শত-সহস্র মানুষের ভিড়
দেশনেত্রীর কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা

তীব্র শীত উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদের গন্তব্য একটাই, দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির আপসহীন নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আসা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জিয়া উদ্যানের মোড় থেকেই জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদারর কবরমুখী মানুষের ভিড়। অনেকেই ফুল নিয়ে এসেছেন খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে। কেউ করছেন দোয়া, কারও চোখে পানি। অশ্রুসিক্ত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেছেন অসংখ্য মানুষ। তারা প্রার্থনা করছেন, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী যেন কবরে শান্তিতে থাকেন। উদ্যান সংলগ্ন সংসদ ভবনের সামনের রাস্তা ও বেইলি ব্রিজ থেকে কবর পর্যন্ত নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। আর কবরে পাশে নেতাকর্মীদের ভিড় সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ ছাড়াও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ও দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দরা অনেকই নিজেদের সমর্থকদের নিয়ে এসেছেন প্রিয় নেত্রীর দোয়া ও কবর জিয়ারত করতে। আর গতকাল সকালে পরিবারের পক্ষ থেকে কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। দাফনের তৃতীয় দিন গতকাল শুক্রবার বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আসছে মানুষের এমনই চিত্র সরেজমিনে দেখা গেছে।
দেশব্যাপী সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়
দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির শীর্ষ নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশজুড়ে তৃতীয় ও শেষ দিনের মতো রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে গতকাল শুক্রবার। ওই দিনটিতে দেশের সকল মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ইসলামিক ফাউন্ডেশনও বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় জুমার নামাজের পর দেশের সকল মসজিদে বিশেষ দোয়া করা হয়। রাষ্ট্রীয় শোকের শেষ দিনেও দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল সরকারি-বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। এর আগে ৩০ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও গত বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই প্রজ্ঞাপনে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে অভিহিত করে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়।
গুলশানের আজাদ মসজিদে খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করে বিএনপি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফিরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে এই দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে অংশ নেন খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারেক রহমানের পাশাপাশি মিলাদ মাহফিলে উপস্থিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা। দোয়া মাহফিলে অংশ নিতে দুপুর থেকেই গুলশান আজাদ মসজিদ ও এর আশপাশের এলাকায় বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী জড়ো হন। এছাড়া দলমত নির্বিশেষে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষও মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনায় এই দোয়ায় শরিক হন। এছাড়া, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির উদ্যোগে সুবিধাজনক সময়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা ও শুভাকাক্সক্ষীদের এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানান দলটি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা
গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় কবর জিয়ারতে আসেন তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান এবং তার দুই মেয়ে জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমান। তারা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন এবং পরে দোয়া ও মোনাজাত করেন। খালেদা জিয়ার মেজ বোন সেলিনা ইসলাম তার স্বামী অধ্যাপক আমিনুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। অসুস্থ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম হুইলচেয়ারে করে আসেন। খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তার গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমও কবর জিয়ারতে আসেন। শোকাহত পরিবেশে কবরের সামনে দাঁড়িয়ে পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। নাতনি জাইমা রহমান দাদুর কবরের সামনে ফুলের তোড়া রেখে নীরবে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ করেন। পাশে ছিলেন জাহিয়া ও জাফিয়াও। তখন কবরপ্রাঙ্গণে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। এ সময় কবরপ্রাঙ্গনে জাতীয়তাবাদী উলামা দলের সদস্যরা কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। পরিবারের সদস্যদের কবর জিয়ারতের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এ সময় কোনো নেতাকর্মীকে কবরপ্রাঙ্গনে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তারা চলে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষের জন্য কবরপ্রাঙ্গণ খুলে দেওয়া হয়। তখন কালোব্যাজ ধারণ করে নেতাকর্মীদের ঢল নামে খালেদা জিয়ার কবরপ্রাঙ্গণে।
অত্যাচার সহ্য করেও গণতন্ত্র এগিয়ে নিয়েছেন খালেদা জিয়া
গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর জিয়া উদ্যানে খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শত অত্যাচার সহ্য করেও দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
মির্জা আব্বাস বলেন, তার ওপর যে অত্যাচার হয়েছিল, মানুষের দিকে তাকিয়ে তিনি তা সহ্য করে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আজকে গণতন্ত্রের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। কিন্তু তিনি সেই গণতন্ত্র দেখে যেতে পারলেন না। বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার পেছনে খালেদা জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য বলে উল্লেখ করেন মির্জা আব্বাস। তিনি অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে বিগত সময়ে খালেদা জিয়াকে এমন কিছু করা হয়েছে, যাতে তিনি দ্রুত সময়ে পৃথিবী ত্যাগ করেন।
খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছে নব্বইয়ের ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারা
গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টায় নব্বইয়ের ডাকসুর ভিপি ও সেই সময়ে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমানের নেতত্বে নেতারা শেরে বাংলা নগরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কবরে ফাতেহা পাঠ এবং পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। নব্বইয়ের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতাদের মধ্যে হাবিবুর রহমান হাবিব, জহির উদ্দিন স্বপন, খায়রুল কবির খোকন, নাজিম উদ্দিন আলম, খন্দকার লুৎফর রহমান, নাজমুল হক প্রধান, মীর সরাফত আলী সপু প্রমুখ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
পরে আমান উল্লাহ আমান বলেন, আমরা নব্বইয়ের সর্বদলীয় ছাএ ঐক্যের নেতারা আজকে এখানে দেশনেত্রী আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। তার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছি। তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেছি।
আমান বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার যে আন্তরিকতা সেটা আজকে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ১৬ বছর শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, প্রহসনের বিচারে তাকে জেলে পাঠিয়েছে, জেলে নির্যাতন করা হয়েছে, ন্যূনতম চিকিৎসা তাকে দেওয়া হয়নি। তাকে স্লো পয়েজিংয়ে মাধ্যমে হত্যার অপচেষ্টা করা হয়েছিল, সেই নির্যাতনের দায় আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা কখনো এড়াতে পারবে না। অবশ্যই শেখ হাসিনাকে জবাব দিতে হবে।
তিনি বলেন, আজকে কী প্রমাণ হয়েছে? তার জানাজায় যে-কোটি মানুষের উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন ঐক্যের প্রতীক, ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতীক, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন স্বাথীনতা-সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন মাদার অব ডেমোক্র্যাসি, গণতন্ত্রের মা।
ভোরের আকাশ/এসএইচ