অন্তিম শয়ানে খালেদা জিয়া
জিয়ার কবরের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

কোটি মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা আর গভীর শ্রদ্ধায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে গতকাল বুধবার বিকেল পাঁচটার কিছু আগে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। খালেদা জিয়ার কবরে সবার আগে নামেন বড় ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নিজ হাতে তিনি তার মাকে কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করেন। অকৃত্রিম ভালোবাসায় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠা গণতন্ত্রের অভিভাবক খালেদা জিয়া মহাকালের অনন্ত যাত্রায় পাড়ি জমালেন। চিরদিনের জন্য অন্তিম শয়নে আপোসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দাফনের পর তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করেছে সশস্ত্র বাহিনী। দাফন শেষে তার উদ্দেশ্যে এক মিনিটের নিরবতা পালন করা হবে এবং শ্রদ্ধা জানানো হয়। দাফনের প্রক্রিয়া চলার সময় তারেক রহমান, স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, ছোটভাই আরাফাত রহমানের স্ত্রী শামিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা, বিএনপির নেতা-কর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা দাঁড়িয়ে শোক ও শ্রদ্ধা জানান।
নামাজে জানাজা
এর আগে জাতীয় সংসদ ভবন ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে খালেদা জিয়ার জানাজায় সম্পন্ন হয়। বেলা ৩টা বেজে ৩ মিনিটে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা শুরু হয়ে বেলা ৩টা বেজে ৫ মিনিটে জানাজা সম্পন্ন হয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক খালেদা জিয়ার জানাজা পড়ান। জানাজা শেষে সংসদ ভবন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় পতাকায় মোড়া লাশবাহী গাড়িতে করে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বিশেষ একটি বাহনে করে খালেদা জিয়ার মরদেহ সাবেক রাষ্ট্রপতি ও তার স্বামী জিয়াউর রহমানের সমাধির কাছে নেওয়া হয়। সমাধির কাছাকাছি নেওয়ার পর খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী কফিন কাঁধে নিয়ে যান সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার পর জিয়াউর রহমানের পাশে খালেদা জিয়াকে দাফন করা হয়।
জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের প্রতিনিধি, বিদেশি অতিথি, বিএনপির শীর্ষ নেতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কূটনীতিক, বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আলেম-ওলামাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন। জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের আশপাশ, বিজয় সরণি, খামার বাড়ি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুর ও আগারগাঁও পর্যন্ত এলাকা জানাজার লাইন ছাড়িয়ে যায়, লোকারণ্য হয়ে ওঠে জনসমূদ্র।
খালেদা জিয়াকে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভূটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের স্পিকারসহ ৩২ দেশের রাষ্ট্রদূতের শেষ শ্রদ্ধা: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভূটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকারও তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধা নিবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ এবং ভূটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিয়নপো ডি. এন. ধুংগেল। এ ছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শেষশ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিদেশি অতিথিরা বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।
খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন ঘিরে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ছাড়াও ৫০ প্লাটুন আনসার ও টিডিপি মোতায়েন
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামলেও কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে দাফনপূর্ব আনুষ্ঠানিকতা। জানাজাস্থলের শৃঙ্খলা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ছাড়াও ৫০ প্লাটু বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) দেড় হাজার সদস্য মোতায়েন করা হূ। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপপরিচালক ও গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. আশিকউজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
সদর দপ্তরের অপারেশন পরিদপ্তর সূত্র জানায়, জানাজা উপলক্ষে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূর্বপরিকল্পিত ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এর অংশ হিসেবে বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের মোট ১ হাজার ৫শ’ সদস্যকে দায়িত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তার দায়িত্বের আওতায় ৩শ’ জন আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য, ১ হাজার অঙ্গীভূত আনসার এবং ২শ’ নগর প্রতিরক্ষা দলের (টিডিপি) সদস্য মোতায়েন করা হয়। তারা জানাজাস্থল, আশপাশের সড়ক, প্রবেশ ও বহির্গমন পথ এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করেন, পুলিশের পাশাপাশি এপিবিএন, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিল।
ডিএমপির তরফ থেকে বলা হয়, ১০ হাজারেরও বেশি পুলিশ, এপিবিএন এবং অন্যান্য যারা সিকিউরিটি এজেন্সির অফিসার আছেন, তারা থাকছেন। কিছু কিছু জায়গায় সেনাবাহিনীরও তরফ থেকে একটা ব্যবস্থাপনায় রয়েছে।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, জানাজাস্থল ও আশপাশে রাত থেকে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রাখা হয়। পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন। জিয়া উদ্যান সড়কে জনসাধারণের প্রবেশ নিরুৎসাহিত করা হয়। সকাল থেকে দাফন পর্যন্ত জানাজা ও দাফনকাজের এলাকায় ব্যাপক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জানাজা
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা দেশ ও মুসলিম বিশ্বে বৃহত্তম। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং গোটা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের এই বৃহৎ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন লাখ লাখ মানুষ। কোনো মুসলিম নারীর এটিই সর্ববৃহৎ জানাজা। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামের জন্য তিনি আপোসহীন দেশনেত্রী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের জন্য গণতন্ত্রের মাতা ও জাতীয় নেত্রী হিসেবে জনগনের ভালবাসায় তিনি সম্মানিত হন।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও লাখ লাখ নেতা-কর্মী জানাজায় অংশ নেন। এছাড়া বিদেশি কূটনৈতিকরা এই জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। জানাজায় ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররমের খতিব। শুধু জাতীয় সংসদ এলাকা ও মানিক মিয়া এভিনিউয়েই নয়, বিজয় সরণি, খামার বাড়ি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুর ও আগারগাঁও এবং আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মানুষ অবস্থান নেয় জানাজায় অংশ নেন। সেখানে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ইতিহাসে কোনো মুসলিম নারীর সর্ববৃহৎ জানাজা। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের বড় জানাজা।
দেশবাসীর প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো একনজর দেখা আর জানাজায় অংশ নেওয়ার ব্যাকুলতা নিয়ে ঢাকার পথে সর্বস্তরের লাখো মানুষ। বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চ, যে যেভাবে পারছেন, মঙ্গলবার রাত থেকেই রাজধানীর পথ ধরেছেন। গতকাল বুধবার সকাল হতে না হতেই সেই জনস্রোত মিশতে শুরু করে মানিক মিয়া এভিনিউতে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে ঢাকামুখী এই যাত্রা শুরু হয়। মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে এই স্রোত আরও জোরালো হয়। রাতে ভোলা, বরিশাল ও চাঁদপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের নেতাকর্মীরা নদীপথে সদরঘাটে এসে পৌঁছান। একই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ট্রেন ও বাসগুলোতেও ছিল তুলনামূলক ভিড়। সবার গন্তব্য একটাই, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা। তীব্র শীত উপেক্ষা করে মঙ্গলবার গভীর রাত থেকেই মানিক মিয়া এভিনিউ ও এর আশপাশের এলাকায় জড়ো হন নেতাকর্মীরা। সকাল থেকেই লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে সংসদ ভবন চত্বর ও এর আশপাশের সড়ক। অনেকে ফুটপাতেই রাত কাটিয়েছেন প্রিয় নেত্রীর জানাজায় সামনের কাতারে থাকার আশায়।বাষট্টি বছর বয়সী কৃষক সাত্তার মিয়ার সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। লাঠিতে ভর দিয়ে তিনি সুদূর বগুড়া থেকে মঙ্গলবার রাতেই ঢাকায় পৌঁছান। থাকবার জায়গা না থাকায় তীব্র শীত উপেক্ষা করে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন সংসদ ভবনের সামনের রাস্তায়। ভেজা চোখে তিনি বলছিলেন, ‘ম্যাডাম হামাগের মা। ওনারে শেষবারের মতো দেখমু না, তা কি হয়? শরীর চলে না, তাও মনের জোরে আসছি। ওনার জানাজায় শরিক হতে পারলেই শান্তি।’
সরেজমিনে দেখা যায়, সমবেত মানুষের চোখেমুখে গভীর শোকের ছায়া। দলীয় কার্যালয় ছাড়াও সড়কগুলোতে উড়ছে কালো পতাকা। ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো থেকে গতকাল ভোর থেকেই আসেন নেতাকর্মীরা। তাছাড়া দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ শেষবারের মত শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়ার পথ ধরেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে মানিক মিয়া এভিনিউ অভিমুখে ছুটছে লাখো মানুষ। হাউমাউ করে কাঁদছে অনেকেই। প্রিয় নেত্রীর জানাজায় অংশ নিতে ও শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের স্রোত ও ঢল নেমেছে।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার ভোর ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল (ইন্নানিল্লাহে....রাজিউন) করেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে হৃদরোগ, ফুসফুস, লিভার, কিডনি ও ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে শোকে স্তব্ধ বাংলাদেশ।
ভোরের আকাশ/এসএইচ