বিএনপির বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’

দুইদিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ। ভোটের মাঠে রয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ৫১টি দল। জয় পেতে কল্যাণমুখী বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থী, কর্মী ও সমর্থকরা। প্রতিটি সংকটে পাশে থাকা বিএনপির সম্ভাব্য জয়ের হাতছানি দেখছে বিরোধীরা। তাদের অনেকে প্রতিহিংসা বশত দলটির হাইকমান্ড নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এআই) ব্যবহার করে ভিডিও, ডিপফেক, ভয়েস ক্লোনিং ও বিকৃত ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। দলটি পরিকল্পিত ভয়াবহ অপপ্রচারের শিকার হচ্ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দলটির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যেই একটি বিশেষ মহল দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই অপপ্রচারের জাল বিস্তার করছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত এই অপপ্রচারের প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দলটির বিরুদ্ধে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই বিষয়টিকে দলটির পক্ষ থেকে একটি সুসংগঠিত ‘ডিজইনফরমেশন ক্যাম্পেইন’ বা অপপ্রচার অভিযান হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে এ ধরনের প্রোপাগান্ডা নতুন কিছু নয়। তবে বিএনপির ক্ষেত্রে এর মাত্রা ও ধরন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন ও সুদূরপ্রসারী বলে মনে করা হচ্ছে। অপপ্রচারের এই জোয়ার রুখতে এবং জনসমক্ষে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে দলটি এখন আত্মরক্ষামূলক ও একইসঙ্গে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বনের পথে হাঁটছে। এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবেই লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছে। জনমতকে প্রভাবিত করার এই হীন প্রচেষ্টাকে মোকাবিলা করাই এখন দলটির সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ মহল পরিকল্পিতভাবে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষা ও বিকৃত কনটেন্ট ব্যবহার করে দলটির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বিএনপির দাবি, ডিজিটাল অপপ্রচারের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করা সহজ নয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে এআই প্রযুক্তির এমন অপব্যবহার গণতন্ত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ততই ছড়াচ্ছে এআই দিয়ে তৈরি ‘সত্যের আদলে মিথ্যা’ কনটেন্ট। বিশেষ করে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের নাম ও মুখাবয়ব ব্যবহার করে ডিপফেক ভিডিও, ভয়েস ক্লোনিং ও ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নামে একটি এআই জেনারেটেড ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি নতুন একটি ফেসবুক পেজ খুলে সবাইকে ফলো করার আহ্বান জানাচ্ছেন। পরে যাচাই করে দেখা যায়, এটি তারেক রহমানের পুরোনো একটি ভিডিওর ভিন্ন দৃশ্য ব্যবহার করে এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি করা সম্পূর্ণ ভুয়া কনটেন্ট।
এর আগে গত ২০ জানুয়ারি ‘ডেইলি ডাকসু’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে তারেক রহমানের নামে একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। সেখানে দাবি করা হয়- ক্ষমতায় এলে মেট্রোরেল বন্ধ করে ডিজিটাল লোকাল বাস চালু করা হবে। ফ্যাক্টচেকিংয়ে এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়।
এছাড়া তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে তৈরি আরেকটি এআই ভিডিওতে বিভ্রান্তিকর সংলাপ যুক্ত করে ব্যাপকভাবে শেয়ার করা হয়। ভিডিওটির শেষাংশে রাজনৈতিক প্ররোচণামূলক আবহ যুক্ত করে কনটেন্টটিকে আরও বিতর্কিত করে তোলা হয়।
গত ৩০ জানুয়ারি রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কর্মকর্তা গৌরব দোররার কথিত বৈঠকের চারটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এআই দিয়ে তৈরি ওই ছবিগুলোতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আওয়াল মিন্টু ও যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবিরকেও দেখানো হয়। ছবিগুলো মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। পরে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ‘রিউমর স্ক্যানার’ ও ডিসমিসল্যাব নিশ্চিত করে- চারটি ছবিই সম্পূর্ণ ভুয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি।
‘১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা জনগণের পা ধরবেন পরবর্তী ৫ বছর জনগণ আপনার পা ধরবে’- বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে ফেসবুকে বেশ কিছু ফটোকার্ড ও একটি ভিডিও ক্লিপ প্রচার করা হচ্ছে। এসব ভিডিও ক্লিপের কোনো কোনোটির ওপর লেখা, জনগণ পাঁচ বছর বিএনপির পা ধরবে। তবে ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটি তারেক রহমানের একটি দীর্ঘ বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ। মূলত তারেক রহমান কুমিল্লার এক জামায়াত নেতার বক্তব্য সূত্রে এই মন্তব্য করেন। শুধু এসব ঘটনাই নয়, তারেক রহমান, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ শীর্ষ নেতাদের মুখাবয়ব ব্যবহার করে ইতোমধ্যে অসংখ্য নেতিবাচক ছবি ও ভিডিও ছড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। রিউমর স্ক্যানার, ফ্যাক্টওয়াচ, ডিসমিসল্যাব, বাংলা ফ্যাক্ট ও দ্য ডিসেন্টের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সাত দিনে নির্বাচন ঘিরে ফেসবুকে অন্তত ৯৩টি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি সরাসরি তারেক রহমানকে নিয়ে।
বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথিত ‘র’ কর্মকর্তার সাক্ষাতের ভাইরাল ছবিগুলো ভুয়া এআই দিয়ে তৈরি ২২টি ছবি-ভিডিও ও দুটি ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত হয়েছে। শুধু জানুয়ারি মাসেই তারেক রহমানকে ঘিরে ছড়ানো হয়েছে ৬০টি নেতিবাচক অপতথ্য। একই সময়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন নিয়ে ছড়ানো হয়েছে মোট ২৩৮টি ভুল তথ্য।
রিউমর স্ক্যানার ‘নির্বাচনী হাওয়ায় জানুয়ারিতে ভুল তথ্যের রেকর্ড বৃদ্ধি: শনাক্ত ৫৭৭টি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েক মাসে অপতথ্যের প্রচার বৃদ্ধি পেয়েছে। জানুয়ারিতে এ সংক্রান্ত ২৭১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। রিউমর স্ক্যানার জানুয়ারি মাসের ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, বিএনপি, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ২৩৮টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।
এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে জড়িয়ে ৮৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৬২ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এছাড়া, দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে এই সময়ে ৬০টি অপতথ্য (৭২ শতাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক উপস্থাপন) প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রদলকে জড়িয়ে এই সময়ে ৯টি ও যুবদলকে জড়িয়ে ১টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান বলেন, এআইয়ের মাধ্যমে বিএনপির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। গুজব প্রতিরোধে দলের আইটি বিভাগ সক্রিয় রয়েছে এবং নেতাকর্মীদের বিভ্রান্ত না হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা এখন প্রতিহিংসায় পরিণত হয়েছে। বাস্তব মাঠের পাশাপাশি ডিজিটাল মাঠেও কে কাকে হেয় করা যায়, সে প্রতিযোগিতা চলছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কনটেন্ট তৈরি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
রাজনীতি বিশ্লেষক সাব্বির আহমেদ বলেন, নির্বাচনি প্রচারণাকালে এআইভিত্তিক অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণে না রাখা গেলে ভুল বোঝাবুঝি থেকে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এতে ভোটারদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ নষ্ট হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এসেছে। কিন্তু একটি মহল এখনো অত্যন্ত বাজে ভাষা ও বিকৃত মানসিকতা নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত।
তিনি আরও বলেন, আমরা এদের ‘বট বাহিনী’ বলি। এদের চিন্তাভাবনা এখনো পুরোনো দিনেই আটকে আছে। তবে সত্য শেষ পর্যন্ত সামনে আসবেই।
হাবিব উন নবী খান সোহেল আব্রাহাম লিংকনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আপনি কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারেন, কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না।
বিএনপির সহ-তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক সাইফ আলী খান বলেন, ফেক কনটেন্টের বিরুদ্ধে আমাদের ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ফেক কনটেন্ট দিয়ে যে শয়তানি করা হচ্ছে, বিএনপি তাতে বিশ্বাস করে না। আমরা বিশ্বাস করি, মিথ্যার সঙ্গে সত্যের জয় অবধারিত।
ভোরের আকাশ/এসএইচ