স্থানীয় সরকার নির্বাচন
বড় চ্যালেঞ্জে বিএনপি

*অক্টোবর থেকে ইউপি নির্বাচনের যাত্রা শুরু
*আগস্টেই তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা
*সুযোগ থাকছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদেরও অংশ নেওয়ার
*একাধিক প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা ক্ষমতাসীন দলের
*একক প্রার্থী থাকছে বিরোধী দলের
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনী উৎসব শুরু হতে যাচ্ছে। তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে আগস্ট মাসেইÑ এমনটাই নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় কোনো প্রতীক থাকছে না। ফলে এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) দেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতা-সমর্থকরা অংশ নিতে পারছেন। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারছেন। এমনকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সমর্থকদেরও প্রার্থী হতে কোনো বাধা থাকছে না বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে দলীয় প্রতীক তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও, রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি বিএনপির জন্য একটি জটিল সমীকরণ তৈরি করেছেÑএমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা।
তাদের অভিমত, তৃণমূলের ঐক্য বজায় রাখা এবং ভোটের মাঠে বিজয় নিশ্চিত করা এই দুই ফ্রন্টেই এখন বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষার মুখে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে ধারণা করছেন বিশিষ্টজনরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় প্রতীক না থাকার ফলে সবচেয়ে বড় যে সংকটটি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা হলো একই এলাকায় দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতার প্রার্থী হওয়া। যেহেতু কেন্দ্রীয়ভাবে কাউকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক দেওয়া হচ্ছে না, তাই তৃণমূলের অনেক নেতাই নিজেকে যোগ্য মনে করে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। এতে করে সরকারি দলের ভোটব্যাংক একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা করা তখন কঠিন হয়ে পড়বে, কারণ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাউকে ‘বিদ্রোহী’ ঘোষণা করার সুযোগ নেই। ফলে ভোটের বিভাজনের কারণে পরাজয়ের আশঙ্কা থাকছে বেশি।
তবে এক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী দল। ইউপি থেকে শুরু করে উপজেলা, পৌরসভা-সিটি করপোরেশনসহÑসর্বত্রই একক প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে বলে দলটির বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
এ নির্বাচনে প্রভাবশালী অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং পর্দার আড়ালে থাকা বিরোধী জোটের সমর্থিত প্রার্থীরা শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারেন। দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব ও জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকায়, সরকারি দলের প্রার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রিয় ব্যক্তিদের কাছে পরাজিত হতে পারেন। এছাড়া বিরোধী শিবির এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ‘নির্দলীয়’ মোড়কে তাদের প্রার্থীদের জয়ী করার কৌশল নিতে পারে, যা বিএনপির জন্য বড় চাপের কারণ হবেÑএমনটাই ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের জন্য এই নির্বাচনটি এক বড় পরীক্ষা। প্রতীকহীন নির্বাচনে মাঠ পর্যায়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দল সমর্থিত একক প্রার্থী নিশ্চিত করা তাদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। যদি অধিকাংশ এলাকায় দল-সমর্থিত প্রার্থী পরাজিত হন এবং ‘বিদ্রোহী’ বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন, তবে তা সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের জন্য তৃণমূলের এই ফল জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘একক প্রার্থী’ মাঠে রাখা। ক্ষমতাসীন দল ও বড় দল হওয়ায় প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও সিটিতে বিএনপির একাধিক যোগ্য ও শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছে। যোগ্যদের মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করা এবং অন্যদের ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দূরে রাখাই ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিলম্বে হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পথে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিচ্ছে এটা ইতিবাচক। যদিও আরও আগেই স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভালো হতো। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন করে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা ক্ষমতাসীন দল বিএনপির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, আমি মনে করি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পথযাত্রা শুরু হওয়া উচিত। অন্যান্য পর্যায়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুধু ইউনিয়ন পর্যায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত রয়েছে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমান বাস্তবতা, সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেরই মেয়াদ পার হয়ে গেছে, কোনো কোনোগুলোতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রশাসকও বসানো হয়েছে এবং নতুন সরকার ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তবে সাংবিধানিক ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্তৃত্বে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি।
স্থানীয় নির্বাচনে দলের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত দলীয় ফোরামের কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে স্থানীয় নেতারা নির্বাচনে অংশ নেবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, বিএনপি সবসময় নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল। নির্বাচনের জন্য বিএনপির আলাদা করে প্রস্তুতি নিতে হয় না। তারপরও ইসি স্থানীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে এ বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিলে আমরা সেই সিদ্ধান্ত দলীয়ভাবে বাস্তবায়ন করব।
সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক দীর্ঘদিন পরে হয়েছে। সাংগঠনিক বিষয়েই মূলত আলোচনা হয়েছে; অন্যান্য বিষয়ও ছিল। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ফলে দলগত প্রস্তুতির জন্য সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের বরাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রাথমিক পথরেখা প্রণয়ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য পৃথক রোডম্যাপ করা হয়েছে। চলতি মাসের শেষের দিকে এগুলো চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা যেতে পারে। আগস্টে তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবরই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আর নির্বাচন শুরু হওয়ার পর ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন সম্পন্ন হবে।
নির্বাচন প্রস্তুতির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নির্বাচন যদি অক্টোবর থেকে হয়, বা নভেম্বর-ডিসেম্বর যখন হোক, আমরা অক্টোবর ধরে কাজ আগাচ্ছি। অক্টোবরে হলে এর ৪৫ দিন আগে শিডিউল ঘোষণা করা হবে। আমরা মূলত অক্টোবর ধরেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
ভোরের আকাশ/এনএস