শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

আপসহীন নেত্রীর বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি

মাজাহারুল ইসলাম

প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:০১ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী  বেগম খালেদা জিয়া। জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন জননন্দিত দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। যার জীবনের ইতিহাসে জড়িয়েছে মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার-কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণসহ নানা ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত। খালেদা জিয়াও এমন জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন। উপরন্তু সহ্য করেছেন স্বামী ও সন্তান হারানোর গভীর শোক আর দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা। সেই মহাকাব্যিক রাজনৈতিক ইতিহাসের ব্যক্তিত্ব জীবনের সমাপ্তি ঘটলো গতকাল। সামরিক শাসনের অন্ধকার অধ্যায় থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে দেশকে ফিরিয়ে আনার লড়াই, বিগত প্রায় দেড় দশকের বিরামহীন রাজনৈতিক চাপ, কারাবরণ, অসুস্থতা, সবকিছুর মধ্যেও তিনি ছিলেন অনমনীয়, দৃঢ়, আত্মমর্যাদাশীল ও আপসহীন। বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের একটি অসামান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা বাংলাদেশ তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ। বিগত দশকজুড়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার যে আত্মত্যাগ, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাস তাকে মনে রাখবে এক সাহসী ও আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। আমরা যদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে মূল্যায়ন করতে চাই তাহলে যে বিষয়গুলো সামনে আসে, তা হলো সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা অর্থাৎ এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন এবং সংবিধানের ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ঘটানো।

দ্বিতীয় বিষয় হলো, বহুদলীয় রাজনীতির পুনরুজ্জীবন, অর্থাৎ সামরিক শাসন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক পুনর্গঠন, সংসদীয় বিতর্ক ও বিরোধী রাজনীতির জায়গা তৈরি করতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বলা যায়, বাংলাদেশ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই মূলত একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক একটি ধারা প্রচলনে মৌলিক ভূমিকা পালন করেন। তার অন্য অনেক অবদানের মধ্যে তৃতীয় যে বিষয়টি এখানে নিয়ে আসা জরুরি, সেটি হলো বাংলাদেশের নারীশিক্ষায় তার অসামান্য অবদান। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে বাংলাদেশের নারীশিক্ষায় যে গণজাগরণ, তার স্বীকৃতি বেগম খালেদা জিয়াকে দিতেই হবে। তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে স্কলারশিপ বা বৃত্তি চালু করেন। বিশেষ করে গ্রামীণ মেয়েদের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেন, যা আমাদের নারীশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পরবর্তী সময়ে।

চতুর্থত, খালেদা জিয়াকে দেখা হয় বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের একটি প্রতীক হিসেবে। বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে দৃশ্যমান করেন- যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে আমাদের যখন জাতি হিসেবে একতাবদ্ধ থাকার কথা ছিল, সেই সময় আমরা নানাভাবে বিভাজিত একটি সময় পার করছি। যখন আমরা ধারণা করছিলাম খালেদা জিয়া তার সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের একটি ঐক্যে নিয়ে আসবে সেই সময়টাতে তিনি চলে গেলেন অসীমের ডাকে।

এক নজরে খালেদা জিয়া : জন্ম ও বিয়ে : খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালে। বাবা ফেনীর পরশুরামের ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে খালেদা তৃতীয়। ছোটবেলায় তার ডাক নাম ছিল পুতুল। ইস্কান্দার মজুমদার ব্যবসার উন্নতির জন্য যান দিনাজপুরে। ১৯৪৭ সালের পর তিনি দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৩৭ সালের ১৯ মার্চ তার বিয়ে হয় পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার তৈয়বা মজুমদারের সঙ্গে।

এদিকে, জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন হিসেবে দিনাজপুরে থাকার সময় খালেদার সঙ্গে বিয়ে হয়। ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় খালেদার বাবার বাড়িতে বিয়ের আয়োজন হয়। খালেদা জিয়ার শ্বশুর তখন বিয়ের অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি, কারণ তিনি করাচিতে ছিলেন। খালেদার মা ছিলেন জিয়াউর রহমানের মায়ের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। ১৯৮১ সালের মে মাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। স্বামী হারানোর বেদনার মধ্যে বিএনপির হাল ধরতে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। সেখানেও অনেক প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয় তাকে। শুরু হয় রাজনৈতিক সংগ্রামের জীবন।

জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি ও খালেদা জিয়া  : ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে উৎখাত করে সামরিক আইন জারি করেন এইচ এম এরশাদ। নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে ঘোষণা করে প্রকারান্তরে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। তার এই অবস্থান তাৎক্ষণিক বিএনপিকে দুর্বল করে দেয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি যেন দিশাহারা হয়ে পড়ে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পাশাপাশি দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। নতুন বাস্তবতার পটভূমিতে দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।

তবে সদস্যপদ ও সমর্থকের সংখ্যা বিবেচনায় ১৯৮১ সালের মধ্যে বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। সদস্যদের মধ্যে বহুমুখী মতাদর্শের কারণে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মূলনীতির চেয়ে এমন একজন নেতা প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যিনি জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি হবেন এবং স্বাধীনভাবে দলকে নেতৃত্ব দেবেন। বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ আবদুস সাত্তার দলকে কাক্সিক্ষত পথে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হলে নির্ভরযোগ্য একজন নেতার প্রয়োজন দেখা দেয় বিএনপিতে।

এদিকে, স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চৌকশ সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া সাধারণ বাংলাদেশি গৃহবধূর মতো পরিমিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে নিয়েই বেশিরভাগ সময় ব্যয় করছিলেন। এমনকি তার স্বামী যখন ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন, তখনও খালেদা জিয়া নিজেকে রাজনীতিতে বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সম্পৃক্ত করেননি। তবে ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে প্রটোকল অনুযায়ী তাকে আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখতে হয়েছে। বড় ছেলে তারেক রহমান ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর এবং ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন।

বিএনপিতে যোগদান ও নিজের আত্মপ্রকাশ : জিয়ার অনুসারী ও কর্মীদের কাছে খালেদা জিয়ার পরিচিতি কম থাকলেও দলের নেতৃস্থানীয়দের কাছে তিনি সুবিদিত ছিলেন। তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য তিনিই হতে পারেন নির্ভরযোগ্য কান্ডারি। বছরের পর বছর এই মূল্যায়ন সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। তার নেতৃত্বে দলটি ভেতরের ও বাইরের সব বাধা-বিপত্তি উতরে টিকে আছে। অনেক হিসাব-নিকাশের পর খালেদা জিয়াকে চূড়ান্তভাবে পছন্দ করা হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থ্যানে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দলের ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া।  দলীয় নেতৃত্ব গ্রহণের পর খালেদা জিয়াকে পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের কবল থেকে মুক্তির জন্য আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। দলীয় নেতৃত্ব ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে ৩৫ বছরে তিনি কেবল গণতন্ত্র সুরক্ষার জন্যই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন না, বরং ঝুঁকির মধ্যেও সোচ্চার ছিলেন আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। এভাবেই, ‘খালেদা জিয়া’ ও ‘বিএনপি’ সমার্থক হয়ে উঠে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব : খালেদা জিয়া ১৯৮৩ সালের মার্চে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ওই বছরের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ হলে খালেদা জিয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। বিএনপির সাংগঠনিক বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে দলের হাল ধরে ১৯৮৩ সালে তিনি ৭ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করেন। শুরু করেন এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন। ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে এই ঐক্যজোটের মাধ্যমে তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলের সঙ্গে যৌথভাবে আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ছেদ পড়ে।

‘আপসহীন’ নেত্রীর খেতাব : নির্বাচন নিয়ে বিরোধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দলে ভাগ হয়। শেখ হাসিনার নের্তৃত্বে ৮ দল ও জামায়াত ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে যায়। এরপর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, বাম পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট থাকে রাজপথে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ আন্দোলন শুরু করেন। সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হন এরশাদ। আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে বেরিয়ে এলে পুনরায় শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। রাজপথে ৮ বছর একটানা আপসহীন সংগ্রামে ১৯৯০ সালে ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে দেশবাসীর কাছে ‘আপসহীন’ নেত্রীর খেতাব পান খালেদা জিয়া।

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী : ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য আন্দোলনের ডাক দিয়ে জনগণকে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনতে নেতৃত্ব দেন। অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হন তিনি।  

‘এক-এগারো’র পটপরিবর্তন ও ক্ষমতা হাতছাড়া  : ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। তবে অষ্টম সংসদের মেয়াদপূর্তির পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিরোধে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ‘এক-এগারো’ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে; খালেদা জিয়া ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়েন। এ সময় তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু জুলুম-নির্যাতনের মুখে তিনি দেশ ছেড়ে যাননি। ২০০৭ সালে ৩ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক বছর কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তিলাভ করেন। এর আগে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনের পরের বছর জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে টানা ৯৩ দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘেরাওয়ে ছিলেন খালেদা জিয়া। পরের বছরও তাকে একইভাবে ঘেরাওয়ের মধ্যে থাকতে হয়।

নিঃসঙ্গ ও যোগাযোগহীন জীবনযাপনে বাধ্য : ৩৫ বছরের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া সবসময় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য সোচ্চার ও সংগ্রামমুখর ছিলেন। তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তার সভা ও মোটর শোভাযাত্রা বিরোধীদের আক্রমণের শিকার হয়। তাকে নিঃসঙ্গ ও যোগাযোগহীন জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ২৩ সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং কোনোটিতেই পরাজিত হননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হবার কারণে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েন। খালেদা জিয়ার অতীত নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি বগুড়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামের আসন থেকে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এছাড়া ১৯৯১ সালে ঢাকার একটি আসন থেকে এবং ২০০১ সালে খুলনার একটি আসন থেকে ভোটে লড়াই করেন।

‘দেশনেত্রী’ সম্বোধন : ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের ১৪ দিন আগে তিনি সারাদেশে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেন। যখন তিনি নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতেন, তখন প্রাণপ্রাচুর্যে বলীয়ান হয়ে উঠতেন। রাত তিনটায়ও নির্বাচনী সভায় ভাষণ দিয়েছেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকতেন এবং একবার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে কঠোরভাবে তা মেনে চলতেন। বিশ্বের ১০০ জন ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় ফোর্বস ম্যাগাজিন খালেদা জিয়াকে ২০০৪ সালে ১৪তম, ২০০৫ সালে ২৯তম এবং ২০০৬ সালে ৩৩তম স্থান দেয়। ২০১১ সালের ২৪ মে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি সিনেটে গণতন্ত্রের যোদ্ধা (ফাইটার ফর ডেমোক্র্যাসি) হিসেবে সম্মানিত হন। দলীয় কর্মী ও সমর্থকরা তাকে সম্বোধন করেন ‘দেশনেত্রী’ বলে।

কারাবাস : ২০১০ সালে শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে উৎখাত হন খালেদা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি সংসদের বাইরে চলে যায়, রাজপথই হয় দলটির ঠিকানা। তবে বছরের পর বছর আন্দোলন চালিয়েও আওয়ামী লীগকে ক্ষতা থেকে হঠাতে পারেনি খালেদা জিয়ার দল। ২০১৫ সালের শুরুতে টানা তিন মাসের হরতাল অবরোধে পেট্রোল বোমার আগুন সন্ত্রাসের জন্য বিএনপিকে দায়ী করে তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার। ওই বছরই খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মৃত্যু হয়, যা ছিল তার জন্য বড় ধাক্কা। সেই বৈরী সময়ে বড় ছেলে তারেকও দেশে ফিরতে পারেননি। দেশে একাকী সেই কঠিন সময় পাড়ি দিতে হয় বিএনপি চেয়ারপারসনকে। রাজনৈতিকভাবে সেই চাপের সময়ে খালেদা জিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় একের পর এক মামলা।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে তাকে কারাগারে পাঠায় আদালত। এরপর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাতেও তার সাজার রায় হয়। মহাবিপদে পড়া বিএনপি লন্ডনে থাকা তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়। খালেদা জিয়ার মুক্তি আর চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি বার বার প্রত্যাখ্যাত হতে থাকে। এর মধ্যেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে যায় বিএনপি। প্রশ্নদ্ধি সেই নির্বাচনে জয় মেলে মাত্র পাঁচ আসনে। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ অনেকটা আকস্মিকভাবেই আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত করে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয় খালেদা জিয়াকে। শর্ত অনুযায়ী তাকে থাকতে হয় গুলশানের বাসায়, বিদেশে যাওয়ার অনুমতিও তার ছিল না। ফলে মুক্তি পেয়েও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন একপ্রকার বন্দি জীবন কাটতে থাকে বিএনপি চেয়ারপারসনের। এর মধ্যে কয়েকবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

আর ফেরা হল না :  ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ওই বছর ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। পরে উচ্চ আদালত তাকে দুই মামলা থেকেও খালাস দেয়। ফলে তার দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হওয়ার কলঙ্ক ঘোচে। কিন্তু নানা ধরনের অসুস্থতা তাকে ততদিনে অনেকটাই কাবু করে ফেলেছে। মুক্তি মিললেও দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মূসচিতে তিনি আর সশরীরে অংশ নেননি। এর মধ্যে চলতি বছর জানুয়ারিতে লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আসেন খালেদা জিয়া। বহু বছর পর বড় ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে তার দেখা হয়। দেশে ফেরার পর কিছু দিন ভালোই ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। 

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি প্রর্থী ঘোষণা করলে জানানো হয়, বগুড়া-৩, ফেনী-১ ও দিনাজপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচন করবেন খালেদা জিয়া। সবশেষ গত ২১ নভেম্বর ঢাকায় সেনা সদরের সেনাকুঞ্জে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল খালেদা জিয়াকে। তার দুই দিনের মাথায় তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়ার কথা ভাবা হলেও স্বাস্থ্য পরিস্থিতির কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। এরমধ্যে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসন ভেঙে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। সেদিনই তিনি হাসপাতালে যান মাকে দেখতে। সোমবার ছিল নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। বিএনপির অন্যান্য প্রার্থীর সঙ্গে খালেদা জিয়ার নামেও তিন আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। তার পরদিনই গতকাল তার মৃত্যুর খবর আসে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশনেত্রী আমাদের গণতন্ত্রের মাতা, আমাদের জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রাণের স্পন্দন। বেগম খালেদা জিয়া সারাটা জীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, সংগ্রাম করেছেন, অনেক অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করেছেন, কারাবাস করেছেন। কিন্তু কখনোই গণতন্ত্রের অভিযাত্রা থেকে সরে যাননি, কখনো আপস করেননি। ‘এজন্যই দেশনেত্রীকে নিয়ে আমরা এত গর্ব করতে পারি। গণতন্ত্রীরা বুক টান করে কথা বলতে পারে।’

মনে রেখ ইতিহাস : রাজনীতির বিশ্লেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতির শীর্ষ আসনে উঠে আসা খালেদা জিয়া দেশের সকল রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে ‘গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের প্রতীকে’ পরিণত হয়েছিলেন। ‘খালেদা জিয়ার মতো এমন লড়াকু চরিত্র পুরো বাংলাদেশে শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়া এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বিরল।’

মাহবুবুর রহমানের মূল্যায়নে, সরকারপ্রধানের দায়িত্বে ‘অনেকগুলো যুগান্তকারী পদক্ষেপ’ নিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ‘১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে প্রধানত নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাছাড়া অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি যে ভ্যাট চালু করলেন, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ভিত্তি দেওয়ার জন্য সংসদীয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন, সেটাও তিনিই করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক ভিত্তিও তিনি দিয়েছেন।’

খালেদা জিয়া ‘ইতিহাসে তথ্য সৃষ্টি করেছেন’ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৪৭ বছরের মধ্যে ৪১ বছর টানা চেয়ারম্যান পদে থেকে, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বেনজির ভুট্টোর পরে মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হয়ে। তিনি সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়েছেন জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসন উৎখাতে অবিচল আপসহীন থেকে এবং রাজনীতিবিদ হিসেবে ব্যক্তিগত সৌজন্যমূলক আচার আচরণ ও মিতবাক হওয়ার কারণে। খালেদা জিয়াকে নিয়ে শ্রদ্ধা আর তার সমালোচনার বাইরেও রয়েছে একটি গভীর সত্য। তার জীবনগাঁথা অনেকটাই যেন বাংলাদেশের নিজের ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি, যে ইতিহাস অস্থিরতার বিপরীতে দৃঢ়তার বৈপরীত্যে ভরা, স্বীকৃতি ও আশার লড়াইয়ের উপাখ্যান। কারও কাছে তিনি গণতন্ত্রের অবিচল প্রতীক।

ইতিহাসের পাতায় তিনি সেই নারী হয়ে থাকবেন, যিনি দিনাজপুরের এক শান্ত ঘরোয়া জীবন থেকে উঠে এসে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন; আর সেখানে ছিলেন অনেকের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সময়। খালেদা জিয়া পেছনে রেখে গেলেন সেই দেশকে, যে দেশের জন্য তিনি লড়ে গেছেন। তিনি রেখে গেলেন এক রাজনৈতিক দলকে, যে দলকে তিনি প্রায় ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আর রেখে গেলেন সাহস ও বৈপরীত্যে গড়া এক উত্তরাধিকার, যা নিয়ে বিতর্ক হবে, নতুন নতুন বয়ান তৈরি হবে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম তা স্মরণ করবে।

ভোরের আকাশ/এসএইচ

খালেদা জিয়াআপসহীন নেত্রী

শেয়ার করুন: