স্থানীয় নির্বাচনের হাওয়া

*মাঠে সম্ভাব্য প্রার্থীরা
*চলছে ফেসবুক প্রচারণাও
*কৌশলে জনসংযোগ
দেশব্যাপী এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন-এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, গ্রাম থেকে শহর-সর্বত্রই এখন বইছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের হাওয়া। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার অলিগলি, সবখানেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের আনাগোনা এবং ভোটারদের বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে। চলছে ফেসবুক প্রচারণায়ও।
এলাকার উন্নয়ন ও জণগণের সেবক হওয়ার ইচ্ছা থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিয়মিত গণসংযোগ, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম করেছেন। এলাকাবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন নানা উন্নয়নের। দোয়া চেয়ে, শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রতিশ্রুতির লিফলেট দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন নিজ নিজ ইউনিয়নের ভোটারের।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং কিছু পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
কমিশনের তোড়জোড় ও নির্বাচনী রোডম্যাপ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাসের মধ্যেই প্রথম ধাপের তশসিল ঘোষণার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আমরা একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করছি। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র: সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকার জনগনকে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার জন্য কেউ বড় পর্দা, আবার কেউ বড় টিভির আয়োজন করে দিয়েছেন। কোন কোন সম্ভাব্য প্রার্থী ছোট ছোট লিফলেট বিতরণ করছেন ভোটারদের মাঝে। গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে ঘুরে সকলের সাথে কুশল বিনিময় করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। বিশেষ করে তরুণ ও নতুন প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলের রাজনীতিকে চাঙা করে, তাই অধিকাংশ দলই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে চায়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোন দলীয় প্রতীক থাকছে না। কাজেই চাইলেই যে কেউ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। তাই রাজনৈতিক সমীকরণ ও দলের অবস্থান স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও চলছে নানা সমীকরণ।
মাঠ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে সরকারী দল বিএনপি ও অংগ সংগঠনের একাধীক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছে। অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী কৌশলে আগাম প্রচারণা করছেন।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলার ধলগ্রাম ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী মেহেদি হাসান খাজার সঙ্গে। তিনি পেশায় একজন সাংবাদিক ও বিএনপির অংঙ্গ-সংগঠন ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বয়সে তরুণ হলেও নিজ এলাকায় খুবই জনপ্রিয়।
সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী মেহেদি হাসান খাজা বলেন, এলাকার জনগনের ভালোবাসার কারণেই আমি ইউপি নির্বাচনে অংশ নিতে চাই। তরুণ সমাজকে ধ্বংশের হাত থেকে রক্ষা করাই আমার প্রথম মিশন। ইতিমধ্যে এলাকার নবীন- প্রবীন সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছি। সকলের কাছে থেকে উৎসাহ-অনুপ্রেরণা পাচ্ছি। এলাকায় মানুষের মাঝে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকুক-এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, আমি নির্বাচিত হলে, জনগণের স্বার্থে সুন্দর ও মাদকমুক্ত ইউনিয়ন উপহার দিব ইনশোআল্লাহ।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতি ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী সোহেল সিকদারের সঙ্গে। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষানুরাগী। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিয়মিত গণসংযোগ, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম করেছেন। এলাকাবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন নানা উন্নয়নের। ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির পাশাপাশি এলাকার জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
সোহেল সিকদার বলেন, জনগণের সুখ-দুখের পাশে থেকে এলাকায় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করছেন। স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দিরসহ রাস্তা-ঘাট সংস্কারের কাজ করছেন।
তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নকে একটি মডেল ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমি নির্বাচিত হলে সুন্দর-সুশৃঙ্খল ও মাদকমুক্ত ইউনিয়ন উপহার দেওয়ার চেষ্ঠা করবো-ইনশোল্লাহ।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানিসাফা ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী এইচ এম আল-আমিন-এর সঙ্গে। তিনি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত পাশাপাশি একজন শিক্ষানুরাগী। তিনি ধানিসাফা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ও এলাকার উন্নয়নেও অবদান রয়েছে তার।
এইচ এম আল-আমিন বলেন, আমি এই এলাকার সন্তান। এলাকার জনগনের সঙ্গে আছি, থাকব। ধানিসাফা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। আমি গণসংযোগ করে যাচ্ছি। প্রতিটি মানুষের মাঝে আমার করণীয় তুলে ধরে লিফলেট বিতরণ করছি।
ইসি মনে করছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশি থাকে এবং অতীতে এ নির্বাচন ঘিরে সংঘাত-সহিংসতার নজির রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ গত সোমবার নির্বাচন ভবনে রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অনেক বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন। সীমানা নির্ধারণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত। তাই সরকারের সঙ্গে লিখিত-অলিখিত আলোচনা ছাড়া ইসির পক্ষে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া সংগত হবে না। তবে ইসি অক্টোবরকে সামনে রেখে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
ধাপে ধাপে ভোট আয়োজন করে প্রতিটি ধাপের অভিজ্ঞতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপের নিরাপত্তা পরিকল্পনা করার চিন্তা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের দায়িত্বে রেখে নির্বাচন পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
একই অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব ধরনের প্রাক-প্রস্তুতি কমিশন নিয়েছে। নির্বাচনী আচরণবিধির খসড়া ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ স্থানীয় সরকার বিভাগ করে থাকে। এটি যাতে দ্রুত হয়, সে জন্য ইসি সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, আগামী মাসের দ্বিতীয়ার্ধে তপশিল ঘোষণা করে অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আর নির্বাচন শুরু হওয়ার পর ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন সম্পন্ন হবে।
তথ্য-সম্প্রচার ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান আরো জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রাথমিক পথরেখা প্রণয়ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য পৃথক রোডম্যাপ করা হয়েছে। চলতি মাসের শেষের দিকে এগুলো চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা যেতে পারে। আগামী ৫ আগস্টের আগেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে বলে জানান উপদেষ্টা।
ভোরের আকাশ/এনএস