না।
এবিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ভালো নির্বাচনের ক্ষেত্রে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ নির্বাচন কমিশন কোনো কলঙ্ক নিয়ে যেতে চায় না। নির্বাচন নিয়ে আমরা কোনো শঙ্কা দেখছি না। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে যে সংশয় আছে আশা করি তা দূর হয়ে যাবে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ