স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে বয়সের সঙ্গে যা করবেন

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের শরীরে যেমন পরিবর্তন আসে, তেমনই প্রভাব পড়ে আমাদের মস্তিষ্কেও। অনেকেই বয়স চল্লিশ বা পঞ্চাশের কোঠায় পৌঁছালে ছোটখাটো বিষয় ভুলে যাওয়া, মনোযোগের অভাব কিংবা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বয়সজনিত কারণে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া এবং স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার এই ঝুঁকিকে ‘ডিমেনশিয়া’ বা ‘আলঝেইমার্স’ বলা হয়।
তবে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্সের (Neuroscience) মতে, সঠিক জীবনযাত্রা ও কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে বয়স বাড়লেও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধরে রাখা এবং বুদ্ধিকে তরুণ রাখা পুরোপুরি সম্ভব। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মস্তিষ্ককে আজীবন সচল, ধারালো ও সতেজ রাখার ৯টি কার্যকর পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. মস্তিষ্ককে নতুন চ্যালেঞ্জ দিন (Brain Workouts)
পেশীর মতো আমাদের মস্তিষ্ককেও সচল রাখতে নিয়মিত ব্যায়ামের প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন একই রুটিনের কাজে মস্তিষ্ক অলস হয়ে পড়ে।
- করণীয়: সুডোকু, দাবা, শব্দছক বা পাজল মেলানোর মতো বুদ্ধিবৃত্তিক খেলায় অংশ নিন। এছাড়া নতুন কোনো ভাষা শেখা, নতুন কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখলে মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ (Neuroplasticity) তৈরি হয়, যা স্মৃতিশক্তিকে তীক্ষ্ণ রাখে।
২. ভূমধ্যসাগরীয় বা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার (Brain Foods)
আমরা যা খাই, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের মস্তিষ্কের রক্তনালী ও কোষের ওপর। মস্তিষ্কের সুরক্ষায় ডায়েটে পরিবর্তন আনা জরুরি।
- করণীয়: খাদ্যতালিকায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার যেমন—সামুদ্রিক মাছ, আখরোট ও তিসির বীজ রাখুন। এছাড়া ফ্রি-র্যাডিক্যালের ক্ষতি থেকে মগজের কোষগুলোকে বাঁচাতে প্রচুর রঙিন শাকসবজি, বেরি জাতীয় ফল এবং গ্রিন টি পান করুন। অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো মস্তিষ্কে ইনফ্লেমেশন বা প্রদাহ তৈরি করে।
৩. গভীর ও পর্যাপ্ত ঘুম (Deep Sleep)
ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক সারাদিনের ক্ষতিকর টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম’ বলা হয়।
- করণীয়: বয়স বাড়লেও প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমানো জরুরি। ঘুমের সময় সারাদিনের স্মৃতিগুলো মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত (Memory Consolidation) হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আলঝেইমার্স রোগের জন্য দায়ী ‘অ্যামাইলয়েড বিটা’ নামক প্রোটিন মস্তিষ্কে জমা হতে শুরু করে।
৪. নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম
শারীরিক পরিশ্রম কেবল হার্ট ভালো রাখে না, এটি মস্তিষ্কের আকার বড় রাখতেও সাহায্য করে।
- করণীয়: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানোর মতো অ্যারোবিক ব্যায়াম করুন। ব্যায়ামের ফলে মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং ‘বিডিএফন’ (BDNF) নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা নতুন মগজ-কোষ তৈরিতে সাহায্য করে।
৫. সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখুন (Social Connections)
একাকীত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের মানসিক অবসাদ বাড়ায় এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা দ্রুত কমিয়ে দেয়।
- করণীয়: পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। বিভিন্ন সামাজিক বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাজে যুক্ত হোন। আড্ডা দেওয়া, হাসাহাসি করা এবং মানুষের সাথে খোলামেলা কথা বললে মনের সাথে সাথে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস (স্মৃতি ধারণের অংশ) সক্রিয় থাকে।
৬. রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন
মস্তিষ্কের রক্তনালীগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। উচ্চ রক্তচাপ বা অনিয়ন্ত্রিত সুগার এই নালীগুলোর স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
- করণীয়: হাই ব্লাড প্রেসার এবং ডায়াবেটিস থাকলে তা নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখুন। রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা ‘ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া’ (Micro-strokes) হতে পারে, যা মানুষের চিন্তাভাবনার শক্তি কেড়ে নেয়।
৭. মানসিক চাপ বা ক্রনিক স্ট্রেস দূর করুন
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা মস্তিষ্কের জন্য বিষের মতো কাজ করে।
- করণীয়: অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে শরীরে ‘কর্টিসল’ (Cortisol) হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা মস্তিষ্কের স্মৃতি উৎপাদনকারী কোষগুলোকে ধ্বংস করে। স্ট্রেস কমাতে প্রতিদিন নিয়মিত মেডিটেশন, ইয়োগা, কিংবা ধর্মীয় ইবাদত করুন এবং বুক ভরে গভীর শ্বাস (Deep Breathing) নেওয়ার অভ্যাস করুন।
৮. ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন করুন
ধূমপান কেবল ফুসফুসের ক্ষতি করে না, এটি মস্তিষ্কের ধমনীগুলোকে সংকুচিত ও শক্ত করে ফেলে।
- করণীয়: যেকোনো ধরণের তামাক ও অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। এগুলো মস্তিষ্কের কোষকে অকালবার্ধক্যের দিকে ঠেলে দেয় এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৯. কানের শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করুন
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার সাথে ডিমেনশিয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
- করণীয়: কানে কম শুনলে মানুষ আস্তে আস্তে চারপাশের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং মস্তিষ্কে উদ্দীপনা পৌঁছানো কমে যায়, যা মগজকে দ্রুত অলস করে ফেলে। তাই বয়স বাড়লে কানের যত্ন নিন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে হিয়ারিং এইড ব্যবহার করুন।
বার্ধক্য অবধারিত, কিন্তু মস্তিষ্কের পঙ্গুত্ব নয়। ২৫ বছর বয়সের পর থেকেই আমাদের মস্তিষ্কের কোষ কমতে শুরু করে, তবে আমরা যদি ওপরের ৯টি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস আমাদের দৈনিক জীবনে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, তবে বয়স আশি পার হলেও মনের জোর ও মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণতা থাকবে একদম তরুণের মতো।
ভোরের আকাশ/জেআ