পুরুষদের ভুঁড়ি কেন বিপজ্জনক হতে পারে

একটা সময় ছিল যখন পুরুষদের ভুঁড়ি বা মেদভুঁড়িকে ‘বাবুয়ানি’ বা সচ্ছলতার প্রতীক মনে করা হতো। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। চিকিৎসকদের মতে, শরীরে অন্য যেকোনো স্থানে চর্বি জমার চেয়ে পেটে চর্বি জমা বা ভুঁড়ি হওয়া সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।
পেটের এই চর্বিকে বলা হয় ‘ভিসারাল ফ্যাট’ , যা চামড়ার নিচে নয়, বরং পেটের ভেতরের লিভার, প্যানক্রিয়াস ও অন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর চারপাশে জমা হয়। পুরুষদের কোমরের মাপ যদি ৪০ ইঞ্চির বেশি হয়, তবে তা বিপদের বড় লক্ষণ। ভুঁড়ি বাড়ার কারণে পুরুষদের শরীরে যেসব মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি
পেটের চর্বি বা ভিসারাল ফ্যাট অত্যন্ত সক্রিয়। এটি ক্রমাগত ক্ষতিকর ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ‘সাইটোকাইনস’ নামক প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদান রক্তে ছড়াতে থাকে।
- কী ঘটে: এই উপাদানগুলো রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয় এবং রক্তনালীর ভেতরের দেয়াল সংকুচিত করে ফেলে। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ , হার্ট অ্যাটাক এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
২. টাইপ-২ ডায়াবেটিস
ভুঁড়ি বাড়ার সাথে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পেটের অতিরিক্ত চর্বি শরীরের ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি করে। অর্থাৎ, অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নির্গত হলেও শরীরের কোষগুলো তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে এবং পুরুষরা খুব দ্রুত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন।
৩. ফ্যাটি লিভার
পেটের অতিরিক্ত চর্বি সরাসরি লিভারে গিয়ে জমা হতে শুরু করে। এর ফলে লিভারের চারপাশ চর্বিতে ঢেকে যায়, যাকে ‘ফ্যাটি লিভার’ বলা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এটি ধরা না পড়লে পরবর্তীতে লিভারে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ, লিভার সিরোসিস এবং লিভার বিকল হওয়ার মতো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
৪. টেস্টোস্টেরন হরমোন হ্রাস ও যৌনক্ষমতা কমে যাওয়া
পুরুষদের ভুঁড়ি বাড়ার সাথে সাথে তাদের প্রধান পুরুষ হরমোন ‘টেস্টোস্টেরন’ -এর মাত্রা কমতে শুরু করে। পেটের চর্বি পুরুষ হরমোনকে নারী হরমোন ‘ইস্ট্রোজেন’-এ রূপান্তরিত করতে ভূমিকা রাখে। এর ফলে ক্লান্তি, পেশী দুর্বলতা, অবসাদ এবং লিবিডো বা যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
৫. স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ঘুমের ব্যাঘাত
মোটা সোটা ও ভুঁড়িযুক্ত পুরুষদের রাতে জোরে জোরে নাক ডাকার প্রবণতা বেশি থাকে। পেটের অতিরিক্ত চর্বি ফুসফুসের মধ্যচ্ছদা বা ডায়াফ্রামের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ করে শ্বাসনালী সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একে ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ বলে। এর কারণে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি হয় এবং দিনের বেলা প্রচণ্ড ক্লান্তি ও ঝিমুনি ভাব থাকে।
৬. ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি
একাধিক চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, মেদভুঁড়ির কারণে পুরুষদের শরীরে কোলন ক্যান্সার (বৃহদান্ত্রের ক্যান্সার), প্রোস্টেট ক্যান্সার এবং রেকটাল ক্যান্সারের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। চর্বি কোষ থেকে নিঃসৃত ক্ষতিকর হরমোন ও কেমিক্যাল শরীরের কোষগুলোর অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
৭. হাড়ের জোড়ায় বা বাতের ব্যথা
পেটে অতিরিক্ত ওজন বাড়ার কারণে শরীরের পুরো ভার গিয়ে পড়ে মেরুদণ্ড, কোমর এবং হাঁটুর জয়েন্টগুলোর ওপর। ফলে খুব কম বয়সেই হাড়ের ক্ষয়, কোমর ব্যথা এবং হাঁটুর তীব্র বাতের ব্যথা বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সমস্যায় পুরুষরা পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে যান।
ভুঁড়ি কমানোর ৩টি সোনালী নিয়ম:
- খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ:অতিরিক্ত শর্করা (ভাত, রুটি), মিষ্টি, কোমল পানীয় এবং ফাস্টফুড খাওয়া একেবারেই কমিয়ে দিন। ডায়েটে প্রোটিন, শাকসবজি ও ফাইবার যুক্ত খাবার বাড়ান।
- শারীরিক পরিশ্রম: সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট জোরে জোরে হাঁটা, দৌড়ানো বা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুম ও দুশ্চিন্তামুক্তি: দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম জরুরি। অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে ‘কর্টিসল’ হরমোন বাড়ে, যা পেটে চর্বি জমতে সাহায্য করে।
ভুঁড়ি কেবল আপনার শারীরিক সৌন্দর্য নষ্ট করে না, এটি ভেতরে ভেতরে আপনার আয়ুও কমিয়ে দিচ্ছে। তাই আজই সচেতন হোন, অলসতা কাটিয়ে পরিশ্রমী জীবনযাপন শুরু করুন।
ভোরের আকাশ/জেআ